Follow us

পূর্বাচলে পানি সরবরাহের কাজ পেলো চীনা কোম্পানি

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2019-11-27
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকায় গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমের উপস্থিতিতে রাজউকের পক্ষে সংস্থাটির চেয়ারম্যান ড. সুলতান আহমেদ (ডানে) এবং ইউনাইটেড ডেলকট ওয়াটার লিমিটেডের পক্ষে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ফিলিপ ওয়েইজিং ইউ (বামে) চুক্তিতে সই করেন। ১১ নভেম্বর ২০১৯।
ঢাকায় গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমের উপস্থিতিতে রাজউকের পক্ষে সংস্থাটির চেয়ারম্যান ড. সুলতান আহমেদ (ডানে) এবং ইউনাইটেড ডেলকট ওয়াটার লিমিটেডের পক্ষে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ফিলিপ ওয়েইজিং ইউ (বামে) চুক্তিতে সই করেন। ১১ নভেম্বর ২০১৯।
[সৌজন্যে: রাজউক]

বিদ্যুৎ ও সড়ক খাতের পর এবার বাংলাদেশে প্রথম স্মার্ট সিটি পূর্বাচলের পানি সরবরাহের কাজ পেলো একটি চীনা-বাংলাদেশ যৌথ কোম্পানি। এটি হবে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের আওতায় নির্মিতব্য পানি সরবরাহ প্রকল্পে চীনা কোনো কোম্পানির প্রথম বিনিয়োগ।

গত ১১ নভেম্বর চীনা ইউনাইটেড ওয়াটার কর্পোরেশন এবং বাংলাদেশি ডেলকট ওয়াটার লিমিটেডের যৌথ কোম্পানি ইউনাইটেড ডেলকট ওয়াটার লিমিটেডের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ।

ইউনাইটেড ডেলকট ওয়াটার লিমিটেড পূর্বাচলের পানি সরবাহ ব্যবস্থা নির্মাণসহ এর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মোট ৫৯২ কোটি টাকার (৭২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) মধ্যে প্রায় ২৯২ কোটি টাকা (৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) বিনিয়োগ করবে। এর পরিবর্তে ১১ বছর ধরে প্রতি বছর ৫৭ কোটি টাকা (প্রায় সাত মিলিয়ন মার্কিন ডলার) পাবে যৌথ কোম্পানিটি।

পূর্বাচল প্রকল্পের পরিচালক উজ্জ্বল মল্লিক বেনারকে বলেন, “পূর্বাচলে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য আমরা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের আওতায় চীন-বাংলাদেশ যৌথ কোম্পানি ইউনাইটেড ডেলকট লিমিটেডের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করেছি।”

প্রকল্পটি ২০২৩ সালে শেষ হবে বলে জানান তিনি।

উজ্জ্বল মল্লিক বলেন, “প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজউক বিনিয়োগ করবে প্রায় তিন’শ কোটি টাকা। আর বাকি অর্থ যোগাবে কোম্পানি।”

তিনি বলেন, “পানি সরবরাহ ব্যবস্থা নির্মাণ, পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তারা প্রতি বছর ৫৭ কোটি টাকা পাবে। তারা ১১ বছর ওই টাকা পাবে।”

তবে চীনা কোম্পানির সাথে চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারে সরকারকে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, দেশের অন্যান্য প্রকল্পের মতো বাস্তবায়নের মাঝপথে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি করতে পারে চীনারা। আর ব্যয় বৃদ্ধি না করলে তারা বাকি কাজও করবে না। তবে অনেকে আবার অভিজ্ঞতার কারণে চীনকে কাজ দেওয়ার পক্ষে।

চীনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুনশী ফয়েজ বেনারকে বলেন, “চীনা উন্নয়নের জন্য সারা বিশ্বে একটি মডেল। আমি মনে করি বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য চীনকে প্রয়োজন।”

তিনি বলেন, “চীনা কোম্পানিরা অনেক দ্রুত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারে। তাদের দক্ষতা আছে, টাকা আছে। সুতরাং চীনের সহয়তায় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে আমি কোনো সমস্যা দেখি না।”

মুনশি ফায়েজ বলেন, “তবে আমাদের উচিত হবে তাদের সাথে সঠিক শর্তে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা।”

বাংলাদেশে চীনা কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের সড়ক, বিদ্যুৎ, তথ্য প্রযুক্তি ও অন্যান্য খাতের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

ব্যয় বাড়ানোর আশঙ্কা

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের প্রধান অধ্যাপক ড. আহসান এম. মনসুর বেনারকে বলেন, “চীন বিশ্বে উদীয়মান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি। তারা খুব অচিরেই বিশ্বের এক নম্বর অর্থনৈতিক দেশ হয়ে যাবে। আমাদের এই বাস্তবতা মানতে হবে।”

তিনি বলেন, “এই পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতি মাথায় রেখে আমাদের নীতি নির্ধারকরা কাজ করছেন। আমরা চীনের সাথে ২০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর করেছি। তবে বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ এখনও মধ্যম পর্যায়ে।”

অধ্যাপক ড. মনসুর বলেন, “তারা একদিকে ঋণ দিচ্ছে। আবার ঠিকাদার হিসাবে তারা বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও চীনাদের প্রভাব বাড়ছে।”

তিনি জানান, চীনা কোম্পানি দেশের সর্ববৃহৎ প্রকল্প পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন করছে। পায়রা কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ দেশের বড় বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করছে চীনা কোম্পানি।

অধ্যাপক মনসুর বলেন, “তবে চীনা প্রভাব বৃদ্ধির ব্যাপারে আমার আপত্তির জায়গা হলো চীনাদের কর্পোরেট এথিকসের মান খুব খারাপ। তারা ঘুষ-দুর্নীতি ছড়ায়। সিস্টেম দুর্নীতিবাজ করে দেয়।”

তিনি বলেন, “আরেকটি বড় ধরনের অনৈতিক কাজ তারা করে। প্রথমে তারা একটি কাজ অল্প বাজেটে করতে রাজি হয়। এরপর তারা ধরা যাক ৫০০ কোটি টাকার কাজ ১,৫০০ কোটি টাকায় নিয়ে যায়। আর বাড়তি অর্থ না দিলে তারা কাজ করে না।”

ড. মনসুর বলেন, “সুতরাং, চীনাদের দিয়ে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গেলে আমাদের খুব সাবধানে তাদের সাথে ডিল করতে হবে। আমরা তাদের সঠিকভাবে ডিল না করে যদি ওদের সাথে দুর্নীতিতে জড়িয়ে যাই তাহলে সেটা হবে জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক।”

বাংলাদেশের বর্তমান সময়ে সর্ববৃহৎ প্রকল্প পদ্মা সেতু নির্মাণ করছে চীনা কোম্পানি। তারা কয়েক দফা প্রকল্পের ব্যয় ও সময় বৃদ্ধি করেছে।

সেন্টার ফর আরবান স্টাডিজের প্রধান অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম বেনারকে বলেন, চীনারা এই প্রথম বাংলাদেশের শহর প্রকল্পে পানি সরবরাহের কাজ করছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের ওয়াসা তার নিজের প্রকল্পগুলো ঠিকমত বাস্তবায়ন করতে পারছে না। সে কারণে হয়তো চীনাদের সাহায্য নেয়া হয়েছে।

অধ্যাপক নজরুল বলেন, “চীনারা তাদের দেশে অনেক বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। সে কারণে পানি সরবরাহ প্রকল্পে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাদের রয়েছে।”

“তবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় চীনারা সিঙ্গাপুরের পেশাজীবীদের দিয়ে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করায়। যেমন, বেইজিংয়ের কাছে কয়েকটি নতুন শহর গড়ে তোলা হয়েছে। এগুলোতে সিঙ্গাপুরের পেশাজীবীরা বাস্তবায়ন করেছে,” বলেন তিনি।

ঢাকার উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও গাজীপুরের কালীগঞ্জ থানা এলাকার ৬ হাজার ২২৭ একর জায়গা নিয়ে নির্মিতব্য পূর্বাচল প্রকল্পে বিভিন্ন আকারের প্রায় ২৬ হাজার আবাসিক প্লট রয়েছে।

স্বল্পমূল্যের এই প্লটগুলো থেকে সাধারণ নাগরিকসহ বিভিন্ন পেশাজীবীদেরও প্লট বরাদ্দ করা হয়েছে বলে বেনারকে জানিয়েছেন একজন প্লট মালিক।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন