Follow us

দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে শপথ নিলেন বিএনপির এক সাংসদ

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2019-04-25
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
জাতীয় সংসদে ঠাকুরগাঁও-৩ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির সাংসদ জাহিদুর রহমানকে শপথ পাঠ করান স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। ২৫ এপ্রিল ২০১৯।
জাতীয় সংসদে ঠাকুরগাঁও-৩ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির সাংসদ জাহিদুর রহমানকে শপথ পাঠ করান স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। ২৫ এপ্রিল ২০১৯।
[সৌজন্যে: জাতীয় সংসদ]

দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে শপথ নিলেন বিএনপির নির্বাচিত সাংসদ জাহিদুর রহমান। তিনি একাদশ জাতীয় নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-৩ (পীরগঞ্জ-রাণীশংকৈল) আসন থেকে নির্বাচিত হন। বৃহস্পতিবার দুপুরে জাতীয় সংসদে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান।

সরকারি দল তাঁকে স্বাগত জানালেও তাঁর বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে বিএনপি।

এর আগে বিএনপির নির্বাচনী মিত্র এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম দল গণফোরামের দুই এমপি, সুলতান মনসুর আহমদ এবং মোকাব্বির খান দলের সিদ্ধন্তের বাইরে গিয়ে শপথ নেন। সুলতান মনসুরকে বহিষ্কার করে গণফোরাম।

জাহিদুর রহমান বিএনপির প্রথম নেতা যিনি দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে শপথ নিলেন। বিএনপির নির্বাচিত অন্য যে পাঁচজন সদস্য শপথ নেননি, সদস্যপদ বাঁচাতে তাদের হাতে সময় আছে আর মাত্র আর চার দিন।

সংবিধান অনুযায়ী কোনো নির্বাচিত সংসদ-সদস্য নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিন থেকে ৯০ দিনের মধ্যে শপথ না নিলে তাঁর সদস্যপদ বাতিল হয়ে যায়। সেই হিসাবে ২৯ এপ্রিলের মধ্যে শপথ না নিলে বিএনপি সদস্যদের সদস্যপদ খারিজ হয়ে যাবে।

জাহিদুর জানান, বিএনপির মহাসচিব বাদে আরো চার নির্বাচিত সংসদ-সদস্য শপথ নিতে আগ্রহী।

তবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বেনারকে বলছেন, অন্যরা শপথ নেবেন না। নিলে দলীয়ভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, যারা শপথ নেবেন তারা ‘গণদুশমন’। তাদের বহিষ্কার করা হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিএনপির নির্বাচিত সদস্যরা দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শপথ না নিলে একাদশ জাতীয় সংসদে সত্যিকার অর্থে কোনো বিরোধীদল থাকবে না। আর প্রকৃত বিরোধীদল না থাকলে সংসদীয় গণতন্ত্র কাজ করতে পারে না।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. নিজাম উদ্দিন আহমেদ বেনারকে বলেন, “যদি দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিএনপি সদস্যরা সংসদে যোগ দিতেন তাহলে সংসদে প্রকৃত একটি বিরোধীদল থাকত এবং সেটি আমাদের গণতন্ত্রের জন্য ভালো হতো।”

তিনি বলেন, “দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে যারা শপথ নেবেন তাদের যদি বহিষ্কার করা হয় তাহলে তারা বিরোধীদল হিসাবে কতটুকু দায়িত্ব পালন করতে পারবেন সেটি নিয়ে প্রশ্ন থাকে।”

“তবে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে শপথ নেয়ার ফলে, এমপিদের শপথ নেয়ার বিনিময়ে খালেদা জিয়াকে জেল থেকে মুক্তি দেয়া হচ্ছে বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে যে আলোচনা ছিল তার অবসান হলো,” মনে করেন ড. নিজাম।

প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যোগ দেয় বিএনপি। আওয়ামী লীগ জোট নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৯টিতে জয়লাভ করে। আর বিএনপিকে সাথে নিয়ে গড়ে ওঠা ঐক্যফ্রন্ট পায় মাত্র আটটি আসন। এর মধ্যে বিএনপি পায় ছয়টি।

ভোটে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ফলাফল প্রত্যাখান করে নতুন নির্বাচনের দাবি জানালে নির্বাচন কমিশন তা নাকচ করে দেয়। ঐক্যফ্রন্ট সিদ্ধান্ত নেয় তাদের নির্বাচিত সদস্যরা শপথ নেবেন না।

যেভাবে শপথ নিলেন জাহিদুর

শপথ নেয়ার ব্যাপারে সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের না জানিয়ে বৃহস্পতিবার সকালে সংসদ ভবনে হাজির হন জাহিদুর রহমান। শপথ নিতে আগ্রহী এমন চিঠি হাতে করেই সংসদে চলে আসেন তিনি।

বেলা ১২টার দিকে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান।

ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বেনারকে বলেন, “তিনি শপথ নিতে চান বলে জানালে আমি তাঁকে আসতে বলি।”

তিনি বলেন, “নির্বাচিত কোনো সংসদ-সদস্য শপথ নিতে চাইলে তাঁকে শপথ পড়াতে আমি সাংবিধানিকভাবে বাধ্য। তাঁর দলের সিদ্ধান্ত আছে কি না সেটি আমার দেখার বিষয় নয়। জাহিদুর রহমান আজ শপথ গ্রহণ করেছেন।”

স্পিকার বলেন, “আশা করি বিএনপির অন্যান্য সংসদ-সদস্যরাও শপথ নেবেন। তাঁদের উপস্থিতিতে সংসদ আরও প্রাণবন্ত হবে।”

শপথ নিয়ে জাহিদুর সাংবাদিকদের বলেন, “দল বহিষ্কার করে করুক। আমি তো আর দলকে ছেড়ে যাচ্ছি না। আমি দলের সঙ্গেই থাকব। ৩৮ বছর ধরেই তো আছি। সুতরাং আমি এই দলেরই লোক।”

তিনি বলেন, “দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এই আসনে কখনো বিএনপি জেতেনি। ধানের শীষের জন্মের পর আমিই প্রথম জিতলাম।”

তিনি বলেন, “১৯৯১ সাল থেকেই আমি নির্বাচন করে যাচ্ছি। সংসদ নির্বাচন করেছি মোট চারবার। তাই এলাকার ৯৫ শতাংশ মানুষ আমার শপথ নেওয়ার পক্ষে।”

জাহিদুর রহমান বলেন, “আমি মনে করি শপথ নেওয়া উচিত। কারণ আমাদের নেত্রী কারাগারে। তিনি অসুস্থ। দলের হাজার হাজার নেতাকর্মী বিরুদ্ধে মামলা চলছে, তারা জেলে আছে। বাইরে থেকে কিছুই হচ্ছে না। সুতরাং বাইরে থেকে লাভ কী? তার চেয়ে ভেতরেই যাই, অন্তত চিৎকার করে কথা তো বলতে পারব।”

জাহিদুর রহমান বলেন, “কয়েক দিন আগে দলের মহাসচিব আমাদের পাঁচ নির্বাচিত সাংসদকে ডেকেছিলেন। তিনি শপথ না নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু আমি দলের সিদ্ধান্তের বাইরে এসে সংসদে যোগ দিয়েছি।”

পীরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুর রহমান বলেন, “দলের মহাসচিব বাদে অন্যান্য সদস্যরাও শপথ নিতে পারেন। দেখি তাঁরা আসেন কি না। আসলে একসঙ্গে (সংসদে) যোগ দেবো।”

ব্যবস্থা নেবে বিএনপি

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বেনারকে বলেন, “উনি শপথ নিয়েছেন নিজের সিদ্ধান্তে। আমাদের দলের সিদ্ধান্ত আমরা শপথ নেব না।”

তিনি বলেন, “যারা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে শপথ নেবেন তাঁদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

শপথ নেয়ার পর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় সাংবাদিকেদের বলেন, খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে যারা শপথ নেবেন তারা ‘গণদুশমন’ বলে চিহ্নিত হবেন।

আওয়ামী লীগ দলীয় হুইপ ইকবালুর রহিম বেনারকে বলেন, “মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাদে বিএনপির পাঁচ নির্বাচিত এমপিরা গত দুদিন আগে আমাদের সাথে দেখা করে শপথ নেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেন।”

তিনি বলেন, “শপথ নেয়া একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। আমরা তাঁদের স্বাগত জানাই।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন