Follow us

জাতীয় নির্বাচনে সহিংসতার আশঙ্কা, সংখ্যালঘুরা উদ্বিগ্ন

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2018-11-16
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
রাজধানীর নয়া পল্টন বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ। ১৪ নভেম্বর ২০১৮।
রাজধানীর নয়া পল্টন বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ। ১৪ নভেম্বর ২০১৮।
[নিউজরুম ফটো]

নির্বাচন এলেই সংঘাত–সহিংসতা প্রায় অনিবার্য হয়ে ওঠে এবং এবারও সেই লক্ষণ দেখা দেওয়ার প্রেক্ষাপটে দেশের সংখ্যালঘুরা তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগেভাগে নির্বাচন কমিশনসহ ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের কাছে দাবি জানিয়েছে।

৮ নভেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর গত কয়েকদিনে বিক্ষিপ্ত সহিংসতায় দুই কিশোরের মৃত্যু এবং পুলিশ ও বিএনপির কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ৪৩ জন আহত হওয়ার পর সচেতন নাগরিকেরা ক্রমাগত উদ্বেগ প্রকাশ করছে​ন।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বেনারকে বলেন, “বুধবারের সহিংসতা রাজনীতিতে উত্তাপ ও আতঙ্ক ছড়িয়েছে। তবে এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আশা করি সব পক্ষের মধ্যে শুভ বুদ্ধির উদয় হবে।”

আসন্ন নির্বাচনে সরকারবিরোধী মোর্চা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে আসায় এবার সহিংসতা ব্যাপক নাও হতে পারে বলে মনে করেন বদিউল আলম মজুমদার। তাঁর মতে, গত নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচন বয়কট করায় সহিংসতা বেশি হয়েছে। এবার দলটি মাঠে আছে। এবার বরং সরকারি দলে অন্তর্দলীয় কোন্দলে সহিংসতা বেশি হতে পারে।

এদিকে নির্বাচনকেন্দ্রিক আলোচনায় ঘুরেফিরে আসছে ২০১৩ সালের নির্বাচন ঘিরে সন্ত্রাস ও সহিংসতার কথা, ওইসব ঘটনায় প্রায় ​১৫০ জনের মৃত্যু হয়।

মানবাধিকার সংস্থা অধিকার বলছে, শুধু ২০০১ সাল থেকে ২০১৩-এর আগস্ট পর্যন্ত সময়েই রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন তিন হাজার ৯২৬ জন এবং আহত হয়েছেন এক লাখ ৫৮ হাজার ২১১ জন। এদের বেশিরভাগই মারা গেছেন নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায়।

অপর মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ২৩ নভেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্বাচনকেন্দ্রিক ২৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৮৫ জন নিহত এবং দুই হাজার ৭৭৭ জন আহত হন।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মিজানুর রহমান মনে করেন, “রাজনৈতিক দল আশা করে তারা ক্ষমতায় যাবে। আর নেতা-কর্মীরা আশা করে দলের হয়েই তারা প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পাবে। সেই সুযোগ নিশ্চিত করার জন্যই পেশিশক্তির ব্যবহার হয়ে থাকে, যা প্রাণহানি ঘটায়।”

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে তা প্রতিহত করার ডাক দিয়েছিল বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ২০–দলীয় জোট। ওই জোট নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় একতরফা নির্বাচনে দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। মোট ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩ টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের প্রার্থীরা।

৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের আগে ও পরে বাংলাদেশে বাসে আগুন এবং পেট্রোল বোমা ছোড়ার মতো ব্যাপক সহিংস ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার জন্য বিএনপি–জামায়াতকে দায়ী করা হয়।

“কোনো রাজনৈতিক দল ২০১৪ সালের সহিংসতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ না করে থাকলে সেই দলের রাজনীতি সারা জীবনের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়া উচিত,” বলছিলেন মিজানুর রহমান।

সংখ্যালঘুদের উদ্বেগ প্রকাশ

নির্বাচন এগিয়ে আসার প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। শুক্রবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন কমিশনের কাছে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ।

“আমরা দেশের মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডা, গির্জাসহ সব ধর্মীয় উপাসনালয়ে নির্বাচনি কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার দাবি করছি,” সংবাদ সম্মেলনে বলেন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, নির্বাচন অনেকের কাছে উৎসবের হলেও সংখ্যালঘুদের কাছে উদ্বেগের কারণ।

“প্রায় প্রতিটি নির্বাচনের শুরুতে নির্বাচন কমিশন সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা রক্ষা হয়নি। আশা করি, এবার ইসি সেই চেষ্টা করবে,” বলেন রানা দাশগুপ্ত।

জনপ্রতিনিধি হয়েও সংখ্যালঘু ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন বা আছেন—এমন কাউকে মনোনয়ন না দিতেও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহবান জানান তিনি।

তবে ড. মিজানুর রহমান মনে করেন, এবার সংখ্যালঘু নির্যাতন কম হবে। বিগত নির্বাচনের অভিজ্ঞতার কারণে মানবাধিকার সংগঠনগুলো সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়ে খুব সচেতন।

তাঁর মতে, আগে যেসব জায়গায় এসব ঘটনা ঘটেছিল সেখানে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। কিছু ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে অপরাধীদের বিরুদ্ধে। স্থানীয় সংখ্যালঘুদের মাঝে নেতৃত্ব গড়ে উঠেছে।

দায় অস্বীকার রাজনৈতিক দলগুলোর

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বেনারকে বলেন, “নির্বাচন হলেও সহিংসতার আশঙ্কা প্রকাশ করি, না হলেও আশঙ্কা করি।”

“প্রতিদিনই এক ধরনের আশঙ্কায় থাকি। তবে গত নির্বাচনের আগে-পরে বা গতকালের সংঘর্ষের ঘটনার কোনো সহিংসতার দায় বিএনপি নেবে না।”

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ বেনারকে বলেন, “এবার নির্বাচনের আগে সহিংসতার সুযোগ দেওয়া হবে না—সেকথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন। আর আওয়ামী লীগ এ ধরনের সহিংসতার সাথে জড়িত নয়।”

সরকারি দলের ভেতরকার কোন্দল নির্বাচনী সহিংসতার অন্যতম কারণ হতে পারে—বিশেষজ্ঞদের এমন আশঙ্কা প্রসঙ্গে মাহবুবুল আলম হানিফ বলেন, দলের ভেতরে কোনো কোন্দল নেই।

যদিও নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দিনই ঢাকার মোহাম্মদপুরে সরকার দলীয় দুই নেতার সমর্থকদের দ্বন্দ্বে দুই কিশোর নিহত হয়।

অন্যদিকে বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র বলেন, “আমাদের দলে কোন্দল নাই, তবে প্রতিযোগিতা আছে।”

গত বৃহস্পতিবার পুলিশের সাথে সংঘ​র্ষের ঘটনার দায় বিএনপি নেবে না বলে জানান গয়েশ্বর। তবে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান গত বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন, ওই সংঘর্ষের পুরোপুরি দায় বিএনপির।

এদিকে রাজধানীর পল্টন থানার মামলায় গ্রেপ্তার বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরীর পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত শুক্রবার এই আদেশ দেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাত আটটার দিকে কাকরাইলের নাইটিঙ্গেল মোড় থেকে নিপুণ রায় এবং সংগীতশিল্পী ও বিএনপির নেত্রী বেবী নাজনীনকে আটক করে ডিবি পুলিশ। পরে বেবী নাজনীনকে ডিবি কার্যালয় থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

গত বুধবার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় পল্টন থানায় তিনটি মামলা করা হয়। তিনটি মামলাতেই নিপুণ রায়কে আসামি করা হয়েছে। ওই ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছেন বিএনপির অন্তত ৭০ নেতা–কর্মী।

ইসির কাছে গ্রেপ্তারকৃতদের তালিকা

গত ৮ নভেম্বর তফসিল ঘোষণার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্বাচন কমিশনারের অধীনে চলে গেছে। তাই দেশব্যাপি আটক হওয়া ৪৭২ জন নেতা–কর্মীর তালিকা নির্বাচন ইসির কাছে জমা দিয়েছে বিএনপি।

শুক্রবার সকালে বিএনপির পক্ষ থেকে ইসিতে এই চিঠি পৌঁছে দেওয়া হয়। গত বুধবার ইসির সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, সারা দেশে গায়েবী মামলা দিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের হয়রানি করা হচ্ছে। জবাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা বলেছিলেন, বিএনপি তালিকা দিলে ইসি ব্যবস্থা নেবে।

বিএনপির দলীয় সূত্রে জানা যায়, সিইসির আশ্বাসের ধারাবাহিকতায় ইসিতে আটক নেতা–কর্মীদের তালিকা পাঠানো হয়েছে।

সিইসিকে লেখা মির্জা ফখরুলের চিঠিতে বলা হয়েছে, গত চার দিন ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিএনপির নয়া পল্টনের অফিসের সামনে ও তার আশপাশের সড়কে পাহারা বসিয়েছে। দলীয় কার্যালয়ে আসার পথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নেতা–কর্মীদের দেহ তল্লাশী এবং আটক করছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এ ধরনের তৎপরতা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে বলে জানান মির্জা ফখরুল।

শতভাগ সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে সংশয়

যে নির্বাচন নিয়ে এতো আলোচনা ও প্রস্তুতি, সেই নির্বাচন প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম বলেছেন, পৃথিবীর কোনো দেশে শতভাগ সুষ্ঠু নির্বাচন হয় না, বাংলাদেশেও হবে না। নির্বাচন কমিশন একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করবে। যেটা সব প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকবে।

শুক্রবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন ভবনে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে কমিশনার এ কথা বলেন।

কবিতা খানম বলেন, দেশে নির্বাচনী হাওয়া বইছে। এই হাওয়া যেন কোনোভাবেই বৈরী না হয়, সেই নির্দেশনা দিয়েছে ইসি। দায়িত্ববোধ নিয়ে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সেটা প্রতিপালন করতে হবে।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন