Follow us

অগ্নি দুর্ঘটনা রোধে নির্দেশনা দিলেন প্রধানমন্ত্রী

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2019-04-01
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
বনানীর দুদিন পরেই আরেকটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যায় গুলশান-১ এর ডিএনসিসি মার্কেট। এতে পুড়ে যায় দুইশতাধিক দোকান। ৩০ মার্চ ২০১৯।
বনানীর দুদিন পরেই আরেকটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যায় গুলশান-১ এর ডিএনসিসি মার্কেট। এতে পুড়ে যায় দুইশতাধিক দোকান। ৩০ মার্চ ২০১৯।
[নিউজরুম ফটো]

রাজধানীতে বিভিন্ন অগ্নি দুর্ঘটনার প্রেক্ষাপটে এবার কঠোর হচ্ছে সরকার। অগ্নিকাণ্ড রোধ এবং এর ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে বহুতল ভবন মালিকদের জন্য বছরের শুরুতে দমকল বাহিনীর ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট গ্রহণ, বিল্ডিং কোড অনুসরণসহ ১৫টি নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সোমবার সকালে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে সভাপতিত্বকালে এসব নির্দেশনা দেন তিনি। পাশাপাশি বনানীর এফআর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনায় বৈঠকে শোক প্রকাশ করা হয়।

বৈঠক শেষে মন্ত্রী পরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম সাংবাদিকদের এসব কথা জানান।

এদিকে রাজধানীর সুউচ্চ ভবনগুলোর নির্মাণ ও নিরাপত্তা ত্রুটি চিহ্নিত করতে মাঠে নেমেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। রাজধানীর উঁচু ভবনগুলোর নকশা পরীক্ষা করতে আটটি অঞ্চলে সোমবার থেকে একযোগে এই অভিযান শুরু করেছে রাজউকের ২৪টি দল।

এ ছাড়া উচ্চ আদালত ঢাকার বহুতল ভবনগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তায় বা অগ্নিদুর্ঘটনা মোকাবিলায় কী ব্যবস্থা আছে সে বিষয়ে একটি যৌথ প্রতিবেদন চেয়েছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনার মাধ্যমে হয়তো এবার ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে।

“তবে শুধু প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাতে হবে না। আনুষঙ্গিক কার্যক্রম দ্রুত এবং সমান্তরালভাবে করতে হবে,” বেনারকে বলেন নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব।

“যেমন এ নির্দেশনার সাথে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড, যেটি ২০১০ সালে অনেক ধরনের পেশাজীবী বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে পরিশীলিত করে জমা দেওয়া হয়; সেটি যেন জরুরি ভিত্তিতে অনুমোদন করা হয়,” তিনি বলেন।

“রাজউক শুধু ঢাকায় আছে। কিন্তু আগুন সারা দেশে লাগছে। সারা বাংলাদেশে নিয়ম কানুন মেনে চলার জন্য ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড পাস করতে হবে। এটাকে আইনি সিল দিতে হবে। কারণ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা আইন নয়,” বলেন এই স্থপতি।

এ ছাড়া রাজউককে ঢেলে সাজিয়ে কারিগরি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার প্রতিও গুরুত্ব দেন ইকবাল হাবিব।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা

মন্ত্রিপরিষদ সচিব সাংবাদিকদের বলেন, “শিল্প কারখানার ক্ষেত্রে প্রতিবছর ফায়ার ক্লিয়ারেন্স নবায়ন করা লাগলেও বহুতল বাণিজ্যিক ভবনের ক্ষেত্রে এই নিয়ম নেই। বছর বছর এটি নবায়ন করার ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বহুতল ভবন তৈরির ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিস সাধারণত একটি ক্লিয়ারেন্স দেয়। এখন ক্লিয়ারেন্সই যথেষ্ট নয়, এটি পরিদর্শন করে এখানে বহুতল ভবন নির্মাণযোগ্য কি না তা পরীক্ষা করে দেখতে হবে।

বিল্ডিং কোড অনুসরণ করা, প্রতি তিন মাসে একবার অগ্নিনির্বাপণ মহড়া করা, পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অনুসরণ করা, আগুন নেভাতে পানির অভাব দূর করার জন্য রাজধানীর যেখানে যেখানে সম্ভব জলাশয় বা জলাধার তৈরি করা এবং বিদ্যমান লেকগুলো সংরক্ষণ করার নির্দেশনাও দেন প্রধানমন্ত্রী।

ভবন নির্মাণের সময় পরিবেশ এবং বাস্তবতার নিরিখে বহুতল ভবনের নকশা প্রণয়ন করা, পুরো ভবন কাচ দিয়ে না ঘিরে বারান্দা বা জানালা নির্মাণ করা, ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে শতভাগ ফায়ার এক্সিট নিশ্চিত করা, প্রতিটি ভবনে কম করে হলেও দুটি এক্সিট পয়েন্ট থাকা, হাসপাতাল এবং স্কুলগুলোতে রুমের বাইরে বারান্দা বা খোলা জায়গা রাখার প্রতিও গুরুত্ব দেন শেখ হাসিনা।

এ ছাড়া সচেতনতা সৃষ্টিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বৃদ্ধিরও নির্দেশনা দেন তিনি।

ত্রুটিপূর্ণ ভবন চিহ্নিতকরণ শুরু

এদিকে বনানীর এফআর টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের চার দিনের মাথায় সোমবার থেকে রাজধানীর ভবনগুলোর নির্মাণ ও নিরাপত্তা ত্রুটি চিহ্নিত করা শুরু করেছে রাজউকের ২৪টি দল। রাজউকের একজন করে অথরাইজড অফিসার, সহকারী অথরাইজড অফিসার, প্রধান ইমারত পরিদর্শক ও ইমারত পরিদর্শক আছেন প্রতিটি দলে।

ঢাকাকে আটটি অঞ্চলে ভাগ করে একযোগে কাজ শুরু হয়েছে বলে বেনারকে জানান রাজউকের আইন বিষয়ক পরিচালক আনন্দ কুমার বিশ্বাস।

১০ তলার বেশি বহুতল ভবনগুলোয় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, জরুরি নির্গমন পথ ও অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে কিনা খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান তিনি।

রাজউক সূত্রে জানা যায়, এই অভিযানে তথ্য সংগ্রহ করার পর তা জনসম্মুখে প্রকাশ করা হবে। পরে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হবে।

প্রসঙ্গত, গত ২৮ মার্চ ঢাকার অভিজাত এলাকা বনানীর কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউয়ের ২৩ তলা এফআর টাওয়ারে আগুন লেগে ২৬ জনের মৃত্যু হয়। আর আহত হন অর্ধশতাধিক মানুষ। এর দুদিন পরে ২০ মার্চ গুলশানের ডিএনসিসি মার্কেটে আগুন লাগে। এতে প্রায় দুইশ’রও বেশি দোকান পুড়ে যায়।

এদিকে এফআর টাওয়ারের জমির মালিক প্রকৌশলী এস এম এইচ আই ফারুক এবং বর্ধিত অংশের মালিক তাসভির উল ইসলামকে গতকাল রবিবার সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আদেশ দিয়েছে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত। শনিবার রাতে তাঁদের আটক করে পুলিশ।

অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা জানতে চায় আদালত

ঢাকার বহুতল (সাত তলা বা তার উপরে) ভবনগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তায় বা অগ্নিদুর্ঘটনা মোকাবেলায় কী ব্যবস্থা আছে সে বিষয়ে একটি যৌথ প্রতিবেদন চেয়েছে উচ্চ আদালত। অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন ২০০৩ ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ২০১২ অনুযায়ী বিষয়গুলো জানতে চাওয়া হয়।

একটি কমিটি করে চার মাসের মধ্যে রাজউক, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস এবং সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে সোমবার রুলসহ এ আদেশ দেয় বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ ও বিচারপতি মো. ইকবাল কবিরের হাইকোর্ট বেঞ্চ।

এ ছাড়া সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি, লোকবলসহ বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস এবং সিভিল ডিফেন্স সক্ষমতা জানতে এক মাসের মধ্যে সংস্থাটির মহাপরিচালককে প্রতিবেদন দিতে বলেছে উচ্চ আদালত।

রাজধানীর চকবাজারের চুড়িহাট্টা, বনানীর এফআর টাওয়ার, গুলশানের ডিএনসিসি মার্কেটসহ বিভিন্ন অগ্নিকাণ্ডে হতাহতদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণসহ এ সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি নির্দেশনা চেয়ে আগের দিন রিট আবেদনটি করেন গুলশান সোসাইটির মহাসচিব ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শুক্লা সারওয়াত সিরাজ।

শুনানি শেষে তিনি বেনারকে বলেন, “ঢাকা শহরে অগ্নিদুর্ঘটনা মোকাবিলায় যান্ত্রিক সুবিধা, লোকবলসহ সামগ্রিক কী কী ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন সে বিষয়ে বুয়েট-জাপান ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার প্রিভেনশন অ্যান্ড আরবান সেফটি বিভাগের কাছ থেকে একটি বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদন নিয়ে তা দাখিল করতে বলেছেন আদালত।”

রুলে স্বাধীন তদন্তের পর চকবাজার ও এফআর টাওয়ারের অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে, জনসচেতনতা বাড়াতে জাতীয় পাঠ্যপুস্তকে অগ্নিদুর্ঘটনা ও মোকাবিলা বিষয়ে প্রশিক্ষণমূলক সূচি অন্তর্ভুক্ত করতে এবং গুলশান এলাকায় ফায়ার স্টেশন স্থাপনে জমি বরাদ্দের কেন নির্দেশনা দেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের দুই সপ্তাহের রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন