Follow us

গুজব ছড়ানোর অভিযোগে পাঁচ মাসে গ্রেপ্তার ১৩৪

শরীফ খিয়াম
ঢাকা
2018-12-07
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে ‘জিয়া সাইবার ফোর্স’ এর মহাসচিব কে. এম হারুন অর রশিদকে ঢাকায় গ্রেপ্তার করে র‍্যাব। ৭ ডিসেম্বর ২০১৮।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে ‘জিয়া সাইবার ফোর্স’ এর মহাসচিব কে. এম হারুন অর রশিদকে ঢাকায় গ্রেপ্তার করে র‍্যাব। ৭ ডিসেম্বর ২০১৮।
[সৌজন্যে: র‍্যাব]

সরকারের উদ্বেগ কমাতে নির্বাচনমুখী ‘গুজব’ ঠেকাতে আরো কঠোর হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘মিথ্যা-বানোয়াট ও উসকানিমূলক তথ্য’ প্রচারের দায়ে দুই দিনে আটজনকে আটক করেছে তারা। গত পাঁচ মাসে এই সংখ্যা ১৩৪।

এরই মধ্যে রাজধানীর কাওরান বাজারে বৃহস্পতিবার সংস্থাটির মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ বলেছেন, “কেউ যাতে গুজব ছড়িয়ে আগামী নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা না করতে পারে, সে ব্যাপারে সর্বোচ্চ সচেষ্ট থাকবে র‌্যাব।”

তবে র‌্যাবের এই নির্বাচনমুখী তৎপরতা সরকারবিরোধী মত প্রকাশের ক্ষেত্রে ভীতি ও ত্রাস তৈরি করবে, এমনটাই মনে করছেন মানবাধিকার ও গণযোগাযোগ বিশ্লেষকরা।

মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বেনারকে বলেন, “বহু বিচার বহির্ভূত হত্যার দায়ে অভিযুক্ত একটি সংস্থার এমন তৎপরতা এক ধরনের হুমকি হিসেবেই বিবেচিত হবে। এর ফলে মত প্রকাশের স্বাধীণতা বাধাগ্রস্থ হবে।”

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আলী আর রাজী বেনারকে বলেন, “ভীতি তৈরি করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার যে দর্শন, সেটি গুজব ছড়ানোর চেয়েও বড় সন্ত্রাস৷”

পাঁচ মাসে গ্রেপ্তার ১৩৪

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘মিথ্যা-বানোয়াট ও উসকানিমূলক তথ্য’ প্রচারের দায়ে ১৩৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। বিগত পাঁচ মাসের মধ্যে তাঁরা গ্রেপ্তার হয়েছেন। বেনারকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন সংস্থাটির লিগ্যাল এন্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান।

তিনি জানান, এদের অধিকাংশ কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন গ্রেপ্তার হয়েছেন। “মূলত চলতি বছরেই গুজবের প্রকোপ বেড়েছে,” যোগ করেন এই কর্মকর্তা।

সর্বশেষ বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর গুলিস্তান এলাকা থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাষ্ট্রবিরোধী মিথ্যা ও বানোয়াট খবর প্রচারের দায়ে ‘জিয়া সাইবার ফোর্স’ মহাসচিব কে. এম হারুন অর রশিদকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বিএনপিপন্থী এই ‘অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট’ সম্পর্কে শুক্রবার র‍্যাব-৩ এর লেফটেন্যান্ট কমান্ডার আশিকুর রহমান বেনারকে বলেন, “ফেসবুকে বিভিন্ন ‘পেইজ’ (পাতা) খুলে তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, নির্বাচন কমিশন, রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে গুজব প্রচার করেছেন।”

একই রাতে সিলেট থেকেও এক গুজব-সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার হয়েছে বলে জানান এই র‌্যাব কর্মকর্তা। এর আগের (বুধবার) রাতেও বিভিন্ন জেলা থেকে ছয় জনকে আটক করা হয়। এ ব্যাপারে বৃহস্পতিবার মুফতি মাহমুদ বেনারকে বলেন, “গাজীপুর, কুমিল্লা, সিলেট, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও নওগাঁ থেকে গ্রেপ্তার হয়েছে তারা।”

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক সেলিম রেজা নিউটন বলেন, “বাংলাদেশে ‘গুজব’ ব্যবস্থাপনার নামে সরকার এখন মানুষের মতামত ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত। র‌্যাবকেও একই কাজে লাগানো হয়েছে। এটা র‌্যাবের জন্য খারাপ, জনগণ এবং সরকারের জন্যও ভালো নয়।”

নির্বাচন, উদ্বেগ ও প্রোপাগান্ডা

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সুবাদে ‘গুজব’ ছড়ানোর প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, “এ কারণে হুমকির মুখে আছে রাষ্ট্র ও সমাজের স্থিতিশীলতা।”

বৃহস্পতিবার গুজব বিরোধী এক বিজ্ঞাপনচিত্র উন্মোচনের অনুষ্ঠানে মন্ত্রী এ কথা বলেন।

আগামী ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনকে সামনে রেখে এই বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাণ ও প্রচারের উদ্যোগ নিয়েছে র‌্যাব। তাদের দাবি, নির্বাচন বিনষ্টের চেষ্টায় সম্প্রতি ‘সাইবার ওয়ার্ল্ডে’ সক্রিয় হয়েছে এক সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী।

র‌্যাব মহাপরিচালকের দাবি, “বিশৃঙ্খলা তৈরি করে নির্বাচন বানচাল করার জন্য এক শ্রেণির মানুষ উঠেপড়ে লেগেছে। তারা ক্রমাগত অসত্য প্রচারের মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।”

গত তিন-চার মাস ধরে এই চক্রটি রাষ্ট্র, জনগণের এবং দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে ‘ইন্টারনেটে’ যাচ্ছেতাই প্রচার করে যাচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য, “এখন এমন একটা সময়, যখন গুজব ছড়ানোর নানা ক্ষেত্র তৈরি হয়ে যেতে পারে।” তবে তাঁর প্রত্যাশা, জঙ্গি ও মাদক বিরোধী অভিযানের মতো গুজব-সন্ত্রাসীদের ঠেকাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে র‌্যাব।

“র‌্যাবের বিজ্ঞাপনচিত্রটি গুজবে কান না দেওয়ার জন্য জনগণকে সচেতন করবে,” বলেন তিনি।

তবে এই বিজ্ঞাপনটিকে ‘র‌্যাবের প্রোপাগান্ডা’ (উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা) আখ্যা দিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক সেলিম রেজা নিউটন বেনারকে বলেন, প্রোপাগান্ডা কখনো সমাজের জন্য স্বাস্থ্যকর বা স্বস্তিদায়ক নয়।

“সরকার তার অপছন্দের দৃষ্টিভঙ্গি, মতামত বা তথ্যকে নানা নামে খারিজ করতে চায়। যার মধ্যে এগুলোকে গুজব হিসেবে খারিজ করার প্রবণতাও সারা দুনিয়াতেই আছে,” বলেন তিনি।

গুজবের অভিযোগে গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব মজিবর রহমান সরোয়ার বেনারকে বলেন, “এটা একদমই উদ্দেশ্য প্রণোদিত। বিএনপির বিরুদ্ধে যেসব গুজব ছড়ানো হচ্ছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।"

তাঁর দাবি, নেতাকর্মী শুধু নয় বিএনপির সমর্থকদের মধ্যেও ভয় ঢুকে যাচ্ছে। তারা মত প্রকাশের সাহস পাচ্ছে না।

এদিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আলী আর রাজীর মতে, জনমত গঠন, সচেতনতা তৈরির কাজের দায়িত্ব আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে দেওয়া উচিত না।

“রাজনৈতিক উদ্দ্যেশে যে গুজব তৈরি হয়, হবে, হচ্ছে; তার সমাধান আসতে হবে রাজনীতিতেই,” বলেন তিনি।

তবে সরকার ও র‌্যাবের গুজব বিরোধী তৎপরতাকে স্বাগত জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ফাহমিদুল হক বেনারকে বলেন, “এ ক্ষেত্রে তারা কতটা নিরপেক্ষ থাকে সেটাই এখন দেখার বিষয়।”

যাচাই ছাড়া তথ্য ছড়াতে না

নাশকতা, সহিংসতা ও গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোয় র‌্যাবের সাইবার ক্রাইম সেলের পাশাপাশি নজর রেখেছে তথ্য মন্ত্রণালয়ের গুজব শনাক্তকরণ সেল।

তবুও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পরামর্শ, “সঠিকভাবে যাচাই না করে কোনো তথ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘শেয়ার’ বা ‘আপলোড’ করা যাবে না।”

মন্ত্রী জানান, কক্সবাজারের রামু বা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের কথা সরকার ভোলেনি। সম্প্রতি নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরা যখন রাস্তায় নেমেছিল, তখনও ‘গুজব’ ছড়িয়ে আন্দোলনকে ‘অন্যদিকে’ মোড় নেওয়ানোর প্রচেষ্টা ছিল।

এর আগে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনের সময়ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে অরাজকতা তৈরি করা হয়েছিল বলে মনে করে সরকার।

প্রসঙ্গত, ফেসবুকে ছড়ানো গুজবের জেরে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে রামুতে এবং ২০১৬ সালের অক্টোবরে নাসিরনগরে ধর্মীয় দাঙ্গা সংগঠিত হয়েছিল। আর কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে চলতি বছর আন্দোলন করেছে শিক্ষার্থীরা।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন