Follow us

নির্বাচনে ইসলামী দলগুলোর প্রভাব বেড়েছে

পুলক ঘটক
ঢাকা
2018-12-20
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা। ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮।
ঢাকায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা। ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮।
[বেনারনিউজ]

ইসলামী রাজনৈতিক দল ও সম-মতাদর্শের বিভিন্ন সংগঠনের প্রভাব এবারের নির্বাচনে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বলে মনে করছেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত কিংবা অনিবন্ধিত ৭০টি ইসলামি দল ও সংগঠন এবারের নির্বাচনে সক্রিয়। দলগুলোর প্রায় সবাই সরকার সমর্থক মহাজোট কিংবা সরকার বিরোধী জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে মিলে নির্বাচনে অংশ নিলেও প্রায় সকল আসনে কোনো না কোনো ইসলামী দলের আলাদা প্রার্থী আছে।

প্রতিদ্বন্দী প্রধান দুই নির্বাচনী মোর্চা মহাজোট এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্বে ধর্মরিপেক্ষ দল ও ব্যক্তিবর্গের শক্ত অবস্থান দেখা গেলেও উভয় জোটেই ইসলামী দলগুলোকে সঙ্গে টানা কিংবা ধর্ম ভিত্তিক সংগঠনগুলোর আশির্বাদ লাভের চেষ্টা প্রবল।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. হারুন-উর-রশিদ বেনারকে বলেন, “গত ৮০ বছরে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজের নানাভাবে ইসলামীকরণ হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক দলগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় আবেগকে উপেক্ষা করতে পারছে না। রাজনীতিতে টিকে থাকার জন্যই তাদের ইসলামপন্থীদের সঙ্গে আপোষ করতে হচ্ছে।”

তবে আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ বেনারকে বলেন, “আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ মোটেই পরিহার করেনি। সব ধর্মের মানুষের বিশ্বাসের প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল। এ কারণে ধর্মনিরপেক্ষ এবং ইসলামী উভয় ঘরানার দলগুলো আমাদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হতে পিছপা হয়নি।”

অন্যদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশারফ হোসেন বেনারকে বলেছেন, “আমাদের সঙ্গে ইসলামপন্থীদের কখনই দ্বন্দ্ব ছিল না। আমরা ধর্মীয় মূল্যবোধের আদর্শ ধারণ করি এবং ইসলাম মনস্ক অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল হিসেবেই আমাদের পরিচিতি। সুতরাং আমাদের সঙ্গে ইসলামী দলগুলোর জোট নতুন কোনো বিষয় নয়।”

প্রধান দুই জোটে ইসলামপন্থী দল

ধর্ম নিরপেক্ষতার দাবিদার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটেই ইসলামী দলের সংখ্যা বেশি। নিবন্ধিত ১০ ইসলামী দলের মধ্যে ছয়টিই আছে ক্ষমতাসীন জোটের সঙ্গে। তারা একাধারে জোটের শরিক হিসেবে এবং স্বতন্ত্র অবস্থানে বিভিন্ন আসনে নির্বাচন করছে।

আর অনিবন্ধিত ৬০ টি ইসলামী দল ও সংগঠনের মধ্যে ২৩টি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আছে আওয়ামী লীগের সঙ্গে। এইচ এম এরশাদের জাতীয় পার্টির (জাপা) সঙ্গে আছে ৩২টি দল। সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের সমর্থক ধর্মভিত্তিক দল রয়েছে ৬১টি।

তবে নির্বাচনে আসন বণ্টনের ক্ষেত্রে ইসলামী দলগুলোকে তেমন একটা ছাড় দেয়নি আওয়ামীলীগ। সুফী মতাদর্শে বিশ্বাসী তরিকত ফেডারেশনের দু’জন ছাড়া ক্ষমতাসীন জোট থেকে ইসলামী দলগুলোর কোনো প্রার্থী নেই। আওয়ামীলীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করবেন তরিকতের প্রার্থীরা।

বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অধিকাংশ দলই ইসলামপন্থী। এর মধ্যে নিবন্ধিত দল বাংলাদেশ জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে ৪টি এবং খেলাফত মজলিশকে ২টি আসন দিয়েছে বিএনপি। জমিয়তের চার প্রার্থীর তিনজন ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে এবং একজন দলীয় প্রতীক খেজুর নিয়ে নির্বাচন করছেন। বিরোধী জোটে থেকেও আরও ১০টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে খেলাফত মজলিস।

জামায়াতের অবস্থান

ইসলামপন্থী প্রধান রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী নিবন্ধন হারিয়ে বিএনপি’র ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ২২ টি আসনে নির্বাচন করছে। এর বাইরেও জামায়াতের ৬০ জন নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিভিন্ন আসনে লড়ছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

তবে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে জামায়াতের প্রার্থীরা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকতে পারবেন কিনা তা নিয়ে নতুন সংশয় তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরীর এক রিট আবেদনের ভিত্তিতে জামায়াতের ২৫ নেতার প্রার্থিতা বাতিলের পদক্ষেপ নিতে নির্বাচন কমিশনে করা আবেদন তিন দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

“হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে তিন কর্ম দিবস সময় পাবে কমিশন। আশা করি সোমবারের মধ্যে বিষয়টি নিষ্পত্তি হবে,” বেনারকে বলেন নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা এসএম আসাদুজ্জামান।

জোটের বাইরে অবস্থান

দুই প্রধান জোটের একটিতেও না ভিড়ে এককভাবে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী দিয়েছে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। ধর্মভিত্তিক এই রাজনৈতিক দল এবার দেশের মোট ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৯৮ আসনে হাতপাখা প্রতীকে লড়াই করছে।

এককভাবে ২৪ টি আসনে মিনার প্রতীকে নির্বাচন করছে মুফতি ফজলুল হক আমিনীর দল ইসলামী ঐক্যজোট। “প্রধান দুই দলের একটিও প্রকৃত অর্থে ইসলামী আদর্শের নয়। এ কারণে আমরা জোট থেকে বেরিয়ে গেছি এবং আলাদাভাবে নির্বাচন করছি। দেশে ইসলাম ও মানুষের হক যাতে প্রতিষ্ঠিত হয় সে জন্য আমরা লড়াই করে যাব,” বেনারকে বলেন এই দলের নেতা মুফতি মো. ফয়জুল্লাহ।

মহাজোটের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে বিভিন্ন আসনে এককভাবে নির্বাচন করছে অনেকগুলো ইসলামী দল। এই জোটের শরিক জাকের পার্টি ৯৩টি আসনে গোলাপ ফুল প্রতীকে নির্বাচন করছে।

মহাজোটের কাছে একটিও আসন না পেয়ে ৫টি আসনে রিকশা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। তবে তারা জোট থেকে বেরিয়ে আসার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি।

“আমরা জাতীয় পার্টির সঙ্গে জোট করে মহাজোটের অংশ হয়েছিলাম। আমাদের কয়েকটি আসন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েও কথা রাখেনি। তাই আমরা আলাদাভাবে নির্বাচন করছি। এখন জোটে থাকা আর না থাকা একই কথা,” বেনারকে বলেন দলটির সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মাহফুজুল হক।

হেফাজতের অবস্থান

কওমি মাদ্রাসা’র ছাত্র শিক্ষকদের বড় প্ল্যাটফর্ম হেফাজতে ইসলাম সরাসরি রাজনৈতিক দল না হলেও কট্টরপন্থী ইসলামী শক্তি হিসেবে তারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ফ্যাক্টর।

তারা নির্বাচনে সরাসরি কোনো দলের পক্ষে অবস্থান নেয়নি বলে বেনারকে জানিয়েছেন, হেফাজতের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদী।

“রাজনীতি আমাদের কাজ নয়। ইমান আকিদা রক্ষায় আন্দোলন করাই আমাদের লক্ষ্য,” বেনারকে বলেন তিনি।

হেফাজত তাদের রাজনৈতিক সংস্রব অস্বীকার করলেও তাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সখ্য নিয়ে আলোচনা সমালোচনা সবচেয়ে বেশি। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হেফাজতের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা প্রদান করায় এবং তাঁকে ‘কওমি মাতা’ উপাধি দেওয়ায় এই সমালোচনা জোরালো হয়।

হেফাজতের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী গত ১ অক্টোবর এক অনুষ্ঠানে বলেন, “আওয়ামী লীগের মধ্যে এমন এমন মানুষ আছে, যারা দ্বীনকে ভালোবেসে মোটা অঙ্কের টাকা মাদ্রাসায় অনুদান দেয়।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন