Follow us

সরকারের ‘অবৈধ’ আদেশ মানা অপরাধ: পুলিশকে ড. কামাল

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2018-12-17
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
হোটেল পূর্বাণীতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট তাদের নির্বাচরী ইশতেহার ঘোষণা করে। ডিসেম্বর ১৭, ২০১৮।
হোটেল পূর্বাণীতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট তাদের নির্বাচরী ইশতেহার ঘোষণা করে। ডিসেম্বর ১৭, ২০১৮।
কামরান রেজা চৌধুরী/বেনারনিউজ

পুলিশকে বিরোধী দলের প্রার্থী ও নেতা–কর্মীদের আটক করার সরকারি ‘অবৈধ আদেশ’ না মানার আহ্বান জানিয়ে সোমবার ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহার ঘোষণা করেছে বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দল নিয়ে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির আগে ঐক্যফ্রন্টই প্রথম নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করলো।

ইশতেহারে বলা হয়, ঐক্যফ্রন্ট ক্ষমতায় গেলে দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুম বন্ধ করা হবে। সাদা পোশাকে কাউকে গ্রেপ্তার হবে না। পুলিশি হেফাজতে সকলপ্রকার শারীরিক নির্যাতন বন্ধ করা হবে। মিথ্যা মামলায় সহায়তাকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে  দ্রুত শান্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল হবে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে বলে ৩৫-দফা ইশতেহারে বলা হয়।

রাজধানীর হোটেল পূর্বাণী হোটেলে সোমবার ইশতেহার ঘোষণার আগে ঐক্যফ্রন্টের প্রধান ও গণ ফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন পুলিশকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “নির্বাচনের আর বাকি ১২ দিন। কিন্তু পুলিশ বিরোধী দলের প্রার্থী ও নেতা–কর্মীদের ধরপাকড় করে যাচ্ছে। এটা নজিরবিহীন।”

তিনি বলেন, “এ ধরনের নির্বাচনী পরিবেশ বাংলাদেশের ৪৭ বছরের ইতিহাসে দেখা যায়নি। গত কয়েক দিনে সারা দেশে এক হাজার নয়শোর বেশি বিরোধী নেতা-কর্মী ও প্রার্থীদের আটক করা হয়েছে। প্রার্থীদের আটক করা হচ্ছে। প্রার্থীদের ওপর হামলা হচ্ছে।”

তিনি বলেন, “আমি পুলিশ বাহিনীর উদ্দেশ্যে বলি, আপনারা সরকারের অবৈধ আদেশ মানবেন না। অবৈধ আদেশ মানা অপরাধ।”

ড. কামাল বলেন, “আমি আইজি সাহেবকে বলি, আপনার একটি সুনাম আছে। আপনি এটা নষ্ট করবেন না। আপনার পুলিশ বাহিনীকে অবৈধ আদেশ মানতে দেবেন না।”

অবৈধ আদেশ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না বেনারকে বলেন, “নির্বাচনে সকল দল সমান সুযোগ পাওয়ার কথা। কিন্তু সরকারি দল নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছে। আর বিরোধীদলীয় প্রার্থী ও নেতা–কর্মীদের আটক করা হচ্ছে। প্রার্থীদের ওপর হামলা হচ্ছে। সরকার তার দলীয় স্বার্থে পুলিশ বাহিনীকে অবৈধভাবে ব্যবহার করেছে।”

তিনি বলেন, “নির্বাচন কমিশন মুখে সমান সুযোগ সৃষ্টির কথা বললেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে তার উল্টোচিত্র। বিরোধী নেতাকর্মীরা পুলিশের ভয়ে পালিয়ে বেরাচ্ছে। নির্বাচন কমিশন চরম পক্ষপাত দেখাচ্ছে।”

কি আছে ইশতেহারে?

১৪টি প্রতিশ্রুতিসহ মোট ৩৫টি নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেন ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না।

তিনি বলেন, ঐক্যফ্রন্ট নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে। “বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং গুম পুরোপুরি বন্ধ করা হবে। ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট বাতিল করা হবে। রিমান্ডের নামে পুলিশি হেফাজতে যে কোন প্রকার শারীরিক নির্যাতন বন্ধ করা হবে। সাদাপোশাকে কাউকে গ্রেপ্তার করা হবে না।”

ইশতেহারে বলা হয়, “মিথ্যা মামলায় অভিযুক্তদের ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে এবং মিথ্যা মামলায় সহায়তাকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

মান্না বলেন, “বিগত দশ বছরে কল্পনাতীত স্বেচ্ছাচারিতা এবং পুলিশকে দলীয় ক্যাডার হিসাবে ব্যবহার করে হাজার হাজার মিথ্যা মামলা, গুম, খুন, মামলার ঘুষ বাণিজ্য ও বিচারবহির্ভূত হত্যায় লাখো পরিবার ক্ষুব্ধ ও বিপর্যস্ত।”

তিনি বলেন, “এই সমস্যা সমাধান করে সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মী, আইনজীবী সমন্বিত সর্বদলীয় সত্যানুসন্ধান ও বিভেদ নিরসন  কমিশন গঠন করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অতীতের হয়রানিমূলক মামলা সুরাহার লক্ষ্যে খোলামনে আলোচনা করে ক্ষমা ও ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা হবে।”

ইশতেহারে বলা হয়, “প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য আনা হবে। মন্ত্রিসভাসহ প্রধানমন্ত্রীকে সংসদের কাছে দায়বদ্ধ থাকার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা হবে। পর পর দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকা যাবে না।”

মান্না বলেন, “সংসদীয় স্থায়ী কমিটির উল্লেখযোগ্য পদ সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বণ্টন করা হবে। সংসদের ডেপুটি স্পিকার বিরোধীদলীয় সদস্যদের মধ্য থেকে নির্বাচন করা হবে “

সন্ত্রাসবাদ এবং জঙ্গিবাদের প্রতি জিরো টলারেন্স নীতি নেওয়া হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর হস্তে দমন করবে।

জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐকমত্য গঠনের লক্ষ্যে এসব বিষয়ে ছাত্রদের শিক্ষা পাঠ্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং সমাজের সব শ্রেণির জনগণকে সচেতন ও সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে দেশের আলেম-ওলামাদের দ্বারা মোটিভেশন প্রোগ্রাম চালু করা হবে।

বলা হয়, নিকটতম অন্যতম প্রতিবেশী মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ এর যে সব প্রকল্পে দেশের জন্য লাভজনক বিবেচিত হবে সেগুলোতে বাংলাদেশ যুক্ত হবে।

রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধীনে একটি জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠন করা হবে।

প্রতিক্রিয়া

বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিস কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান বেনারকে বলেন,  “প্রতি নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো ইশতেহারে ঘোষণা দেন যে তারা গুম, খুন ও বিচার বহির্ভুত হত্যাকান্ডে জিরো টলারেন্স দেখাবেন। আওয়ামী লীগ ও ২০০৮ নির্বাচনের আগে এমন কথা বলেছিলো। সুতরাং, আমরা খুব বেশি আশাবাদী হতে পারি না।”

“তবে, নির্বাচনী ইশতেহারে গুম, খুন ও বিচার বহির্ভুত হত্যাকান্ডের বিষয়টি উল্লেখ থাকাটা একটি অর্জন বলা যায়। কারণ, ক্ষমতায় গিয়ে যদি তারা আবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন তাহলে তাদেরকে সেই বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেয়া যাবে,” তিনি বলেন।

নূর খান বলেন, “তবে, বিচার বহির্ভুত হত্যাকান্ড বন্ধ করতে সব দলগুলোকে একমত হয়ে ঘোষণা দিতে হবে যেই ক্ষমতায় আসুক না কেন দেশে আর গুম, খুন ও বিচারবহির্ভুত হত্যাকান্ড ঘটবে না।”

তিনি বলেন, “তবে ঐক্যফ্রন্ট ক্ষমতায় আসলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি বাতিল হতে পারে অথবা নতুন আদলে প্রণীত হতে পারে।”

ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহার সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. নিজাম উদ্দিন আহমেদ বেনারকে বলেন, “তারা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সেগুলো নিয়ে দ্বিমত প্রকাশ করার কোন অবকাশ নেই। তবে তারা প্রধানমন্ত্রীকে দুইবারের বেশি ক্ষমতায় থাকতে দিতে চান না সেটা সংবিধান সম্মত নয়। ভোটে দাঁড়ানো একজন নাগরিকের অধিকার।”

তিনি বলেন, “দেশে সুশাসনের জন্য রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনলে চলবে না। প্রধানমন্ত্রী ও সংসদের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য সরকার। আর সেটা করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।”

ড. নিজাম বলেন, “আমাদের সকল দলগুলো সিদ্ধান্ত ওপর থেকে চাপিয়ে দেয়। এটা বন্ধ করতে হবে।”

ইশতেহার প্রচার করার পর নির্বাচন কমিশনে গিয়ে পুলিশি আটকের ব্যাপারে অভিযোগ করেন ঐক্যফ্রন্ট নেতারা। তারা গত দুই দিন ঐক্যফ্রন্টের নেতা–কর্মীদের ওপর হামলার ব্যাখ্যা চেয়েছেন পুলিশের কাছে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদার সাথে দেখা করার পর ড. কামাল সাংবাদিকদের বলেন, মরে গেলেও নির্বাচনের মাঠ ছাড়বে না ঐক্যফ্রন্ট। তিনি বলেন, সারা দেশে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’নেই।

পরে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার সাংবাদিকদের বলেন, ”আমি মনে করি না নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ আছে। বর্তমানে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড একটি অর্থহীন শব্দে পরিণত হয়েছে।...তবে আমি মনে করি সেনাবাহিনী মাঠে নামলে পরিস্থিতি পাল্টে যাবে।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন