Follow us

একাদশ জাতীয় নির্বাচনে ভোটযুদ্ধ চলছে

শরীফ খিয়াম ও জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2018-12-29
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকার একটি কেন্দ্রে ভোটারদের লাইন। ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮।
ঢাকার একটি কেন্দ্রে ভোটারদের লাইন। ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮।
[রয়টার্স]

আপডেট: ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮। ইস্টার্ন টাইম: রাত ১.৩০

দীর্ঘ ১০ বছর পর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন দুই জোটের মধ্যে ভোটযুদ্ধ শুরু হয়েছে। দেশের ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৯৯টি আসনে রবিবার সকাল আটটা থেকে ভোট গ্রহণ শুরু হয়েছে, বিরতি ছাড়াই চলবে বিকাল চারটা পর্যন্ত।

এবার ভোট দিচ্ছেন প্রায় সাড়ে দশ কোটি ভোটার।

এর মধ্যে ২২৭টি আসনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি। যে কারণে একাদশ সংসদ নির্বাচনের দিনটি বেশ ঘটনাবহুল হবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকাল আটটায় ঢাকার সিটি কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন বোন শেখ রেহানা এবং মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল।

ভোট দেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, নৌকার বিজয় নিশ্চিত, জয় বাংলা।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাঁকুরগাওয়ে নিজ নির্বাচনী আসনে ভোট দেন। সকাল সাড়ে আটটার দিকে ফখরুল সাংবাদিকদের জানান, এখন পর্যন্ত ভোট শান্তিপূর্ণ হচ্ছে। শান্তিপূর্ণ ভোট হলে ​ব্যালটের মাধ্যমে ভোটবিপ্লব হবে এবং বিএনপি বিজয়ী হবে।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জেলে থাকায় এবং সাজাপ্রাপ্ত হওয়ায় তিনি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন না।

দীর্ঘ ৪৫ বছর পর একটি নির্বাচনে রাজনৈতিক সরকারের অধীনে সবগুলো প্রধান দল সংসদ নির্বাচনে রয়েছে, যা ১৯৭৩ সালের প্রথম সংসদ নির্বাচনের পর আর ঘটেনি।

নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবার বিভিন্ন দল ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে এক হাজার ৮৬১ জন প্রার্থী নির্বাচনী লড়াইয়ে আছেন। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী আছেন এক হাজার ৭৩৩ জন আর স্বতন্ত্র হিসেবে লড়ছেন ১২৮ জন।

সারাদেশে মোট ৪০ হাজার ৫১টি ভোট কেন্দ্র ঠিক করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে দুই লাখ পাঁচ হাজার ৬৯১টি ভোটকক্ষ রয়েছে।

শীতের সকালে মিরপুর-২ এর শেখ ফজিলাতুন্নেসা মহিলা কলেজ কেন্দ্রে সহধর্মিনীকে নিয়ে ভোট দিতে আসেন হাজী মো. সাখাওয়াত (৬৫)। তিনি বেনারকে বলেন, “বাংলাদেশে যতবার ভোট হয়েছে ততবারই ভোট দিয়েছি। ভোট আমার নাগরিক অধিকার।”

“এখানে পরিবেশ বেশ ভালো। সকালে ভীড় কম থাকায় নির্বিঘ্নে ভোট দিয়েছি,” বলছিলেন তিনি।

ভোটের প্রাক্কালে নিহত পাঁচ

সারা দেশে ভোট শুরু হওয়ার আগের রাত ও ভোট চলাকালে দুপুর বারোটা পর্যন্ত মোট ৫ জন নিহত হওয়ার সংবাদ পাওয়া গেছে। নিহতরা সকলেই ক্ষমতাসীন দলের কর্মী।

চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার কুসুমপুর ইউনিয়নে শনিবার রাত নয়টার দিকে দ্বীন মোহাম্মদ (৩৫) নামে এক যুবলীগ কর্মীকে কুপিয়ে খুন করা হয়।

চট্টগ্রামের পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিয়ামত উল্লাহ সাংবাদিকদের জানান, বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা দ্বীন মোহাম্মদের ওপর অতর্কিত হামলা চালালে তিনি মারা যান।

এছাড়া চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালি উপজেলার কাছারিয়া এলাকায় বিএনপি-জামাত সমর্থকদের হামলায় শনিবার রাত দুইটার দিকে আহমদ কবীর (৪৮) নিহত হন বলে বেনারকে জানিয়েছেন বাঁশখালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুস সালাম।

একই রাতে ‍সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার জয়শ্রী ইউনিয়নের মহিষপুর গ্রামে বিএনপি কর্মীর আঘাতে সাইফুল ইসলাম (৪০) নামের এক আওয়ামী লীগ কর্মী নিহত হয়েছেন। তিনি মহিষপুর গ্রামের সোনা মিয়া তালুকদারের ছেলে।

এছাড়া মধ্য রাতে লক্ষ্মীপুরে বড়ালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কেন্দ্রের বাইরে দু'পক্ষের গোলাগুলির পর ডোবা থেকে এক অজ্ঞাত ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা নিহত যুবককে ছাত্রলীগ কর্মী বলে দাবি করেছেন।

চন্দ্রগঞ্জ থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ সাংবাদিকদের বলেন, নিহতের পরিচয় পাওয়া যায়নি।

এদিকে রাঙ্গামাটির ঘাগরা ইউনিয়নে বিএনপি সমর্থকদের হামলায় সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে যুবলগীরে নেতা বাসেরউদ্দিন (৩৬) নিহত হয়েছেন বলে বেনারকে জানান জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শফি উল্লাহ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভোট দেওয়ার পর রবিবার সকালে সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর এ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের ১০ জন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ভোটের আগের রাতে চারজন নিহত হয়েছে। বিএনপি–জামায়াতকে দায়ী করে তিনি বলেন, তাদের হামলায় আওয়ামী লীগের এসব নেতা–কর্মী নিহত হন।

নির্বাচন শুরুর আগে প্রায় জনশূন্য ঢাকার একটি রাস্তা। ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮। [কামরান রেজা চৌধুরী/বেনারনিউজ]
নির্বাচন শুরুর আগে প্রায় জনশূন্য ঢাকার একটি রাস্তা। ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮। [কামরান রেজা চৌধুরী/বেনারনিউজ]

কেন্দ্রে হামলা, ব্যালট লুট

নোয়াখালীর জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ইলিয়াস শরীফ জানান, শনিবার রাত আনুমানিক ১০টার দিকে প্রায় চার থেকে পাঁচশ বিএনপি জামায়াতের কর্মী নোয়াখালী-২ আসনের সোনাইমুড়ি উপজেলার মধ্য নাটেশ্বর মাদ্রাসা কেন্দ্রে হঠাৎ হামলা চালায়।

“তারা কেন্দ্রেও গুলি করে। প্রিজাইডিং অফিসারসহ পোলিং অফিসারদের আটকে রেখে নির্যাতন চালায়। ব্যালট বাক্স ভাঙচুর করে। বিজিবি এবং পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে,” জানান তিনি।

সোনাইমুড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুস সামাদ জানান, বিএনপি-জামায়াত কর্মীরা হামলায় চালিয়ে ব্যালট বাক্সসহ নির্বাচনী সরঞ্জাম লুট করে।

হামলায় প্রিজাইডিং অফিসার, সোনাইমুড়ি উপজেলার পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান ও নির্বাচনী কর্মকর্তা শেখ ফরিদসহ সাতজন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রিজাডিং অফিসারের মাথা ও পিঠের আঘাত গুরুতর হওয়ায় তাঁকে ঢাকা প্রেরণ করা হয়েছে।

অন্যদিকে ভৈরব থানার ওসি মোখলেছুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, ভৈরব উপজেলার কালিকাপ্রসাদ চরেরকান্দা প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের দখল নিতে রাত সাড়ে ১২টার দিকে বিএনপি-জামায়াতের লোকেরা হামলা চালিয়েছে।

“খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে কয়েক রাউন্ড গুলি ছুড়লে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়,” বলেন তিনি।

একটি কেন্দ্রে নির্বাচন স্থগিত

নোয়াখালী- আসনের একটি কেন্দ্রের নির্বাচন সরঞ্জাম লুট হওয়ায় ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে।

সহকারী রিটার্নি কর্মকর্তা ও বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুহুল আমিন জানান, রোববার ভোর ৫টার দিকে পূর্ব বাবুনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে হামলা হয়। এই কেন্দ্রে ভোটারের সংখ্যা ১ হাজার ৭৭৪।

মোবাইলে ইন্টারনেট বন্ধ

মোবাইলের ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করার নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। শনিবার দিবাগত রাত ১১টার দিকে মোবাইল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে এ নির্দেশনা পাঠায় বিটিআরসি। এরপর থেকে মোবাইল​ ফোনে ইন্টারনেট পাওয়া যাচ্ছে না।

এর আগে দুপুরে ফোর-জি ও থ্রি-জি সেবা বন্ধ করে টু-জি সেবা চালু রাখার নির্দেশনা দিয়েছিল সংস্থাটি।

বিটিআরসি'র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের জহুরুল হক বেনারকে বলেন, “মোইবাল ইন্টারনেট পুরোপুরি বন্ধ নয়। আপাতত ইন্টারনেটের গতি টু-জি তে নামিয়ে রাখা হয়েছে।”

“গুজব কন্ট্রোল করার জন্য জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে কর্তৃপক্ষ এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে,” বলেন তিনি।

জহুরুল হক বলেন, আজই থ্রি-জি এবং ফোর-জি সেবা আবার চালু করা হবে। তবে সেটা কখন হবে নির্দিষ্ট সেই সময় তিনি জানাতে পারেননি। তিনি বলেন, অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেবে সরকার।

নির্বাচনের সার্বিক তত্ত্বাবাধনে জেলা পর্যায়ে ৬৬ জন রিটার্নিং অফিসার এবং উপজেলা পর্যায়ে ৫৮২ জন সহকারী রিটার্নিং অফিসার দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের অধীনে দুই লাখ সাত হাজার ৩১২ জন সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার এবং চার লাখ ৬২৪ জন পোলিং অফিসার ভোট গ্রহণের কাজে যুক্ত আছেন।

পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি, আনসার, গ্রাম পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মোট ছয় লাখ আট হাজার সদস্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়িত্ব পালন করছেন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. অরুন কুমার গোস্বামী বেনারকে বলেন, “দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার জন্য এই নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”

সংশোধন: ভুলবশত এর পূর্বে বাসেরউদ্দিন নাম আবদুল বাসেত ছাপা হয়েছিলো। নামটি সংশোধন করা হলো।

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন ঢাকা থেকে কামরান রেজা চৌধুরী।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন