Follow us

দলের বিপক্ষে গিয়ে সংসদে শপথ নিলেন সুলতান মনসুর

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2019-03-07
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়ে স্পিকারের কার্যালয় থেকে বের হয়ে আসছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে নির্বাচিত সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ। ৭ মার্চ ২০১৯।
সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়ে স্পিকারের কার্যালয় থেকে বের হয়ে আসছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে নির্বাচিত সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ। ৭ মার্চ ২০১৯।
[কামরান রেজা চৌধুরী/বেনারনিউজ]

দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে সংসদ-সদস্য হিসেবে বৃহস্পতিবার শপথ নিলেন গণফোরামের সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ।

বেলা ১১টায় তাঁর কার্যালয়ে সুলতান মনসুরকে শপথ বাক্য পাঠ করান স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী।

শপথ নেয়ার কয়েক ঘণ্টা পর সুলতান মনসুরকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয় বলে বেনারকে জানান গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু।

তবে বৃহস্পতিবারই সংসদের অধিবেশনে যোগ দেন সুলতান মনসুর।

মোস্তফা মহসিন মন্টু বেনারকে বলেন, সংবিধান ও নির্বাচনী আইন অনুযায়ী দলীয় সিদ্ধান্ত ভঙ্গ করে শপথ নেওয়ায় সংসদ-সদস্য পদ খারিজ হয়ে যাবে সুলতান মনসুরের।

তিনি বলেন, তাঁর দল মনসুরের সদস্যপদ খারিজের জন্য সকল ব্যবস্থা নেবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সুলতান মনসুরের শপথ গ্রহণ বিরোধী জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের রাজনীতির জন্য একটি ধাক্কা।

শপথ নেয়ার পর সুলতান মনসুর বেনারকে বলেন, “আমি দলের নেতাদের সাথে কথা বলে শপথ নিয়েছি। দলের নেতারা এব্যাপারে জানেন।”

তিনি বলেন, “আমি গণফোরাম নয়, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন করেছি। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রতীক ধানের শীষ। সুতরাং, আমি কোনো আইন ভঙ্গ করিনি।”

বিরোধীদল বিএনপির প্রতীকে নির্বাচন করে সংসদে এসে এখন কোন ভূমিকা পালন করবেন এমন প্রশ্নের জবাবে সুলতান মনসুর বলেন, “জনগণ আমাকে ভোট দিয়েছে। আমি জনগণের পক্ষে সংসদে কথা বলব।”

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না বেনারকে বলেন, “উনি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে নির্বাচিত গণফোরামের সংসদ-সদস্য। ঐক্যফ্রন্টের সিদ্ধান্ত হলো: আমাদের জোটের নির্বাচিত এমপিরা শপথ নেবেন না।”

মান্না বলেন, “উনি যে বলছেন, দল ও জোটের নেতাদের জানিয়ে শপথ নিয়েছেন, এটি একটি রাজনৈতিক অসততা।”

গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফা মহসিন মন্টু বেনারকে বলেন, “উনি যে বলছেন উনি আমাদের নেতাদের বলে শপথ নিয়েছেন। একদম মিথ্যা কথা।”

তিনি বলেন, “আমরা তাঁর সদস্যপদ বাতিলের জন্য নির্বাচন কমিশনে চিঠি লিখব।”

বাংলাদেশে নতুন ঘটনা

সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বেনারকে বলেন, “সুলতান মনসুরের মতো দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে আগে কেউ কখনো শপথ গ্রহণ করেননি।”

তিনি বলেন, “তবে, আমার মতামত হলো, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, একজন সংসদ-সদস্য তাঁর পদ হারাবেন যদি উনি যে দল থেকে নির্বাচিত হয়েছেন সেই দল থেকে পদত্যাগ করেন অথবা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দেন।”

ব্যারিস্টার শফিক বলেন, “সুলতান মনসুর দুটোর কোনোটি করেননি। দল বহিস্কার করলে সংসদ-সদস্যপদ বাতিল হবে না।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. নিজাম উদ্দিন আহমেদ বেনারকে বলেন, “আসলে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে শপথ নেয়ার ঘটনা এই প্রথম। সংবিধানে এ ব্যাপারে কিছু বলা নেই।”

তিনি বলেন, “দল বহিষ্কার করার কারণে লতিফ সিদ্দিকী সংসদ-সদস্য পদ হারিয়েছিলেন। তবে সেটি শপথ গ্রহণের পরে। কিন্তু দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে শপথ গ্রহণের জন্য সদস্যপদ হারাবেন কি না সে ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন কী সিদ্ধান্ত নেয় তা দেখার বিষয়।”

তিনি বলেন, “আসলে বিরোধী দলের অবস্থা খুবই খারাপ, সুলতান মনসুরের শপথ একটি বাড়তি সমস্যা। তবে আমার মনে হয়েছে উনি আওয়ামী লীগে ফিরে যেতে চান। সে কারণেই তিনি হয়তো দলীয় সিদ্ধান্ত ভঙ্গ করে শপথ নিয়েছেন।”

কে এই সুলতান মোহাম্মদ মনসুর?

আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নতুন প্রজন্মের যে কয়েকজন মেধাবী নেতা ছিলেন সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ তাঁদের একজন। তিনি ১৯৮৯-৯০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের ভিপি ছিলেন।

১৯৯৬ সালে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রতীক নৌকা নিয়ে প্রথমবারের মতো সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী এম এম শাহীনের কাছে পরাজিত হন।

২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা নিলে তিনি আওয়ামী লীগের সিনিয়র সংস্কারপন্থী নেতাদের সাথে যোগ দেন।

সংস্কারপন্থী হিসাবে পরিচিত নেতারা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দলের নেতৃত্ব থেকে বাদ দেয়ার প্রস্তাব দেন।

তবে সংস্কারপন্থীদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হলে সুলতান মনসুর দলের কার্যক্রম থেকে সরে যান। ২০০৮ সালের পর থেকে তাঁকে খুব বেশি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে দেখা যায়নি।

গত বছর ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের আগে তিনি ড. কামাল হোসেনের দল গণফোরামে যোগ দেন। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বিরোধী জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হলে তিনি সেখানকার অন্যতম নেতা হয়ে উঠেন।

জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জোটভুক্ত সকল প্রার্থী বিএনপির দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন।

৩০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণফোরামের প্রার্থী হিসাবে ধানের শীষ প্রতীকে কুলাউড়া আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হন।

জালিয়াতির অভিযোগ তুলে নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখান করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।

নির্বাচনে জয়ী বিএনপির ছয় এবং গণফোরামের দুই সংসদ-সদস্যকে শপথ নিতে নিষেধ করা হয় দল এবং জোটের পক্ষ থেকে। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৩ জানুয়ারি সংসদ-সদস্য হিসেবে শপথ নেয়া থেকে বিরত থাকেন তাঁরা।

তবে, ২ মার্চ স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে লেখা চিঠিতে ৭ মার্চ শপথ নেয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন সুলতাম মনসুর ও সিলেট বালাগঞ্জ আসন থেকে নির্বাচিত গণফোরামের এমপি মোকাব্বির খান।

তবে বৃহস্পতিবার মোকাব্বির খান শপথ নেননি।

এ প্রসঙ্গে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী বেনারনিউজকে বলেন, “মোকাব্বির খান প্রথমে আমাকে চিঠি লিখে বৃহম্পতিবার শপথ নেয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। গতকাল (বুধবার) আরেক চিঠিতে তিনি জানান আজ শপথ নেবেন না।”

স্পিকার বলেন, “তিনি বুধবারের চিঠিতে আরও বলেছেন, তিনি যখন শপথ নেবেন সেটা তিনি আমাকে জানাবেন। উনি শপথ নেবেন না এ কথা তিনি বলেননি।”

মোস্তফা মহসিন মন্টু বেনারকে বলেন, “মোকাব্বির খানকে আমরা বলেছি, জনগণের সাথে থাকেন। জনগণের বিপক্ষে অবস্থান নেবেন না। উনি বুঝেছেন, এবং আমাদের আশ্বস্ত করেছেন তিনি শপথ নেবেন না।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন