Follow us

বাংলাদেশের নির্বাচন ও চীন-ভারতের ভূরাজনৈতিক দ্বৈরথ

জয়শ্রী বালাসুব্রামানিয়ান ও কামরান রেজা চৌধুরী
নয়াদিল্লি ও ঢাকা
2018-12-14
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকায় সরকারি দল আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা। ১০ ডিসেম্বর ২০১৮। [এএফপি]
ঢাকায় সরকারি দল আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা। ১০ ডিসেম্বর ২০১৮। [এএফপি]
[এএফপি]

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও কূটনীতিকদের মতে, নির্বাচনের পর বাংলাদেশের ওপর ভূরাজনৈতিক প্রভাব বাড়াতে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে দিতে পারে চীন ও ভারত।

আসন্ন ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ সাধারণ নির্বাচনের ওপর বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারত সতর্ক দৃষ্টি রাখছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

“আঞ্চলিক নেতৃত্ব, নৌপথে কর্তৃত্ব ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করার জন্য ভারত ও চীন বহুদিন থেকেই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। আঞ্চলিক ক্ষেত্রে তাদের কর্তৃত্ব রক্ষার এ লড়াইয়ে তারা সব সময়ই বাংলাদেশে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে চাইবে,” শুক্রবার বেনারকে বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আমেনা মহসিন।

“চীন ইতিমধ্যেই ভারতের চারপাশে নিজের প্রভাব বাড়িয়ে নিয়েছে,” মন্তব্য করে তিনি বলেন, “ভারত চায় না দক্ষিণ এশিয়ায় এমন কিছু ঘটুক, যাতে তাদের আঞ্চলিক কর্তৃত্ব হুমকিতে পড়ে।”

এ প্রসঙ্গে নিরাপত্তা বিশ্লষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন বেনারকে বলেন, “চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড উদ্যোগের অন্তর্ভুক্ত একটি দেশ বাংলাদেশ, যা ভারত কোনোভাবেই পছন্দ করছে না। কারণ এর মাধ্যমে চীন মূলত ভারতকে বৃত্তবন্দী করে ফেলবে।”

“দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রবেশমুখ মিয়ানমার আগে থেকেই চীনের নিয়ন্ত্রণে,” যোগ করেন তিনি।

প্রসঙ্গত, চীনের ব্যয়বহুল ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড উদ্যোগটির উদ্দেশ্য হলো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর ভেতর দিয়ে সড়ক, রেল ও সমুদ্রপথে ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর সাথে চীনের সহজ বাণিজ্য সংযোগ তৈরি করা।

সাখাওয়াত হোসেনের মতে, ভারত বাংলাদেশের নির্বাচনের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখার আরেকটি কারণ হলো জঙ্গিবাদের হুমকি।

“বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকার জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করে এসেছে,” বলেন সাখাওয়াত হোসেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর ঢাকা সফরের পর থেকে বাংলাদেশের সাথে দেশটির সম্পর্ক অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ হয়েছে, যা ভারতের জন্য ভাবনার কারণ।

তবে চীনের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলেও হাসিনা সরকার জঙ্গিবাদ দমনের ক্ষেত্রে ভারতের কাছে অনেক প্রশংসিত হয়েছে, বিশেষত ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সন্দেহভাজন জঙ্গি গোষ্ঠীর যেসব সদস্য বাংলাদেশে আত্মগোপন করেছে, তাদের বিরুদ্ধে হাসিনা সরকারের তড়িৎ পদক্ষেপের জন্য বাংলাদেশকে অনেক সাধুবাদ জানিয়েছে ভারত।

“সুতরাং ভারত চাইবে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জিতুক,” বলেন সাখাওয়াত হোসেন।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশের মাটিতে আশ্রয় নিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে গিয়ে হামলা চালানো সবগুলো ভারতীয় জঙ্গিগোষ্ঠীকে আওয়ামী লীগ নির্মূল করেছে। ফলে দিল্লি চাইবে হাসিনা সরকার আবার আসুক।”

তবে এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ভারতীয় কর্তৃপক্ষ।

“আমরা বাংলাদেশের নির্বাচনকে তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে গণ্য করি,” বেনারকে বলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবীশ কুমার।

তিনি বলেন, “প্রতিবেশী বন্ধু দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মন্তব্য করা আমাদের উচিত বলে মনে করি না।”

ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্য এক কর্মকর্তা বেনারকে বলেন, ভারত সরকার এমন কোনো মন্তব্য করবে না যাতে নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত হয়।

বাংলাদেশে চীন ও ভারতের প্রভাব

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত ছিল সবচে বড়ো সহায়ক দেশ, যেখানে পাকিস্তানের বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবে চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল।

চীনের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৬ সালের জানুয়ারিতে। এর পরের বছর বাংলাদেশের তৎকালীন সামরিক সরকারের প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান চীন ভ্রমণের মাধ্যমে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ব্যাপক উন্নতি ঘটান।

বাংলাদেশি কোনো সরকার প্রধানের ওটিই ছিল প্রথম চীন ভ্রমণ।

বর্তমানে চীন বাংলাদেশের প্রধান বাণিজ্য সহযোগী ও অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। সরকারি তথ্যমতে, চীন থেকে বছরে ১৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে বাংলাদেশ, যদিও বিপরীতে রপ্তানির পরিমাণ মাত্র ৭৫০ মিলিয়ন ডলার।

চীনের প্রেসিডেন্ট শিং জিনপিং এর সফরের সময় দেশটি বাংলাদেশের ২৪টি প্রকল্পের জন্য ২৪ বিলিয়ন ডলারের অর্থসহায়তা ঘোষণা করে।

তবে ২০১৫ সালে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরের পর থেকে দেশটি অপ্রত্যাশিতভাবে বাংলাদেশের সাথে বেশ কয়েকটি অর্থনৈতিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা ঘোষণা করে ভারত। এর ফলে ভারতে বাংলাদেশের বার্ষিক ১৩০ মিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ গিয়ে দাঁড়ায় ২৮০ মিলিয়ন ডলারে।

এদিকে বিএনপি সরকারের সময় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এলাকাগুলোতে বাংলাদেশের সহায়তায় ইসলামি জঙ্গিরা বিভিন্ন ধরনের আক্রমণ চালিয়েছে বলে মন্তব্য করেছে অস্ট্রেলিয়া ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইস্ট এশিয়া ফোরাম।

গত ১১ এপ্রিল প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই মন্তব্য করে সংস্থাটি।

ইস্ট এশিয়া ফোরামের এই প্রতিবেদনের সাথে একমত পোষণ করেন ভারতীয় বিশ্লেষকরা।

“ঐতিহাসিকভাবে শেখ হাসিনার প্রতি নয়াদিল্লির এক ধরনের পক্ষপাত রয়েছে। তাঁর শাসনামলে ভারত ও বাংলাদেশর মধ্যে অনেক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে,” বেনারকে বলেন ভারতের জিন্দাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন শ্রীরাম চাউলি।

“নির্বাচন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ এবং আমরা এটিকে স্বাগত জানাই,” মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আমরা সেখানে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দেখতে চাই, শেখ হাসিনা মৌলবাদের বিরোধিতা করেছেন, তিনি অনেক উদারমনস্ক।”

চাউলির মতে, বাংলাদেশে কোন দল সরকারে আসবে তাতে ভারতের কিছু যায় আসে না।

তিনি বলেন, “যেই আসুক, সবাইকে চীনের কাছ থেকে সাহায্য নিতে হবে। আমাদেরকে চীনের প্রভাবের মধ্যেই বসবাস করতে হবে, আমাদের অত সামর্থ্য নেই, তবে আমাদেরকে অবশ্যই বিকল্প উদ্যোগ নিতে হবে,” যোগ করেন তিনি।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন