Follow us

ড. কামাল হোসেনের গাড়িবহরে হামলা

প্রাপ্তি রহমান
ঢাকা
2018-12-14
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকায় শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানিয়ে ফেরার পথে ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেনের গাড়িবহরে হামলা চালায় একদল দুর্বৃত্ত। ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮।
ঢাকায় শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানিয়ে ফেরার পথে ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেনের গাড়িবহরে হামলা চালায় একদল দুর্বৃত্ত। ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮।
[বেনারনিউজ]

নির্বাচনী জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেনের গাড়িবহরে হামলা হয়েছে। শুক্রবার শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানিয়ে ফেরার পথে এই ঘটনা ঘটে।

হামলায় ড. কামাল হোসেন অক্ষত ছিলেন। তবে তাঁর গাড়িবহরে থাকা ৭/৮টি গাড়ি দুর্বৃত্তদের রড ও লাঠির আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আহত হন জোটের ২৫/৩০ জন কর্মী ও সমর্থক।

বিকেলে পুরানা পল্টনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এই হামলার জন্য কামাল হোসেন আওয়ামী লীগের এমপি প্রার্থী আসলামুল হক আসলামের ‘গুন্ডা বাহিনী’কে দায়ী করেন।

তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আসলামুল হক।

এই নিয়ে নির্বাচনী জোটটির কমপক্ষে তিনজন শীর্ষস্থানীয় নেতার গাড়িবহরে হামলার ঘটনা ঘটল। এর আগে গত মঙ্গলবার ঠাকুরগাঁওয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও বৃহস্পতিবার পাবনায় সাবেক তথ্যমন্ত্রী ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী আবু সাইয়িদের গাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয়।

এদিকে ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের আগে দেশজুড়ে বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা ও মামলার প্রেক্ষাপটে গত ১৩ ডিসেম্বর মানবাধিকার পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান হিউম্যান রাইটস ওয়াচ একটি বিবৃতি দিয়েছে।

ওই বিবৃতিতে মার্কিন সংস্থাটি জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন ও অন্যান্য দেশ ও সংস্থাকে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে ও প্রচারণার সময় হামলা বন্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চাপ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

যেভাবে হামলা

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, ড. কামাল হোসেনের গাড়িটি ফটকের কাছে (মূল বেদি থেকে প্রায় আধা মাইল দূরে) রাখা ছিল। গতকাল শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের পর তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে হেঁটে গাড়ির কাছে আসছিলেন। তখনই আচমকা একদল দুর্বৃত্ত লাঠি ও রড দিয়ে গাড়ি ভাঙচুর করতে শুরু করে।

একই সময়ে জেএসডি নেতা আ স ম আবদুর রবের গাড়িতেও ভাঙচুর চালানো হয়। ৪০/৫০ জন তরুণ সে সময় ঐক্যফ্রন্টের নেতা-কর্মীদের পেটায়। হামলায় ঢাকা-১৪ আসনের ঐক্যফ্রন্টের এমপি প্রার্থী শাহজাহান সাজু, আ স ম আবদুর রবের গাড়িচালকসহ ২৫/৩০জন আহত হন।

বিকেলে ঐক্যফ্রন্ট কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কামাল হোসেন হামলার তীব্র নিন্দা জানান। তিনি হামলাকারীদের ভাড়াটে বলে উক্তি করেন।

লিখিত বক্তব্যে নির্বাচনের আগে সারা দেশে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টিরও অভিযোগ করেন তিনি।

“আমরা লক্ষ করেছি প্রতীক বরাদ্দের পর থেকে আওয়ামী লীগ পুলিশের সহায়তায় প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় ধানের শীষের প্রার্থী, নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা, মামলা, গ্রেপ্তার, প্রচারণায় বাধা, ভাঙচুরের মাধ্যমে সারা দেশে ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। যা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের অন্তরায়,” ড কামাল হোসেন উল্লেখ করেন।

হামলায় আসলামুল হকের লোকজনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে, এ বিষয়ে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বেনারকে বলেন, হামলা হ‌য়ে‌ছে কি না সে সম্প‌র্কে তি‌নি নি‌শ্চিত নন। তারপরও খবর পে‌য়ে তি‌নি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বা‌হিনী‌কে বিষয়টি অব‌হিত ক‌রেন।

তিনি বলেন, “আমার এলাকায় রাষ্ট্রপ‌তি, প্রধানমন্ত্রী আস‌বেন ব‌লে সারারাতই আমি ঘটনাস্থ‌লে হা‌জির ছিলাম। আইনশৃঙ্খলা প‌রি‌স্থি‌তি কেমন তাও তদার‌কি ক‌রে‌ছি। সকা‌লে জনসং‌যোগ সে‌রে আমি বাসায় বিশ্রাম নি‌চ্ছিলাম।"

ঘটনাস্থ‌লের কোথাও ত‌াঁর উপ‌স্থি‌ত না থাকলেও তি‌নি ঘটনাস্থ‌লের ফু‌টেজ সংগ্রহ ক‌রে‌ছেন জানিয়ে আসলামুল হক বলেন, মু‌খোশ পু‌রি‌হিত কিছু লোকজন‌কে তাঁরা দে‌খে‌ছেন। তাঁদের প‌রিচয় তি‌নি জান‌তে চান।

মামলা হয়নি, তবে পুলিশ ‘দেখছে’

শুক্রবার রাত পর্যন্ত কামাল হোসেনের গাড়িবহরে হামলায় কোনো মামলা হয়নি। কামাল হোসেন বলেছেন তিনি পুলিশের মহাপরিদর্শককে বিষয়টি জানাবেন।

মামলা না হলে ঘটনার তদন্ত করবেন কি না—দারুস সালাম থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ফারুক-উল-আলমের কাছে জানতে চাইলে বলেন, তাঁরা ‘দেখছেন’ বিষয়টা।

“দেখুন আমরা যখন বেদিতে ছিলাম, তখনই শোরগোল শুনেছিলাম। অনেক মানুষ ছিল সে সময়। তো যে জায়গা থেকে শোরগোল শোনা যাচ্ছিল সেখানে গিয়ে আমরা কিছু পাইনি,” বেনারকে বলেন ফারুক-উল-আলম।

নির্বাচন কমিশনও এ বিষয়ে অবহিত নয় বলে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছে। বিকেলে ইসি সচিব হেলালুদ্দীনের কাছে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়।

এদিকে কামাল হোসেনের গাড়িবহরে হামলা প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সরকার চায় না নির্বাচন হোক। বগুড়ায় নির্বাচনী প্রচারের সময় তিনি এই মন্তব্য করেন।

কামালের নামে থানায় অভিযোগ

শহীদ বুদ্ধিজীবীদের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর জামায়াত নিয়ে ঐক্যফ্রন্টের সবশেষ অবস্থান কী; একজন সাংবাদিকের করা এমন প্রশ্নে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন কামাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘কত টাকা পেয়েছ এই প্রশ্নগুলো করার জন্য? শহীদ মিনারে এসেছ, শহীদদের কথা চিন্তা করা উচিত। কোন চ্যানেল থেকে এসেছ? চিনে রাখব। চুপ করো, খামোশ!’

এদিকে ড. কামালের এমন আচরণকে সাংবাদিকদের প্রতি ‘হুমকি’ হিসেবে অভিহিত করে তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে থানায় অভিযোগ দিয়েছেন দৈনিক বাংলাদেশ সময়ের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর স্টাডিজ বিভাগের প্রভাষক মোস্তাফিজুর রহমান (মিথুন মোস্তাফিজ)।

অভিযোগে বলা হয়, শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে ড. কামাল হোসেন সাংবাদিকদের হুমকি দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ ও বাংলাদেশের আইনে ফৌজদারি অপরাধ।

পুলিশ লিখিত অভিযোগটি জিডি হিসাবে গ্রহণ করেছে। ঘটনাটি যেহেতু ঢাকার, তাই সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগটি পাঠানো হয়েছে বলে জানায় পুলিশ।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিবৃতি

গত ১৩ ডিসেম্বর হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে গত অক্টোবর থেকে চলতি মাস পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনীগুলো প্রতিবাদকারী, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে গ্রেপ্তার করেছে, ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র ও যুবসংগঠন সহিংসতায় জড়িয়েছে এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন, ‘প্রধান বিরোধী দলের সদস্য ও সমর্থকদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, খুন হয়েছে এমনকি গুম হয়েছে। এভাবে একটি ভীতি ও দমবন্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এ পরিস্থিতি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের জন্য অনুকূল নয়।”

জানতে চাইলে বাংলাদেশ পুলিশের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) সোহেল রানা বলেন, সুস্পষ্ট অভিযোগ ছাড়া কাউকে গ্রেপ্তারের কোনো নির্দেশ পুলিশ সদরদপ্তর থেকে দেওয়া হয়নি।

তিনি বেনারকে বলেন, “সুস্পষ্ট অভিযোগ ছাড়া কাউকে গ্রেপ্তার না করার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আগেই। কোনো বিচ্যুতির খবর পেলেই সেটা খতিয়ে দেখা হয়।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন