Follow us

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে লাইসেন্স লাগবে: টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী

শরীফ খিয়াম
ঢাকা
2019-10-30
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকায় নিজের অফিস কক্ষে রাশিয়ার কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলছেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। ২৯ অক্টোবর ২০১৯।
ঢাকায় নিজের অফিস কক্ষে রাশিয়ার কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলছেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। ২৯ অক্টোবর ২০১৯।
ছবি:পিআইডি

ফেসবুক ও ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের ‘কনটেন্ট’ (প্রকাশনা) নিয়ন্ত্রণে সক্ষমতার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি স্থাপন করা হয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু হয়নি। বর্তমানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বৃহস্পতিবার বেনারকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, “আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করতে আরো একটু সময় লাগবে। কারণ এর সাথে কিছু জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমও জড়িত।”

“সচেতনতা তৈরির কাজটি আমরা অবিলম্বেই শুরু করতে যাচ্ছি। তবে তা বাস্তবায়ন করতে একটু সময় লাগবে। আসলে আমরা এখানে যে পদ্ধতিতে কাজটা করতে চাচ্ছি তাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের একটা ‘লাইসেন্স’ (অনুমতিপত্র) করতে হবে,” যোগ করেন মন্ত্রী।

একটা ‘সফটওয়্যার ডাউনলোড’ করে খুব সহজে লাইসেন্সটি করা যাবে জানিয়ে মোস্তাফা জব্বারও বলেন, “আমাদের দেশের লোকজনের স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভালো কাজ করার ইচ্ছে সহজে হয় না। যে কারণে এই ‘লাইসেন্স’ করাতে হয়তো আমাদের একটু কষ্ট করতে হবে।”

মন্ত্রী আরও বলেন, “যন্ত্রপাতি বসানো যেহেতু হয়ে গেছে, বাকি কাজও সহসাই হয়ে যাবে বলে আশা করছি।”

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আলী আর রাজী মনে করেন, “এটা খুবই উচ্চাভিলাষী কর্মসূচি।”

“এটা খুবই বিপ্লবাত্মক চিন্তা। খুব বেশি আইনি শক্তি প্রয়োগ করতে হবে এমন কিছু করতে হলে,” বেনারকে বলেন আলী আর রাজী।


সাইট নয়, ‘কনটেন্টনিয়ন্ত্রণ

বেনারকে মন্ত্রী জানিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সাইট নয়, সেখানে প্রকাশিত ‘কনটেন্ট’ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে সরকার। দেশের বাইরে বসেও কেউ আপত্তিকর কিছু প্রকাশ করলে তা এখানে দেখা যাবে না।

“আমরা যে কোনো ‘কনটেন্ট ব্লক’ (প্রকাশনা অবরুদ্ধ) করতে পারবো। আপনার ‘একাউন্টের’ একটা ‘কমেন্ট’ আমার মুছে ফেলা দরকার হলে আমি সেটাও মুছে ফেলতে পারব,” উল্লেখ করে তিনি জানান, তবে বাংলাদেশের বাইরে থেকে সেগুলো দেখা যাবে।

মন্ত্রী বলেন, “দেশের বাইরে-তো আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না। কারণ ফেসবুক দুনিয়া জুড়ে চলবে। আমরা শুধু বাংলাদেশ ভূখণ্ডে ‘সাইবার’ সুরক্ষা দিতে সক্ষম। পর্ণসাইটগুলো যেমন শুধু বাংলাদেশে বন্ধ করা হয়েছে, বিভিন্ন কনটেন্ট এবং অন্যান্য ক্ষেত্রেও যেটা হবে সেটা শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই হবে।”

নিউ মিডিয়া বিষয়ক গবেষক নির্ঝর মজুমদার বেনারকে বলেন, “চীনের ‘গ্রেট ফায়ারওয়ালের’ আদলে এটি এমনই একটি বিপজ্জনক প্রযুক্তি, যা ব্যবহারের সুস্পষ্ট নীতিমালা জনসমক্ষে প্রকাশ না করেই যদি সরকার প্রয়োগ করে, তবে তার অপব্যবহার হবেই।”

“ইতিপূর্বে শুধুমাত্র চীন এই প্রযুক্তি প্রয়োগ করতে পেরেছে। কারণ তারা একদলীয় শাসনের দেশ, বাংলাদেশ তা নয়। এটা ‘সেন্সরশিপের’ চেয়েও খারাপ। গণতান্ত্রিক দেশে এমন প্রযুক্তির ব্যবহার নিঃসন্দেহে প্রচণ্ড অগণতান্ত্রিক,” যোগ করেন তিনি।

তাঁর মতে, শুধুমাত্র জঙ্গিবাদ, বা শিশু পর্ণগ্রাফির মতো ‘ট্রান্সন্যশনাল বা অরগানাইজড ক্রাইমের’ মতো  বিষয় ছাড়া অন্য যে কোনো ক্ষেত্রে এই ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার হিতে বিপরীত হতে পারে।

এই প্রযুক্তির প্রয়োগ মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করবে বলে মনে করে আলী আর রাজীও।

তবে মন্ত্রী বলেন, “মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সম্মান দেখিয়ে আসছি এবং দেখিয়ে যাবো। কিন্তু কেউ স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুর (জাতির পিতা শেখ মুজিবর রহমান) বিরোধীতা করলে, সেক্ষেত্রে কোনো আপোষ করা হবে না।”

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) মূলত এ ক্ষেত্রে প্রধান কর্তৃপক্ষ হলেও সাইবার ক্রাইম পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণে যে বিশেষ প্রকল্প চালু আছে, তারই আওতায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রকাশনা যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে সরকার।

“এই প্রকল্পের আওতায় আমরা পর্ণ এবং জুয়ার সাইটগুলো বন্ধ করেছি। নইলে এত দ্রুত ২৫ হাজার সাইট বন্ধ করা সম্ভব ছিল না,” বলেন মন্ত্রী।

প্রসঙ্গ: ফেসবুক আইডি ব্লক

গত ৫ অক্টোবর থেকে ফেসবুকে নিজের ‘অ্যাকাউন্টে’ ঢুকতে পারছেন না বাংলাদেশের ইংরেজি দৈনিক নিউ এইজ-এর সম্পাদক নূরুল কবির। সিনিয়র এই সাংবাদিকের বরাত দিয়ে ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউ ল্যাব) শিক্ষক আজফার হোসেন ১৬ অক্টোবর ফেসবুকেই লিখেছিলেন, “সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ তাঁর ‘ফেসবুক অ্যাকাউন্ট’ বন্ধ করে দিয়েছে৷”

এর আগে আলোচিত সাংবাদিক গোলাম মর্তুজাসহ অনেক রাজনৈতিক কর্মী, আইনজীবী, ব্লগার এবং মানবাধিকার কর্মীও নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ঢুকতে না পেরে একই ধরনের অভিযোগ করেছিলেন।

এ ব্যাপারে মন্ত্রীর বক্তব্য, “এসব বাজে কথা। আমরা কোনো ‘অ্যাকাউন্ট ব্লক’ করতে পারি না। এটা শুধু ফেসবুক কর্তৃপক্ষ পারে। আর আমার জানা মতে নুরুল কবির, গোলাম মর্তুজা বা এমন কারও ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার কোনো অনুরোধ সরকারের পক্ষ থেকে করা হয়নি।”

“সরকারের করার দরকার হয় না, ‘পাবলিকের রিপোর্টের’ (জনগণের অভিযোগের) ভিত্তিতেও ব্যবস্থা নেয় ফেসবুক। এ ক্ষেত্রে সরকারের কিছু করারও নেই। তারা যদি এমন কিছু প্রকাশ করে থাকে, যা জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস বা নৈরাজ্য তৈরি করার মতো, সেটা যে কেউ রিপোর্ট করতে পারে।”

সরকার মূলত তিনটি বিষয়কে নজর দেয়; নিরাপত্তা, জুয়া এবং পর্ণগ্রাফি। এই কাতারে যেসব প্রকাশনা, পেইজ বা একাউন্ট পরে সেগুলো সম্পর্কে রাষ্ট্রীয়ভাবে ফেসবুককে অভিযোগ জানানো হয়।

আরো কঠোর হচ্ছে আইন

তীব্র সমালোচনার মুখে ২০১৮ সালে বাংলাদেশের সংসদে পাস হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি ‘দুর্বল’ হয়েছে, আরেকটু শক্ত করা উচিত ছিল,’ উল্লেখ করে মন্ত্রী জানান, দেশের স্বার্থ ও নাগরিক সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতে আইনটির কিছু জায়গায় পরিবর্তন আনা দরকার।

“ফ্রান্স ফেসবুককে ৩২ বিলিয়ন ডলার জরিমানা করেছে, আমাদের আইনেও এমন ব্যবস্থা থাকলে ফেসবুক যখন আমাদের অবজ্ঞা করেছিল তখন আমরা তাদের জরিমানা করতে পারতাম। কিন্তু ‘সোশ্যাল মিডিয়ার’ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো কোনো বিধিবিধান সেখানে রাখা হয়নি,” বলেন মন্ত্রী।

ফেসবুক বা ইউটিউবের মতো সাইটগুলোর কাছে বারবার চেয়েও নিয়ন্ত্রণ না পেয়ে বাংলাদেশ বিকল্প পথে সেগুলোর প্রকাশনা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিতে বাধ্য হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন সফল এই প্রযুক্তি উদ্যোক্তা।

“সোশ্যাল মিডিয়াগুলো যদি বাংলাদেশি নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য কখনো আমাদের অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করে, সে ক্ষেত্রেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো বিধান আমাদের নেই,” যোগ করেন তিনি।

এ ছাড়া ‘ডেটা সিকিউরিটি’ এবং ‘প্রাইভেসির’ বিষয়ও আইনে সংযুক্ত করার কথা ভাবছে সরকার।

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা কমিটির উদ্যোগে গত ২৯ জুন ঢাকায় আয়োজিত ‘তারুণ্যের ভাবনায় আওয়ামী লীগ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে মন্ত্রী জব্বার জানান, চলতি বছরের শেষ দিকে  সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম ইউটিউব নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হবে বাংলাদেশ।

পরদিন বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, “সেপ্টেম্বরের পর থেকে আমরা এ ক্ষেত্রে সরাসরি হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা অর্জন করবো। ফলে কেউ ইচ্ছা করলেই ফেসবুক-ইউটিউবে যা খুশি প্রচার করতে পারবে না।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন