Follow us

নারী সাংবাদিককে নিয়ে মন্তব্য করে ব্যারিস্টার মইনুল জেলে

প্রাপ্তি রহমান
ঢাকা
2018-10-23
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
গ্রেপ্তারের পর ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে আদালতে হাজির করে পুলিশ। ২৩ অক্টোবর ২০১৮।
গ্রেপ্তারের পর ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে আদালতে হাজির করে পুলিশ। ২৩ অক্টোবর ২০১৮।
নিউজরুম ফটো

মানহানির মামলায় গ্রেপ্তার করার একদিনের মাথায় ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত। মঙ্গলবার ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর হাকিম কায়সারুল ইসলাম তাঁর পক্ষে জামিন আবেদনের শুনানি শেষে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

এর আগে সোমবার রাত পৌনে ১০টার দিকে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রবের উত্তরার বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে।

“ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের বিরুদ্ধে রংপুরের মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে গত সোমবার একটি মানহানির মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। ওই মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে,” বেনারকে বলেন মো. মাহবুবুল আলম।

রংপুরের বাসিন্দা মিলি মায়া বেগম মইনুল হোসেনের বিরুদ্ধে নারীর প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ আচরণের জন্য অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে মানহানির ওই মামলাটি করেন। এদিনই বিচারক আরিফা ইয়াসমিন মুক্তা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।

রংপুরের এই মানহানির মামলাটি ছাড়াও, ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের বিরুদ্ধে আরও নয়টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ২১ অক্টোবর মাসুদা ভাট্টি নিজে ঢাকার আদালতে মামলা করেন। ওই দিন জামালপুর, কুমিল্লা ও কুড়িগ্রামে এবং পরদিন সোমবার ভোলা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মামলা হয়। মঙ্গলবার মানহানির মামলা হয়েছে চট্টগ্রাম ও মাগুরায়।

এ ছাড়া মঙ্গলবার ময়মনসিংহের আদালতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে। ময়মনসিংহের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতে মামলাটি করেন ভালুকা উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ও ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের নারী বিয়ষক সম্পাদক মনিরা সুলতানা। আদালতের বিচারক রোজিনা খান মামলাটি তদন্তের জন্য সাইবার অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর আদেশ দেন।

উল্লেখ্য, গত ১৬ অক্টোবর একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের টকশোতে লাইভে যুক্ত ছিলেন ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। টকশো আলোচক মাসুদা ভাট্টি ওই সময় মইনুল হোসেনকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটা আলোচনা চলছে যে আপনি সদ্য গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে এসে জামাতের প্রতিনিধিত্ব করছেন কি না।’ মইনুল হোসেন জবাব দেওয়ার একপর্যায়ে মাসুদা ভাট্টিকে ‘চরিত্রহীন’ বলে উল্লেখ করেন।

এর পরপরই নারী সাংবাদিকেরা একত্রিত হয়ে মইনুলকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি তোলেন। মইনুল ওই দিনের টকশোর সঞ্চালক বরাবর চিঠি লিখে ক্ষমা চান এবং পরবর্তীতে ফোনে ক্ষমা চান মাসুদা ভাট্টির কাছে। তবে মাসুদা প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবিতে অনড় থাকেন। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, দেশের বিশিষ্টজন ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোও দাবির প্রতি সমর্থন জানান।

ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গে মাসুদা ভাট্টি বেনারকে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

“এই মুহূর্তে এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে চাচ্ছি না। আর এই ঘটনার সুদূরপ্রসারী প্রভাব আছে কি নেই সে বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন যেসব নারী মাঠ পর্যায়ে সাংবাদিকতা করছেন তাঁরা,” মাসুদা ভাট্টি বেনারকে বলেন।

তবে মইনুল হোসেনের গ্রেপ্তার রাজনৈতিক কারণে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএপির দাবি, সরকারের ‘উচ্চ মহলের’ নির্দেশেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

অবিলম্বে তাঁর মুক্তি দাবি করে মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, “রাতে কোর্ট বসিয়ে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে সরকারের উচ্চ মহলের নির্দেশে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”

“গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনকে ব্যাহত করতেই এই গ্রেপ্তার। শুধুমাত্র অপশাসনের বিরুদ্ধে এবং গণতন্ত্রের পক্ষে কথা বলাটাকেই অপরাধ হিসেবে গণ্য করছে সরকার,” বলেন তিনি।

উল্লেখ্য, সৌদি সফর শেষে দেশে ফিরে গণভবনে সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে বেসরকারি টিভি চ্যানেলের এক সাংবাদিক একজন নারী সাংবাদিককে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে কটূক্তি করার বিষয়টি তোলেন। জবাবে প্রধানমন্ত্রী মামলা করলে দেখা হবে বলে মন্তব্য করেন।

“আমাদের নারী সাংবাদিকেরা কী করছেন? একজনের বিরুদ্ধে বলেছে, একটা মামলা হয়েছে। আরও তো মামলা হতে পারে। এর প্রতিবাদও আপনারা করতে পারেন। প্রতিবাদ করেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যা করার করবে। আপনারা মামলা করেন, আমরা যা করার করব,” বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সংবাদ সম্মেলনের কয়েক ঘণ্টা পর মইনুল গ্রেপ্তার হন।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ১৩ অক্টোবর বিএনপি, গণফোরাম, জেএসডি (রব) ও নাগরিক ঐক্য একত্রে গঠন করেন এই ফোরামটি। তা ছাড়াও তিনি ইংরেজি দৈনিক দ্য নিউ নেশন এর প্রকাশক।

গ্রেপ্তার ও আদালতে উপস্থাপন

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, সোমবার রাতে গ্রেপ্তারের আগে সাদা পোশাকের পুলিশ ঘণ্টা দেড়েক উত্তরায় আ স ম আবদুর রবের বাসাটি ঘিরে রাখে।

সূত্রগুলো বলছে, ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন রাত সাড়ে ৯টার দিকে উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরে আ স ম আবদুর রবের বাসায় যান। তিনি পৌঁছানোর পরপরই ওই বাড়িটি সাদা পোশাকের পুলিশ ঘিরে ফেলে। সে সময় আ স ম আবদুর রব বাসায় ছিলেন না।

কিছুক্ষণ পর আবদুর রব বাসায় ফেরেন। একপর্যায়ে গোয়েন্দা বিভাগের ৫০-৬০ জন সদস্য বাসার ভেতরে ঢুকলে আবদুর রবের স্ত্রী তানিয়া রব তাঁদের সঙ্গে কথা বার্তা বলেন। এরপরপরই মইনুল হোসেনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

মঙ্গলবার মইনুল হোসেনকে আদালতে উপস্থাপন করা হলে তাঁর আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, “মামলাটি জামিনযোগ্য। ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন জামিনের হকদার।”

অন্যদিকে সরকার পক্ষের কৌসুলি আবুদল্লাহ আবু জামিন আবেদনের বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, নারী সাংবাদিকের সঙ্গে বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ করে তিনি অন্যায় করেছেন। তাঁকে জামিন দেওয়া উচিত হবে না। জামিন দেওয়া না দেওয়া আদালতের এখতিয়ার। এরপরই তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।

এদিকে এস এম জুলফিকার আলী ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের পক্ষে উকিল নোটিশ পাঠান মাসুদা ভাট্টি বরাবর। তিনি বেনারকে বলেন, তাঁরা জবাবের অপেক্ষায় আছেন।

“রেজিস্ট্রি ডাকে পাঠানো চিঠিতে আমি মাসুদা ভাট্টির কাছে নোটিশ পাঠিয়েছি। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ছেলে মইনুল হোসেন জামাতের প্রতিনিধি বলে তিনি যে প্রশ্ন তুলেছেন, তার সপক্ষে প্রমাণ চেয়েছি আমরা। তাঁকে তথ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে উপস্থাপন করতে হবে,” জুলফিকার আলী বেনারকে বলেন।

তবে তিনি কোনো নোটিশ পাননি বলে বেনারকে জানান মাসুদা ভাট্টি।

নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সভাপতি নাসিমুন আরা হক মিনু বলেন, তাঁদের দাবি ছিল ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন যেন প্রকাশ্যে ক্ষমা চান এবং ক্ষমা না চাইলে সংবাদমাধ্যমগুলো যেন তাঁকে বয়কট করে। মইনুল হোসেনের প্রতি ব্যক্তিগত কোনো বিদ্বেষ তিনি পোষণ করেন না।

“আমরা অর্থাৎ নারী সাংবাদিকেরা কিন্তু ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের গ্রেপ্তার চাইনি। প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইলে এটি একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকত। একজন বিশিষ্টজন অপর একজন বিশিষ্টজন, যিনি আবার কি না নারী-তাঁর চরিত্র নিয়ে কথা তুলেছেন। আমরা এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সমাপ্তি চেয়েছিলাম,” নাসমিন আরা হক মিনু বেনারকে বলেন।

মইনুল হোসেন মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার বিষয়ে তাঁদের তেমন কিছু আর বলার নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে নির্বাসিত কথা সাহিত্যিক তসলিমা নাসরিন ফেসবুক পোস্টে মাসুদা ভাট্টির সমালোচনা করেন। ব্রিটেনে আশ্রয় পাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি কীভাবে তসলিমা নাসরিনের নাম ব্যবহার করেছিলেন সে নিয়ে কথা বলেন তিনি।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন