Follow us

চীনের প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকার বা বিরোধী কারও আপত্তি নেই

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2018-12-19
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকায় বাংলাদেশ ও চীনের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক বিষয়ক সেমিনারে বাংলাদেশে চীনের রাষ্ট্রদূত ঝ্যাং জুও (ডান থেকে দ্বিতীয়)। ৮ ডিসেম্বর ২০১৮।
ঢাকায় বাংলাদেশ ও চীনের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক বিষয়ক সেমিনারে বাংলাদেশে চীনের রাষ্ট্রদূত ঝ্যাং জুও (ডান থেকে দ্বিতীয়)। ৮ ডিসেম্বর ২০১৮।
[বেনারনিউজ]

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে তীব্র মতবিরোধ থাকলেও আওয়ামী লীগ সরকারের নেয়া ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে সবাই একমত।

৩০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও অন্যান্য দল নিয়ে গঠিত দেশের বৃহৎ বিরোধীজোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সোমবার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছে, তারা ক্ষমতায় গেলে চীনের অর্থায়নে বাস্তবায়িত ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করবে।

“চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ এর যে সব প্রকল্প দেশের জন্য লাভজনক বিবেচিত হবে সেগুলোতে বাংলাদেশ যুক্ত হবে,” উল্লেখ করেছে ঐক্যফ্রন্ট।

মঙ্গলবার প্রকাশিত দলীয় ইশতেহারে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সর্ববৃহৎ দল বিএনপি বলেছে, “বাংলাদেশের সাথে অন্যান্য দেশের সংযোগ বৃদ্ধি করা হবে এবং এ দেশের জনগণের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ত্রিপুরা, মেঘালয়, নেপাল, ভুটান ও (চীনের) ইউনানের জনগণের সংযোগ সহজতর করা হবে।”

এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান বেনারকে বলেন, “আমরা মনে করি, বর্তমান সরকার ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড উদ্যোগের আওতায় যে সকল উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলেছে, সেগুলোর মধ্যে যেগুলো বাংলাদেশের জনগণের জন্য প্রয়োজনীয় সেগুলো আমরা বাস্তবায়নের পক্ষে।”

“সে কারণেই জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহারে ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে,” বলেন তিনি।

মাহবুবুর রহমান বলেন, “চীনের সাথে বিএনপির সুসম্পর্ক রয়েছে। চীন ১৯৭৫ সালের পর থেকে সকল সরকারের সাথে কাজ করে বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অবদান রেখে চলেছে।”

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না বেনারকে বলেন, “আমরা আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’এর যে সব প্রকল্প দেশের জন্য লাভজনক বিবেচিত হবে সেগুলোতে বাংলাদেশ যুক্ত হবে বলে উল্লেখ করেছি।”

তিনি বলেন, “কারণ বর্তমান সরকার গ্রহণ করেছে বলেই দেশের জন্য ভালো প্রকল্প বাতিল করে দিতে হবে এর কোনো মানে নেই।”

মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সাথে চীনের ইউনানকে যুক্ত করতে দুই দেশেই পৃথক পৃথক সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বেইজিং।

২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে চীনা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরের সময় ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড উদ্যোগের সাথে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার ঘোষণা দেয় বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার। আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, তারা ক্ষমতায় গেলে চীনের অর্থায়নে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখবে।

অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বেনারকে বলেন, “আসলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ব্যাপারে দ্বিমত ও সাংঘর্ষিক অবস্থান আছে। কিন্তু উন্নয়নের ব্যাপারে ও অর্থনৈতিক ইস্যুতে কোনো দ্বিমত নেই। সবাই চায় উন্নয়ন, সবাই চায় কল্যাণকর রাষ্ট্র।”

তিনি বলেন, “নির্বাচনী ইশতেহারে চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড উল্লেখ করার কারণ হলো এর আওতায় নেয়া উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ব্যাপারে জনগণের সমর্থন রয়েছে। জনগণের কাছে কে অর্থ দিচ্ছে সেটা বড় ব্যাপার নয়। তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো উন্নয়ন প্রকল্প।”

ড. হোসেন জিল্লুর বলেন, “তবে এটাকে অনেকে চীনের প্রভাব বৃদ্ধি বলতে পারে। চীন বাংলাদেশের দুই বড় দলের সাথেই সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলে। সে কারণেই তাদের নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো বিতর্ক নেই।”

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান বেনারকে বলেন, “চীন আমাদের উন্নয়নে অনেক ভূমিকা রেখে চলেছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিংপিং বাংলাদেশ সফর করেছেন। আমরা চীনা সরকারের কাছ থেকে ২২ বিলিয়ন ডলারের ঋণের সমঝোতা স্বাক্ষর করেছে।”

তিনি বলেন, “চীনা কর্তৃপক্ষের আমন্ত্রণে দু’মাস আগে আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধিদল চীন সফরে যায়। ওই সফরে দু’দেশের সম্পর্ক বৃদ্ধি করতে আমরা চীনা কমিউনিস্ট পার্টিসহ সরকারের বিভিন্ন প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা করেছি।”

ফারুক খান বলেন, “শুধু চীন নয়। আমরা আমাদের দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমারের সাথেও সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি।”

চীন সফরকারী আওয়ামী লীগ নেতা রিয়াজুল কবির কাওসার বেনারকে বলেন, “আমরা চীনা নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনায় বলেছি, তাদের সাথে আমাদের উন্নয়ন সম্পর্ক অব্যাহত থাকবে। এই সম্পর্ক আরো শক্তিশালী হবে। আমরা ক্ষমতায় থাকলে ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড বাস্তবায়িত হবে।”

ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড প্রকল্প

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, ২০১৬ সালের অক্টোবরে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিংপিং এর ঢাকা সফরের সময় ২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে ২৭টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যাপারে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয় বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে।

এগুলোর মধ্যে আটটি প্রকল্প হলো সড়ক ও রেল খাতের। আর একটি প্রকল্প নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত।

এগুলোকেই চীনের পক্ষ থেকে ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড উদ্যোগের মধ্যে আনার কথা বলা হচ্ছে। আর এগুলো বাস্তবায়নে খরচ হবে প্রায় ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

ওই ২৭টি প্রকল্পের তালিকা বেনার নিউজের কাছে আছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেনারকে জানান, “চীনের অর্থায়নে যে সকল প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে সেগুলোর কোনোটিতেই বাংলাদেশে রাজনৈতিক কারণে ওয়ান রোড ওয়ান বেল্ট ব্যবহার করা হয় না। সেগুলোকে আমরা সংযোগ প্রকল্প বলে আখ্যায়িত করে থাকি।”

তিনি বলেন, “চীনের পক্ষ থেকে এগুলোকে ওয়ান রোড ওয়ান বেল্ট বলা হয়। আমরা বলি না।”

উদাহরণ হিসাবে ওই কর্মকর্তা বলেন, “যেমন ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থেকে চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজারের ঘুমদুম পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভ নির্মাণ প্রকল্প ওয়ান রোড ওয়ান বেল্ট উদ্যোগের একটি অংশ।”

তিনি বলেন, “এই প্রকল্প ঘুমদুম পর্যন্ত যাবে। এরপর এটি মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে চীনের ইউনান থেকে আসা রাস্তার সাথে মিলে যাবে। ফলে এটি ওয়ান রোড ওয়ান বেল্ট প্রকল্প।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন