Follow us

সরকার ও বিরোধীদের রাজনৈতিক সংলাপে সুফল নিয়ে প্রশ্ন

শরীফ খিয়াম
ঢাকা
2018-11-01
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
গণভবনে আওয়ামী লীগের সাথে সংলাপে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতৃবৃন্দ। ১ নভেম্বর ২০১৮।
গণভবনে আওয়ামী লীগের সাথে সংলাপে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতৃবৃন্দ। ১ নভেম্বর ২০১৮।
সৌজন্যে: বাসস

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সাথে নবগঠিত বিরোধী জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বহু প্রতীক্ষিত সংলাপ অনুষ্ঠিত হলেও দৃশ্যত কোনো সুফল মেলেনি। তবে রাজনৈতিক সংকট নিরসনে অন্তত আলোচনার দুয়ার খুলে যাওয়ায় সরকার ও বিরোধী—উভয়পক্ষ সন্তুষ্ট।

সংলাপ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর ওপর আস্থা রাখতে বলেছেন। প্রধানমন্ত্রীর বরাত দিয়ে সাংবাদিকদের এ কথা জানান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

সংলাপ শেষে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দলনেতা ড. কামাল হোসেন নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের বলেছেন, “আমরা ওখানে কোনো বিশেষ সমাধান পাইনি।”

এ সময় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মূল দল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আলোচনায় তিনি সন্তুষ্ট নন।

এ প্রসঙ্গে রাজনীতি ও গণমাধ্যম বিশ্লেষক আলী আর রাজী বেনারকে বলেন, “বাংলাদেশে অতীতে সংলাপ সফল হওয়ার কোনো নজির নাই। পরিস্থিতি যা দেখা যাচ্ছে তাতে চলতি সংলাপও সফল হওয়ার সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ।”

তাঁর মতে, এখানে এমন কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে যা আলোচনার বিষয়ই নয়। সংলাপের মাধ্যমে ক্ষয়িষ্ণু এই রাজনীতির ধারায় পরিবর্তন আসার কোনো ইঙ্গিত তিনি দেখেন না।

প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাতটায় শুরু হওয়া এই সংলাপ চলে রাত পৌনে ১১টা পর্যন্ত।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সহকারী প্রেস সচিব আসিফ কবির বেনারকে বলেন, “আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৪ দলের মোট ২৪ জন এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে তাঁদের ২০ জন নেতা সংলাপে অংশ নেন।”

গণভবনের ব্যাংকুয়েট হলে প্রধানমন্ত্রীর সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে শুরু হয় সংলাপ। তাঁর বক্তব্যের পরই আলোচনা শুরু হয়। সংলাপ শেষ হয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য দিয়ে।

গণভবনে আওয়ামী লীগের সাথে বিরোধী জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সংলাপ। ১ নভেম্বর ২০১৮। [সৌজন্যে: বাসস]
গণভবনে আওয়ামী লীগের সাথে বিরোধী জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সংলাপ। ১ নভেম্বর ২০১৮। সৌজন্যে: বাসস

 

ঐক্যফ্রন্টের সাত দফা: গ্রহণ ও বর্জন

সংলাপে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাত দফা দাবি তুলে ধরা হয়। সংলাপ শেষে এই সাত দফার মধ্যে যেসব দফা মেনে নেওয়া হয়েছে সেগুলো তুলে ধরেন ওবায়দুল কাদের, ড. কামাল, মির্জা ফখরুলসহ অন্যান্য নেতারা।

তাঁদের বক্তব্য পর্যালোচনা করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ৭ দফার কতটা মেনে নেওয়া হয়েছে সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

প্রথম দফা: অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে সরকারের পদত্যাগ, জাতীয় সংসদ বাতিল, আলোচনা করে নিরপেক্ষ সরকার গঠন এবং খালেদা জিয়াসহ সকল রাজবন্দীদের মুক্তি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।

এসব দাবি সম্পর্কে ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সরকার পদত্যাগ করবে না। জাতীয় সংসদ বাতিল হবে না। আলোচনা করে নিরপেক্ষ সরকার গঠনেরও সুযোগ নেই।

খালেদা জিয়ার মামলার বিষয়টিও আইন–আদালতের কাছে। তা ছাড়া বর্তমান সরকার খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা দেয়নি, মামলা দিয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার।

খালেদা জিয়ার মামলা ও সংসদ ভেঙে দেওয়ার দাবি প্রসঙ্গে সংলাপ শেষে এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এ ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলেননি। ভবিষ্যতে আলোচনা হতে পারে।

মির্জা ফখরুল বলেন, “আমি সন্তুষ্ট নই। ঐক্যফ্রন্টের পূর্বঘোষিত কর্মসূচি চলবে।”

দ্বিতীয় দফা: গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠন ও নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের বলেন, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনা করা। এখনকার কমিশন সেই কাজটি করতে পারবে।

তিনি বলেন, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন এটি আধুনিক পদ্ধতি। এটা আওয়ামী লীগ সমর্থন করে। তবে এবার হয়তো ইসি সীমিতভাবে ব্যবহার করবে।

তৃতীয় দফা: বাক, ব্যক্তি, সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সকল রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশের স্বাধীনতা এবং নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে।

এসব দাবি প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী বাক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা বলেছেন। তিনি বলেন, সব রাজনৈতিক দলের সভা–সমাবেশ করার স্বাধীনতা থাকবে। ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের একপাশ উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। এটা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।

চতুর্থত: কোটা সংস্কার আন্দোলন ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, সাংবাদিকদের আন্দোলন এবং সামাজিক গণমাধ্যমে স্বাধীন মত প্রকাশের অভিযোগে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহার ও গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তির নিশ্চয়তা দিতে হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ সকল কালো আইন বাতিল করতে হবে।

এসব বিষয়ে সরকারি দলের পক্ষ থেকে কিছু বলা হয়নি।

পঞ্চমত: নির্বাচনের ১০ দিন পূর্ব থেকে নির্বাচনের পর সরকার গঠন পর্যন্ত বিচারিক ক্ষমতাসহ সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে এবং আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণের পূর্ণ ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত করতে হবে।

এসব বিষয়ে সরকারি দল বলেছে, তফসিল ঘোষণার পর আইন–শৃঙ্খলা বাহিনী ও সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের।

ষষ্ঠত: নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং সম্পূর্ণ নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণে ভোট কেন্দ্র, পোলিং বুথ, ভোট গণনাস্থল ও কন্ট্রোল রুমে তাঁদের প্রবেশের ওপর কোনো ধরনের বিধি-নিষেধ আরোপ না করা এবং নির্বাচনকালীন সময়ে গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর যে কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, পর্যবেক্ষক আসবে, পর্যবেক্ষণ করবে। এই ব্যাপারে আপত্তি নেই। এ ব্যাপারে সরকারের সহযোগিতা থাকবে।

সপ্তমত: তফসিল ঘোষণার তারিখ থেকে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত চলমান সব রাজনৈতিক মামলা স্থগিত রাখা এবং নতুন কোনো মামলা না দেওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে।

জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক মামলার বিষয়টি শোনার পর তাঁকে এ ধরনের মামলায় গ্রেপ্তারকৃত বা আসামিদের তালিকা দিতে বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করার আশ্বাস দিয়েছেন।

গতকাল এই সংলাপ চলাকালে গণভবনের বাইরে ঐক্যফ্রন্টের কর্মী-সমর্থকেরা দাবি আদায়ের জন্য স্লোগান সংবলিত প্ল্যাকার্ড-ফেস্টুন নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

তাঁদের হাতে ‘সংবিধান ওহি নয়, জনগণের জন্যই সংবিধান, ‘জনগণ ভোট দিতে চায়, ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে ফলপ্রসূ সংলাপ চাই’—এমন স্লোগান সংবলিত প্ল্যাকার্ড, ব্যানার ও ফেস্টুন দেখা যায়।

প্রসঙ্গত, গণফোরাম, বিএনপি, জাসদ (জেএসডি) ও নাগরিক ঐক্য নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হয়। গঠনের পরই ৭ দফা দাবি মানতে আন্দোলনে নামে এই জোট।

ইতিমধ্যে ঐক্যফ্রন্ট সিলেট ও চট্টগ্রামে সমাবেশ করেছে। ৬ নভেম্বর রাজশাহীতে সমাবেশ করার কথা রয়েছে।

সংলাপ অর্থবহ করার জন্য গণভবনের সামনে মোমবাতি জ্বালিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতাকর্মীদের মানববন্ধন। ১ নভেম্বর ২০১৮। [নিউজরুম ফটো]
সংলাপ অর্থবহ করার জন্য গণভবনের সামনে মোমবাতি জ্বালিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতাকর্মীদের মানববন্ধন। ১ নভেম্বর ২০১৮। নিউজরুম ফটো

 

বিশেষ সমাধান পাইনি: ড. কামাল

ড. কামাল হোসেন বলেন, “আমরা গণভবনে গিয়েছিলাম, তিন ঘণ্টা আলোচনা হয়েছে। নেতৃবৃন্দ তাঁদের অভিযোগের কথা বলেছেন, সরকারের ব্যাপারে তাঁদের উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছেন।”

“সবার কথা শোনার পর প্রধানমন্ত্রী লম্বা বক্তৃতা দিলেন কিন্তু আমরা ওখানে কোনো বিশেষ সমাধান পাইনি,” সাংবাদিকদের বলেন ড. কামাল হোসেন।

তবে সভা–সমাবেশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী একটা ভালো কথা বলেছেন বলে জানান ড. কামাল।

সংবাদ সম্মেলনে গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক সুব্রত চৌধুরী লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। এতে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ঢাকাসহ সারাদেশে সভা সমাবেশের ওপর কোনো বাধা থাকবে না।

“রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে যে গণগ্রেপ্তার হচ্ছে, গায়েবি মামলা হচ্ছে এগুলো আমরা উপস্থাপন করেছি। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তালিকা দেন আমরা বিবেচনা করব যাতে হয়রানি না হয়,” বলেন সুব্রত চৌধুরী।

সংবিধানের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই: কাদের

আওয়ামী লীগ সংবিধানের বাইরে যেতে পারবে না—এটা সংলাপে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। সংলাপ শেষে গণভবনে রাতে তিনি সাংবাদিকদের ব্রিফ করে এই কথা জানান।

নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, “একটা ব্যাপার পরিষ্কারভাবেই বলেছি। প্রধানমন্ত্রীর চিঠিতেও একটা কথা লেখা ছিল। সংবিধানসম্মত সকল বিষয়ে আলোচনা হবে। কাজেই আমরা সংবিধানের বাইরে যেতে পারি না।”

আবার সংলাপের বিষয়ে তিনি বলেন, ছোট পরিসরে বসার ব্যাপারে নেত্রী বলেছেন দ্বার উন্মুক্ত। যে কোনো সময় তাঁরা আসতে পারেন। তবে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত শিডিউল ফাঁকা নেই। এরপর তাঁরা আসলেই আলোচনা হবে। তাঁরা যদি মনে করেন আসা দরকার, তাহলে আমাদের জানালেই হবে।

উল্লেখ্য, শুক্রবার প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের সংলাপ হবে সাবেক রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্পধারার সঙ্গে, এরপর রয়েছে অন্যান্য দলের সঙ্গে সংলাপ।

গত কয়েক মাস ধরে সরকার আলোচনা বা সংলাপ করবে না, বলে আসলেও নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেভাগে এই সংলাপ শুরুর ঘোষণা রাজনীতিতে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন