Follow us

পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে চীনা শ্রমিক খুন: অভিযুক্তর বিচার হবে চীনে

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2019-11-19
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
বাংলাদেশে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে ঢাকায় বিক্ষোভ। ২০ আগস্ট ২০১৬।
বাংলাদেশে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে ঢাকায় বিক্ষোভ। ২০ আগস্ট ২০১৬।
[এপি]

পটুয়াখালীর পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কর্মরত এক চীনা নাগরিককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করার দায়ে অভিযুক্ত আরেক চীনা শ্রমিককে বাংলাদেশের পরিবর্তে চীনে পাঠিয়ে বিচার করার ব্যাপারে সম্মতি দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন মঙ্গলবার বেনারকে বলেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে চীনা পুলিশ হত্যাকারীকে চীনে নিয়ে যাবে।

গত শনিবার রাতে রান্না করা নুডলস পড়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে চীনা শ্রমিক ফেঙ্গ লুই জুন–কে (৩৬) বুকে ছুরি মেরে হত্যা করেন স্যাঙ্গ জেয়াং। স্যাঙ্গ এখন পটুয়াখালী কারাগারে আছেন।

এ বছর জুন মাসে পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কর্মরত এক বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সংঘঠিত সংঘর্ষে এক চীনা নাগরিকের মৃত্যুর পর এটি পায়রায় চীনা শ্রমিকের মৃত্যুর দ্বিতীয় ঘটনা।

পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, “দেখুন আমাদের পায়রা তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে তিন হাজারের মতো চীনা শ্রমিক কাজ করে। নিজের দেশ ছেড়ে তারা দীর্ঘ সময় ধরে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে কাজ করে। এ কারণে হয়তো তাদের মধ্যে কিছুটা সমস্যা হতে পারে।”

তিনি বলেন, “চীনা নাগরিকের হাতে চীনা নাগরিকের প্রাণহানির ঘটনায় করণীয় বিষয় সম্পর্কে আমরা চীনাদের প্রস্তাব অনুযায়ী হত্যাকারী স্যাঙ্গকে চীনে পাঠিয়ে দেবো।”

মহাপরিচালক হোসাইন বলেন, “কিছুদিনের মধ্যে চীনা পুলিশ বাংলাদেশে এসে তাকে নিয়ে যাবে বলে আমাদের জানানো হয়েছে। আমরাও চাই তার বিচার চীনে হোক। আমরা কেন এই হত্যার দায় ঘাড়ে নেব?”

মহাপরিচালক বলেন, “জুন মাসে বাংলাদেশি শ্রমিকদের সাথে সংঘর্ষের ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে আমরা জানতে পারি যে চীনা শ্রমিকদের একটি বড় অংশ বাংলাদেশি কর্মীদের সাথে খারাপ আচরণ করত। আমরা বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করার কারণে এখন আর সেই সমস্যা নেই।”

এক বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গত ১৯ জুন পায়রা তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাংলাদেশি শ্রমিকদের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে চীনা কর্মীরা। সংঘর্ষে এক চীনা নাগরিক নিহত হন।

ওই সংঘর্ষে পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়। কয়েক দিন কাজ বন্ধ থাকে।

পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলায় পায়রা বন্দরের কাছে পায়রা কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির উৎপাদন ক্ষমতা এক হাজার ৩০০ মেগাওয়াট। চীনা অর্থায়নে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর বাংলাদেশ সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিন পিং যৌথভাবে পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

সেখানে চীনাদের পাশাপাশি ১০ হাজারের অধিক বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করছেন। প্রকল্পটি এ বছর ডিসেম্বরে উৎপাদনে যাওয়ার আশা করছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সাবেক এক বাংলাদেশি শ্রমিক মো. রফিক বেনারকে বলেন, “চীনা কর্মীদের একটি বড় অংশ আমাদের সাথে চরম দুর্ব্যবহার করত। কাজে কর্মে একটু ভুল হলে যা ইচ্ছা তাই বলত। মারধর করত।”

তিনি বলেন, “তারা নিজেদের মধ্যেও সামান্য বিষয় নিয়ে হাতাহাতি করে। তাদের মারামারি বিষয়গুলো চীনারা দেখাশোনা করে। বাংলাদেশ সরকারের এখানে কোনও ভূমিকা নেই।”

নুডলসকে কেন্দ্র করে খুন

পটুয়াখালী জেলার পুলিশ সুপার মইনুল হাসান বেনারকে জানান, চীনা নাগরিক ফেঙ্গ লুই জুন (৩৬) ও স্যাঙ্গ জেয়াং দুজনেই পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কাজ করতেন। তাঁরা একই রুমে থাকতেন।

তিনি বলেন, “তারা গত শনিবার আনুমানিক রাত সাড়ে নয়টার দিকে ঘরে আসে। তারা নুডলস খাওয়ার প্রস্ততি নিচ্ছিল। এর মধ্যে একজনের হাত থেকে নুডলস পড়ে যায়। তখন এ নিয়ে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়।”

মইনুল হাসান বলেন, “স্যাঙ্গ জেয়াং এর হাতে নয় ইঞ্চির একটি তরকারি কাটা চাকু ছিল। সেটি দিয়ে সে ফেঙ্গ এর বুকের বাম দিকে আঘাত করে। এসময় সে চিৎকার দিয়ে পড়ে যায়। কলাপাড়া হাসপাতালে নেয়া হলে ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।”

পুলিশ সুপার বলেন, “স্যাঙ্গকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন সে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। সোমবার আদালতে তোলা হলে তাকে কারাগারে পাঠিয়ে দেন বিচারক।”

তিনি বলেন, “আসলে দুজনের মধ্যে কোনো পূর্বশত্রুতা ছিল না। রাগের বশবর্তী হয়ে ফেঙ্গকে হত্যা করে স্যাঙ্গ।”

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি শহীদুজ্জামান সরকার বেনারকে বলেন, “একটি জায়গায় বেশি মানুষ থাকলে সেখানে দুর্ঘটনা অথবা অপরাধ সংগঠিত হতে পারে। তাই এক চীনা নাগরিকের হাতে আরেক চীনা নাগরিকের মৃত্যুকে বড়ো করে দেখার কিছু নেই।”

তিনি বলেন, তবে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না হয় সেব্যাপারে সরকারের সচেতন থাকা উচিত।

বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব লেবার স্টাডিজের গবেষক আব্দুল্লাহ আল মামুন বেনারকে বলেন, পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্র একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। সেখানে সাধারণ মানুষের সাথে শ্রমিকদের মেলামেশার সুযোগ নেই। তাই চীনা শ্রমিকেরা মূলত একটি গণ্ডির মধ্যে থেকে কাজ করে। চাপ বা মানসিক অস্থিরতা থেকে তাদের মধ্যে কোনও সমস্যা হতে পারে।”

তিনি বলেন, “আমরা যতটুকু জেনেছি, রাগের বশবর্তী হয়ে খুনের ঘটনাটি ঘটেছে। এমন ঘটনা খুব অস্বাভাবিক নয়।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন