Follow us

নির্বাচনী সহিংসতায় সরকারি দলের দুই নেতা নিহত

শরীফ খিয়াম
ঢাকা
2018-12-11
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা। ১০ ডিসেম্বর ২০১৮।
ঢাকায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা। ১০ ডিসেম্বর ২০১৮।
[এএফপি]

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার শুরুর দ্বিতীয় দিনে নোয়াখালী ও ফরিদপুরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সংঘর্ষে দুইজন নিহত হয়েছেন। এদের একজন যুবলীগ, অপরজন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা।

এ ছাড়া মঙ্গলবার অন্তত ১৫টি জেলায় সংঘাত–সংঘর্ষ, ভাংচুরসহ নানা ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় পুলিশ, সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক দলের সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন শতাধিক নেতা–কর্মী, যাদের বেশিরভাগই বিরোধী দল বিএনপির।

নির্বাচনী প্রচারণার শুরুতেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়াকে ‘অশুভ লক্ষণ’ বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নাগরিক সংগঠন ‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ড. বদিউল আলম মজুমদার। মঙ্গলবার বিকেলে বেনারকে তিনি বলেন, “এর পরিণতি চরম অমঙ্গলকর।”

তবে এই দিন রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে এক অনুষ্ঠানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদা দাবি করেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটরা যখন মাঠে যাবেন, তখন আর কোনো সংঘাত ঘটবে না।

ম্যাজিস্ট্রেটদের উদ্দেশ্যে সিইসি বলেন, “আপনারা সফল ও সার্থক নির্বাচন করবেন বলে আশা রাখি। নির্বাচনের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। তবে লক্ষ রাখতে হবে উত্তাপের এই পরিবেশ যেন উত্তপ্ত না হয়।”

যদিও নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করেন, “ইসি পরিবেশ তৈরি করতে ব্যর্থ হওয়ায় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা না করতে পারায় এসব হামলা হচ্ছে।”

“নির্বাচনী প্রতীক বরাদ্দের পর প্রচার শুরুর দিনই বিএনপির নেতা-কর্মীদের ওপর সশস্ত্র আক্রমণ শুরু করেছে আওয়ামী লীগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা,” যোগ করেন তিনি।

সংঘর্ষে যুবলীগ নেতা নিহত

নোয়াখালীতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কর্মীদের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে মো. হানিফ (২৪) নামে যুবলীগের এক নেতা নিহত এবং কমপক্ষে ১৫ জন আহত হয়েছেন। বিকেল সাড়ে চারটায় সদর উপজেলার এওজবালিয়া ইউনিয়নের নুরু পাটোয়ারীর হাট এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। এসময় একাধিক বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগও করা হয়।

এ ঘটনার জন্য বিএনপি ও জামায়াতকে দায়ী করছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা। নিহত হানিফ এওজবালিয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক।

সুধারাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনোয়ার হোসেন বেনারকে বলেন, “দক্ষিণ চরশুল্লুকিয়া গ্রামে বিএনপির প্রার্থীর একটি জমায়েত থেকে হানিফদের ওপর হামলা হয়েছে।”

নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) সৈয়দ মহিউদ্দিন আবদুল আজিম সাংবাদিকদের বলেন, নিহত হানিফের দুই পা গুলিবিদ্ধ। এ ছাড়া তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থান আঘাতে থেঁতলানো ও রক্তাক্ত অবস্থায় দেখা গেছে। লাশ হাসপাতালের মর্গে রয়েছে।”

ফরিদপুরে নিহত এক

স্থানীয় সরকার মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নির্বাচনী আসন ফরিদপুর সদরের নর্থ চ্যানেল ইউনিয়নে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সংঘর্ষে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক মো. ইউসুফ আল মামুন (৪০) নিহত হয়েছেন। মন্ত্রীর একান্ত সহকারী সচিব এ এইচ এম ফোয়াদ মঙ্গলবার রাত দশটার দিকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানান।

হামলায় আহত শতাধিক

নোয়াখালীর কবিরহাট পৌর শহরে বিএনপির নির্বাচনী মিছিলে হামলা ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। যে কারণে বিএনপির প্রার্থী মওদুদ আহমদ কবিরহাটে পূর্ব নির্ধারিত নির্বাচনী পথসভায় যোগ দিতে পারেননি। হামলায় উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কামরুল হুদা চৌধুরীসহ কমপক্ষে ৩৫ জন আহত হয়েছেন।

আওয়ামী লীগকে দায়ী করে ব্যারিস্টার মওদুদ সাংবাদিকদের বলেন, “যুবলীগ ও ছাত্রলীগ বিএনপি নেতাকর্মীদের বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও হামলা চালিয়েছে।”

তবে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন একই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ও দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

এ ছাড়া নরসিংদী-২ (পলাশ) আসনে বিএনপির প্রার্থী আব্দুল মঈন খানের নির্বাচনী প্রচারণায় হামলা করা হয়। এই ঘটনায় পৌর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হোসেন ভূঁইয়াসহ ১০ জন নেতা–কর্মী আহত হন।

বগুড়ার ধুনট উপজেলা সদরে বিএনপি প্রার্থী গোলাম মোহাম্মদ সিরাজের গাড়িবহরে হামলার খবর এসেছে। সোমবার তাঁর তিনটি গাড়ি ও ২০টি মোটরসাইকেল ভাংচুর করেছে করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন সিরাজ।

চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী শরীফুজ্জামান শরীফের গাড়িবহরে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। সোমবার রাত নয়টার দিকে আলমডাঙ্গা উপজেলার মুন্সীগঞ্জ এলাকায় ওই হামলার ঘটনায় দুটি মাইক্রোবাস ভাংচুর ও দুইজন চালকসহ অন্তত আটজন আহতের ঘটনা ঘটেছে।

এছাড়া ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় উভয় দলের কমপক্ষে ৩০ জন আহত হয়েছেন বলে জানা যায়।

পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে কয়েক দফা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয় দলের অন্তত শতাধিক নেতাকর্মী ও সমর্থক আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ৮ জনকে আটক করেছে রাঙ্গাবালী থানা পুলিশ।

রেহাই পাননি ফখরুলও

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের গাড়ি বহরের ওপরও মঙ্গলবার দুপুরে হামলা হয়েছে। তবে তিনি অক্ষত আছেন। নিজ নির্বাচনী এলাকা ঠাকুরগাঁও সদরের দানারহাট এলাকায় তিনি এই হামলার শিকার হন।

যদিও মির্জা ফখরুলের গাড়ি আক্রান্ত হয়নি উল্লেখ করে ঠাকুরগাঁও জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বেনারকে বলেন, “তাঁর বহরের পিছনের দিকের কিছু গাড়ির ওপর ইট-পাটকেল ছোঁড়া হয়েছে, যা খুবই অনাকাঙ্খিত।”

এ ঘটনার সাথে জড়িদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যস্থা নেওয়ার হচ্ছে বলে জানান তিনি।

আওয়ামী লীগের স্থানীয় কর্মীরা এই হামলা চালান বলে অভিযোগ বিএনপির নেতাদের।

তবে ঠাকুরগাঁও সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, কে বা কারা হামলা করেছে, তা এখনও জানা যায়নি। আর এসপির অভিযোগ, পূর্ব নির্ধারিত সফরসূচি অনুযায়ী বিএনপি মহাসচিবের ওই এলাকায় যাওয়ার কথা ছিল না।

বিএনপি চেয়ারপার্সনের প্রেস উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান বেনারকে জানান, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ ও বগুড়া-৬ আসনে থেকে নির্বাচন করছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল। নির্বাচনী গণসংযোগের জন্য তিনি ঠাকুরগাঁওয়ে গিয়েছেন।

আহত বিএনপির এক প্রার্থী

সোমবার নাটোরের লালপুরে নাটোর-১ আসনের বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মনজুরুল ইসলাম বিমলের গাড়িতে হামলার ঘটনায় আহত হন বিমলসহ তিনজন। পরে সাংবাদিকদের বিমল বলেন, “আমি অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেছি।”

একই দিন জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার দুরমুঠ বাজারে মাজার জিয়ারত নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে ১৫ জন আহত হন। সিরাজগঞ্জেও সংঘর্ষে উভয়পক্ষের ১০জন আহত হন। এছাড়া নেত্রকোণার দুর্গাপুরে আহত হয়েছেন তিনজন।

শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসন, যশোর সদর, রাজশাহী-৩ আসন, ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলা, সাতক্ষীরার সদর আসনের বিভিন্ন স্থানে বিএনপির পোস্টার ছিড়ে ফেলার অভিযোগ করা হয়েছে।

এছাড়া, সীতাকুণ্ডের এক ঘরোয়া সভা থেকে চট্টগ্রাম-৪ আসনের বিএনপির প্রার্থী ইসহাক কাদের চৌধুরীর প্রায় ১৫ নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ এবং চাঁদপুর-৪ আসনের বিএনপির প্রার্থী আলহাজ এমএ হান্নানের কর্মী-সমর্থকদের সাথে তাঁদের সংঘর্ষ হয়েছে।

অন্তর্দ্বন্দ্বে গুলিবিদ্ধ সাত

দেশের বিভিন্ন এলাকায় ক্ষমতাসীন জোটের মনোনীত ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যেও সংঘর্ষ হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সহিংসতাটি হয়েছে চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে।

উপজেলার নানুপুর বাজারে সোমবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে মহাজোট মনোনীত নৌকার প্রার্থী সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী এটি এম পেয়ারুল ইসলামের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ ও গুলিবিনিময়ের ঘটনায় সাতজন গুলিবিদ্ধ হয়েছে।

গুলিবিদ্ধরা হলেন- সাবেক ছাত্রনেতা আব্দুল কুদ্দুস (৫০), কাকন (২৭), ছাত্রলীগ নেতা সৈয়দ সৌরভ হোসেন (২৫), আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ এমদাদ হোসেন (৫৬), ছাত্রলীগ নেতা রাসেদ আলম (২৫), যুবলীগ নেতা আজম (২৬) ও নুরুল আমিন (৩০)।

ফটিকছড়ির থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বাবুল আক্তার সাংবাদিকদের জানান, পরিস্থিতি শান্ত রাখতে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

পীরগঞ্জ উপজেলা শহরেও সোমবার ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের মহাজোটের প্রার্থী ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা ইয়াসিন আলীর পক্ষে প্রচারকালে স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামী লীগ নেতা ইমদাদুল হকের সমর্থকরা হামলা চালায়।

এছাড়া একইদিনে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে মেহেরপুরের গাংনীতে চারজন এবং ঝিনাইদহের শৈলকুপায় তিনজন আহত হয়েছেন।

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন জেসমিন পাপড়ি

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন