Follow us

নির্বাচনের আগে ওয়াজ মাহফিলের ওপর ইসির বিধিনিষেধ

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2018-11-21
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকায় ঈদ এ মিলাদুন্নবীর অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের একাংশ। ২১ নভেম্বর ২০১৮।
ঢাকায় ঈদ এ মিলাদুন্নবীর অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের একাংশ। ২১ নভেম্বর ২০১৮।
[বেনারনিউজ]

আগামী ৩০ ডিসেম্বরের আগে সারাদেশে ওয়াজ মাহফিলসহ কিছু ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনে বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে নির্বাচন কমিশন—ইসি। জাতীয় নির্বাচনের আগে এসব অনুষ্ঠান আয়োজনে অনুমতি না দেওয়ার জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তবে বিশেষ প্রয়োজনে ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজন করা হলে সেখানে নির্বাহি ম্যাজিস্ট্রেটদের উপস্থিত থাকতে হবে। মঙ্গলবার প্রস্তত করা আদেশটি ইতোমধ্যে সারাদেশে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের আদেশের একটি কপি বেনারনিউজের কাছে রয়েছে।

দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম নির্বাচনের আগে ওয়াজ মাহফিলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হলো বলে জানিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সংগঠন বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ গত সপ্তাহে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাচনী প্রচারণার কাজে ব্যবহার বন্ধের দাবি জানানোর পর নির্বাচন কমিশন এই আদেশ জারি করল। পরিষদ বলেছিল, মসজিদ, মন্দিরসহ কোনও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে যাতে নির্বাচনী প্রচার চালানো না হয়।

নির্বাচনের আগে কেউ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে উস্কানিমূলক ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দিলে বা প্রচার করলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতেও নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানায় ঐক্য পরিষদ।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসনের অধ্যাপক ড. নিজাম উদ্দিন আহমেদ বেনারকে বলেন, অতীতে কোনও নির্বাচনের আগে ওয়াজ মাহফিল বন্ধ করা হয়নি। এবারই প্রথম এ ধরনের আদেশ দেওয়া হলো।

তিনি বলেন, তাত্ত্বিকভাবে নির্বাচন কমিশনের এই আদেশ ঠিকই আছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান অথবা ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে রাজনৈতিক বা নির্বাচনী কাজে ব্যবহার করতে দেওয়া উচিত নয়।

ড. নিজাম বলেন, এবারের নির্বাচনে সব দল অংশগ্রহণ করছে। হয়তো নির্বাচনের সুষ্ঠু আমেজ রক্ষার জন্য কমিশন আদেশটি দিয়ে থাকতে পারে।

তিনি আরও বলেন, কিন্তু বিষয়টি নির্বাচনের আগে সাধারণ মানুষ কীভাবে নেবে সেটি বলা কঠিন। কারণ, বিষয়টি খুব সংবেদনশীল।

বিশিষ্ট ইসালামী চিন্তাবিদ মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসুদ বেনারকে বলেন, “ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় সভা-সমাবেশকে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী কাজে ব্যবহার না করতে কমিশন যে উদ্যোগ নিয়েছে সেটি আমি সমর্থন করি।”

“কিন্তু ওয়াজ মাহফিল বন্ধ করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটা মানুষ বোধ হয় ভালোভাবে গ্রহণ করবে না। কারণ ওয়াজ মাহফিলের সাথে মানুষের একটা আত্নার সম্পর্ক রয়েছে,” মনে করেন তিনি।

মাওলানা ফরিদ বলেন, “নির্বাচন কমিশন ওয়াজ মাহফিল বন্ধ না করে আদেশ দিয়ে বলতে পারত কোনো প্রার্থী নির্বাচনের আগে ওয়াজ মাহফিলে যেতে পারবে না। বিষয়টি নির্বাচনী আচরণবিধিতেও অন্তর্ভুক্ত করতে পারত।”

হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতা রানা দাসগুপ্ত বেনারকে বলেন, “নির্বাচন সামনে রেখে আমরা নির্বাচন কমিশনের কাছে দাবি জানিয়েছি যেন কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান তথা মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডা ও গীর্জা যেন নির্বাচনের কাজে ব্যবহার না করা হয়।”

তিনি বলেন, “আমরা আরও দাবি জানিয়েছি, নির্বাচনের আগে কেউ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে উস্কানি ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য বা বিবৃতি দিলে বা প্রচার করলে তার বিরুদ্ধে যেন আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।”

অতীতে নির্বাচনের আগে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে লক্ষ্য বানানো হয়েছে জানিয়ে রানা দাসগুপ্ত বলেন, “১৯৯১ সালে এক বিএনপি নেতা বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে মসজিদে আযানের পরিবর্তে উলু ধ্বনি বাজবে। সুতরাং নির্বাচনের আগে এ ধরনের ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক বক্তব্য আসতে পারে।”

দাসগুপ্ত বলেন, “তবে আমরা নির্বাচন কমিশনকে কোনো ওয়াজ-মাহফিল বন্ধ করতে বলিনি। প্রয়োজন হলে এ বিষয়ে আমাদের অবস্থান পরিস্কার করতে আমারা নির্বাচন কমিশনের কাছে আবার যাব।”

বৃহস্পতিবার নিরাপত্তা বিষয়ে ইসি–তে সভা

নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৃহস্পতিবার বিশেষ বৈঠকে বসছে নির্বাচন কমিশন।

নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বুধবার সাংবাদিকদের একথা বলেন। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবারের সভায় নির্বাচনের আগে-পরে ও ভোটের দিনের পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু রাখতে বিভিন্ন নির্দেশনা দেয়া হবে।

ধর্মীয় সভা আয়োজনে বাধ্যবাধকতা আরোপের বিষয়ে সচিব বলেন, “ধর্মীয় সভা পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়নি।”

তিনি বলেন, “আবেদন পাওয়া সাপেক্ষে রিটার্নিং অফিসার পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে সভার অনুমোদন দিতে পারে। তবে ধর্মীয় সভায় কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য রাখা যাবে না। এ ধরনের সভায় ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত থাকবে।”

সচিব আরও বলেন, এ ছাড়াও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান জোরদার করা, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নারী ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে যাওয়া নির্বিঘ্ন করা, রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা, নির্বাচনী সামগ্রী কেন্দ্রে পৌঁছানো, নির্বাহী ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের নিরাপত্তায় পুলিশ পাহারাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

নির্বাচনের আগে বিএনপি নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার বা হয়রানি না করতে নির্দেশ দেওয়া হবে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে সচিব হেলালুদ্দীন বলেন, এ ধরনের কিছু নির্দেশনা দে​ওয়া হতে পারে।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন