Follow us

সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করতে চাইলে চীনকে স্বাগতম: প্রধানমন্ত্রী

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2019-11-13
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে জানান, বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর চীন ব্যবহার করতে চাইলে স্বাগত জানাবে বাংলাদেশ। ১৩ নভেম্বর ২০১৯।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে জানান, বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর চীন ব্যবহার করতে চাইলে স্বাগত জানাবে বাংলাদেশ। ১৩ নভেম্বর ২০১৯।
[ফোকাস বাংলা]

বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দর চীন ব্যবহার করতে চাইলে বাংলাদেশ স্বাগত জানাবে। বুধবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে এ কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, চীন তার ল্যান্ড-লকড দক্ষিণ-পশ্চিম রাজ্যগুলোর পণ্য পাঠাতে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহার করতে পারে।

তিনি জানান, চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের জন্য গত বছরের ২৫ অক্টোবর ভারতের সাথে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। এর ফলে বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহার করে ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ল্যান্ড-লকড সাত রাজ্যে পণ্য পাঠাতে পারবে।

শেখ হাসিনা আরও বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবসনের জন্য চীন ও ভারতের সাথে কাজ করে যাচ্ছে তাঁর সরকার।

বন্দর নিয়ে যা বললেন প্রধানমন্ত্রী

জাতীয় পার্টির সাংসদ মসিউর রহমান রাঙ্গার প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, “বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং যোগাযোগের কেন্দ্রস্থল হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে আমাদের সরকার দীর্ঘদিন যাবত কাজ করে আসছে।”

তিনি বলেন, “এ লক্ষ্যে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারে ভারতের সাথে এসওপি স্বাক্ষর হয়েছে। এর ফলে ভারত আমদানি-রপ্তানির জন্য এ বন্দর দুটি ব্যবহার করতে পারবে। আমরা আশা করছি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যসমূহ এ সুযোগ গ্রহণ করবে যা আমাদের উভয় দেশের জন্যই লাভজনক।”

শেখ হাসিনা বলেন, “আরও আশা করছি, ভারতের পাশাপাশি অদূর ভবিষ্যতে নেপাল ও ভুটান আমাদের বন্দর ব্যবহারের সুযোগ গ্রহণ করবে।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এমনকি চীনের দক্ষিণ-পঞ্চিমাঞ্চলের রাজ্যসমূহও এ বন্দর দুটি ব্যবহার করতে চাইলে আমরা তাদেরকেও স্বাগত জানাব। এর ফলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং যোগাযোগের কেন্দ্রস্থল হিসাবে গড়ে উঠবে।”

ভারত দীর্ঘদিন ধরে দেশটির সাতটি উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যে যোগাযোগের জন্য বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করার আগ্রহ জানিয়ে আসছে।

২০১১ সালে শেখ হাসিনার ভারত সফরে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর যৌথ ইশতেহারে ভারত চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করবে বলে উল্লেখ করা হয়। এর ফলে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাস করে সড়কপথে সেখান থেকে ভারতের সাত রাজ্যে সহজেই কম খরচে পণ্য পরিবহন করা যাবে।

আর এ জন্য বাংলাদেশকে ট্রানজিট মাশুল দিতে সম্মত ভারত।

আঞ্চলিক সব দেশের সাথে যুক্ত হতে চায় বাংলাদেশ

বিশ্লেষকেরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীনকে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারে আহ্বান জানানোর মাধ্যমে জানাতে চেয়েছেন যে, বাংলাদেশ আঞ্চলিক সব দেশের সাথে যুক্ত হতে চায়।

বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইন্সটিটিউটের চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন কবির প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে বেনারকে বলেন, “আমি মনে করি চীনকে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করতে দেয়ার বিষয়টি সময়োপযোগী প্রস্তাব।”

তিনি বলেন, ভারতকে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহার করতে দিতে সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ। চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহার করতে নেপাল ও ভুটানের সাথে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

“চীনকে চট্টগ্রাম-মংলা বন্দর ব্যবহার করতে দেয়ার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বোঝাতে চেয়েছেন যে, আমরা শুধু একটি নির্দিষ্ট দেশ ভারতের সাথে কানেকটেড নই। আমরা চীনসহ অন্যান্য সকল দেশের সাথে কানেকটেড থাকতে চাই,” যোগ করেন হুমায়ূন কবির।

সাবেক এই কূটনীতিক বলেন, “আমাদের বন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে ভারত, চীন, নেপাল ও ভুটান উপকৃত হতে পারে। আবার আমরাও তাদের কাছ থেকে উপকৃত হবো। আমরা আমাদের যে রিসোর্স আছে তা এই অঞ্চলের সকল দেশের জন্য উন্মুক্ত রাখব।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বেনারকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই প্রস্তাব আসলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মূল ভিত্তির (সকলের সাথে বন্ধুত্ব‍) আলোকে করা।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশ যখনই ভারতের সাথে আমাদের দুই বন্দর ব্যবহারের ব্যাপারে আলোচনা করেছে তখনই বলেছে, নেপাল ও ভুটান যাতে বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহার করতে পারে, সেজন্য ভারতের মাটি ব্যবহারের সুযোগ দিতে হবে। এর অর্থ হলো, বাংলাদেশের কানেকটিভিটির প্রস্তাব কোনো নির্দিষ্ট দেশকে মাথায় রেখে নয়। এটি সকল আগ্রহী দেশের জন্য।”

অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বলেন, “আমাদের চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে ভারত তার উত্তর–পূর্বের সাতটি রাজ্যে পণ্য নিতে পারবে। আবার চীনও মিয়ানমারের ভিতর দিয়ে তার ল্যান্ড-লকড ইউনানসহ অন্যান্য উত্তর-পশ্চিম রাজ্যগুলোতে পণ্য নিতে পারে।”

তিনি বলেন, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম) করিডোর নিয়ে আলোচনা চলছে বহুদিন ধরে। প্রধানমন্ত্রীর এই প্রস্তাব বিসিআইএম করিডোর প্রস্তাব বাস্তবায়নে সহয়তা করবে।”

তিনি বলেন, “ভারত ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা দৃশ্যমান হওয়ার পর বাংলাদেশ সবসময়ই ভারসাম্যের নীতি রক্ষা করে চলছে।”

রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গ

ক্ষমতাসীন দলের সাংসদ শহীদুজ্জামান সরকারের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে সরকার প্রধান বলেন, “রোহিঙ্গা সমস্যা মোকাবিলায় আমরা প্রতিবেশি দেশ ভারত ও চীনের সাথে আলোচনা করেছি। এ বিষয়ে তাদের সক্রিয় ভূমিকা আশা করছি।”

তিনি বলেন, “কেবল ভারত আর চীন নয়- বাংলাদেশসহ মিয়ানমারের সাথে যে কয়টি দেশের বর্ডার আছে সেই সবগুলো দেশের সাথে আমরা আলোচনা করেছি।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “চীনের রাষ্ট্রপতি কথা দিয়েছেন এ সমস্যা সমাধানে যথাযথ ভূমিকা রাখবেন। ইতোমধ্যে তাঁরা প্রতিনিধিও পাঠিয়েছেন। তাঁরাও আলোচনা করছেন। চাপ দিচ্ছেন।”

তিনি বলেন, “ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাথেও এ বিষয়ে আলোচনা করেছি। প্রত্যেকের কাছ থেকে ভালো সাড়া পেয়েছি। বিষয়টির সমাধান দরকার এটা সকলেই অনুধাবন করেন।”

“আলোচনা অব্যাহত আছে,” জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার বিষয়ে মিয়ানমার একসময় আগ্রহ দেখিয়েছে। তালিকাও হয়েছে। যাওয়ার সময়ও ঠিক হয়েছিল। কিন্তু আমাদের এখানকার রোহিঙ্গারা আন্দোলনের মতো শুরু করে- তাদের মধ্যে একটা প্রবণতা দেখা দিলো যে, তারা যাবে না। তাদের আরো কিছু ডিমান্ড আছে।”

শেখ হাসিনা বলেন, রোহিঙ্গারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। তারা নিরাপত্তা চায়। এখন এটা মিয়ানমারের ওপর নির্ভর করছে। সেখানে ফিরে গেলে নিরাপদে থাকবে—এই নিশ্চয়তা চায় রোহিঙ্গারা।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন