Follow us

বিশ্লেষকদের মতে, সংলাপ সফলতার প্রধান বাধা সংবিধান সংশোধন প্রসঙ্গ

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2018-11-02
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
গণভবনে বিরোধী রাজনৈতিক জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাথে আলোচনায় বক্তব্য রাখছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১ নভেম্বর ২০১৮।
গণভবনে বিরোধী রাজনৈতিক জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাথে আলোচনায় বক্তব্য রাখছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১ নভেম্বর ২০১৮।
সৌজন্যে: বাসস

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া রাজনৈতিক সংলাপে ঐক্যফ্রন্টের দেওয়া দাবিগুলোর মধ্যে সংবিধান বিষয়ক দাবিটিকে সফলতার প্রধান বাধা বলে মনে করছেন রাজনৈতিক নেতা ও বিশ্লেষকরা।

তাঁদের মতে, ঐক্যফ্রন্টের প্রধান দাবি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া, প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ ও নিরপেক্ষ সরকার গঠন করা। কিন্তু আওয়ামী লীগ বলেছে, এগুলো সংবিধানসম্মত দাবি নয়। সংলাপের যে চিঠি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী পক্ষগুলোকে দিয়েছিলেন, তাতে সংবিধানসম্মত আলোচনার কথাই বলা হয়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমান বেনারকে বলেন, “বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক সংলাপ বিফল হওয়ার মূল কারণ ছিল নির্বাচন সম্পর্কিত সাংবিধানিক অনুচ্ছেদগুলো। অতীতে সরকারগুলো সব সময় তাদের সুবিধামাফিক সংবিধান সংশোধন করেছে, যাতে তারা আবার ক্ষমতায় আসতে পারে।”

তিনি বলেন, “২০০৬ সালের সংলাপের সময় আমরা বিএনপিকে বলতে শুনেছি তারা সংবিধানের বাইরে যেতে পারবে না। কারণ তারা তাদের সুবিধামতো সংবিধান সংশোধন করেছিল।”

ড. তারেক বলেন, এখন আওয়ামী লীগ বলছে তারা সংবিধানের বাইরে যেতে পারবে না। সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বলেও কিছু নেই। কারণ ২০১১ সালে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাদ দেওয়া হয়।

“ঐক্যফ্রন্ট তত্ত্বাবধায়ক বা দলনিরপেক্ষ সরকার গঠন, সংসদ ভেঙে দেওয়া ও প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ বিষয়ে ছাড় না দিলে বর্তমান সংলাপ সফল হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী হওয়া যায় না,” মনে করেন এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

তাঁর মতে, অতীতে দেখা গেছে, সংবিধানে কোনো ব্যবস্থা ছিল না। কিন্তু রাজপথে আন্দোলনের পর সেই ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, এর বড় দৃষ্টান্ত ১৯৯০ সাল, ১৯৯৬ সাল।

এই আলোচনার মধ্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা ড. কামাল হোসেন বলেছেন, ঐকমত্য থাকলে সংবিধান সংশোধন করা এক মিনিটের ব্যাপার। ড. কামাল স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন।

তাঁর এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে শুক্রবার ঐক্যফ্রন্টের নেতা ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী বেনারকে বলেন, সংবিধান সংশোধন করা নতুন কোনও বিষয় নয়। এ পর্যন্ত ১৬ বার সংশোধন হয়েছে। অতএব, সংবিধান সংশোধন করা যাবে না, এটা ​কোনও যুক্তি নয়।

তাঁর মতে, ক্ষমতায় থাকার জন্যই তো সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার কথা বলে ২০১৪ সালে এই সরকার ক্ষমতায় এসেছিল। তখন আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে, দ্রুত আরেকটি জাতীয় নির্বাচন দেওয়া হবে। কিন্তু টানা পাঁচ বছর পার করে আবারও এখন একই কথা বলা হচ্ছে।

২০০৭ সালে বাতিল হওয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল ও বিএনপি মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভূঁইয়ার মধ্যে অনুষ্ঠিত সংলাপের প্রধান বিষয় ছিলো ‘বিএনপি-পন্থী’ সাবেক প্রধান বিচারপতি কেএম হাসানকে প্রধান উপদেষ্টার পদে অধিষ্ঠিত না করা।

এই সংকটের সূত্রপাত হয় প্রধান বিচারপতিদের বয়স বৃদ্ধি সম্পর্কিত সংবিধান সংশোধন বিল পাশের মধ্য দিয়ে।

এর আগে ১৯৯৬ সালে সংবিধানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবিতে আওয়ামী লীগ আন্দোলন শুরু করলে ক্ষমতসীন বিএনপি বলেছিল তারা সংবিধানের বাইরে যেতে পারবে না। কিন্তু আন্দোলনের মুখে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরে আসে এবং সে সময় আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বেনারকে বলেন, রাজনৈতিক সংলাপে বার বার সংবিধান বাধা হয়ে দাঁড়ায় কারণ সংবিধানকে দলগুলো অপব্যবহার করে। আবার দলগুলো সাংবিধানিক দাবির প্রতি জনসমর্থন আদায় করতে পারে না।

উদাহরণ হিসাবে তিনি বলেন, ১৯৯০ সালেও সাংবিধানিক ধারা একটি বড় বিষয় ছিল। এরশাদ সরকারের বিপক্ষে জনগণের সমর্থন নিয়ে সাংবিধানিক ধারার পক্ষের শক্তিগুলো জয়ী হয়।

১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকার নির্বাচনী ও সাংবিধানিক ধারাকে অপব্যবহার করে। এর প্রতিবাদে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে নির্দলীয় তত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে জনগণ রাস্তায় আন্দোলন করে সরকারে পতন ঘটায়। ফলে নির্দলীয় তত্বাবধায়ক সরকার সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়।

২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে দেশের সাংবিধানিক ধারাকে অপব্যবহার করে তাদের পছন্দের ব্যক্তি কেএম হাসানকে তত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার জন্য বিচারপতিদের বয়স বৃদ্ধি করলে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়।

“আমরা ২০১১ সালে আমাদের মূল সাংবিধানিক ধারায় ফিরে এসেছি। কারণ এর পেছনে জনগণের সমর্থন ছিল। এখনো আছে,” জানান খালিদ মাহমুদ।

তাঁর মতে, বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি তাদের দলীয় বিষয়। এর পেছনে জনগণের সমর্থন নেই।

সংলাপ: পক্ষে–বিপক্ষে

বৃহস্পতিবারের সংলাপ সফল না ব্যর্থ তা নিয়ে রাজনীতি​তে বহুমুখী আলোচনা হচ্ছে।

“আমরা মনে করি না যে সংলাপ ব্যর্থ হয়েছে। খালেদা জিয়ার মামলা প্রত্যাহার বা খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়ার ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর নেই। এটি আদালতের বিষয়। তাই এই দাবি না মানলে সংলাপ ব্যর্থ এটা বলা যাবে না।

তাঁর মতে, সাত দফা দাবির মধ্যে রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার, অবাধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানো, নির্বাচনে বিদেশি পর্যবেক্ষকদের অনুমতি দেওয়ার মতো দাবি মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

তবে সংলাপের পরদিন শুক্রবার দলীয় কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, সংলাপ থেকে এখন পর্যন্ত ‘আশাপ্রদ’ কিছু আসেনি।

তিনি বলেন, “সংলাপ ঘিরে যে আশা ফুটে উঠেছিল, ফুলের মুকুল যেমন ঝরে যায় আস্তে আস্তে, সেই আশাও এখন ঝরে পড়তে শুরু করেছে।”

রিজভী বলেন, সরকার তাদের দাবীর প্রতি অনমনীয় থাকলে সাত দফা দাবি রাজপথেই আদায় করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. আতাউর রহমান বেনারকে বলেন, “রাজনীতিতে সংলাপ ব্যর্থ হলে সহিংসতা হয়। অতীতে আমরা কখনোই দেখিনি যে, একটি রাজনৈতিক সরকার আলোচনা মাধ্যমে সাংবিধানিক কোনও ব্যাপারে ছাড় দিয়েছে। সবক্ষেত্রে চাপের মুখে দাবি আদায় করতে হয়েছে।”

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন ১৪-দলীয় জোট জাসদের একাংশের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান বেনারকে বলেন, এই সংলাপ ব্যর্থ হোক, তা এই জাতি চায় না। কারণ সংলাপ ব্যর্থ হলে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি না চাইলেও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি তাদের কাঁধে ভর করে নাশকতা ও সহিংসতার চেষ্টা করবে।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন