Follow us

ফিটনেসবিহীন গাড়িকে জ্বালানি নয়: হাইকোর্ট

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2019-10-23
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
পুরনো একটি বাসকে রঙ করা হচ্ছে। ছবিটি মিরপুর থেকে নেয়া। ঢাকা, আগস্ট ১০, ২০১৯।
পুরনো একটি বাসকে রঙ করা হচ্ছে। ছবিটি মিরপুর থেকে নেয়া। ঢাকা, আগস্ট ১০, ২০১৯।
ছবি: কামরান রেজা চৌধুরী

ফিটনেসবিহীন যানবাহনে সব ধরনের জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করতে নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

বুধবার ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে নেয়া সরকারের ব্যবস্থা নিয়ে পর্যালোচনার পর এই আদেশ দেন বিচারপতি নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কে এম হাফিজুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের বেঞ্চ।

রাষ্ট্রপক্ষের প্রতিনিধিত্বকারী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল একেএম আমিন উদ্দিন মানিক সাংবাদিকদের বলেন, “রাস্তায় ফিটনেসহীন যত গাড়ি চলছে- সেগুলোতে কোনো ফিলিং স্টেশন থেকে পেট্রোল, গ্যাস, তেলসহ জ্বালানি সরবরাহ না করতে আদেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।”

তিনি বলেন, “আমরা এই আদেশ যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেব। আমরা আদালতের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আমরাও মনে করি ফিটনেসবিহীন যানবাহন রাস্তা থেকে সরিয়ে ফেলা দরকার।”

এ বছর মার্চে ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচলের ওপর সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের পর স্বপ্রণোদিত হয়ে সরকারের প্রতি রুল জারি করে হাইকোর্ট।

ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তা জানতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)এবং সড়ক আইন প্রয়োগকারী সংস্থা পুলিশকে নির্দেশ দেয় আদালত।

বুধবার বিআরটিএ এবং পুলিশের দেয়া প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এই আদেশ দেন আদালত।

বিআরটিএ’র তথ্য অনুসারে, বর্তমানে সারাদেশে মোট প্রায় ৪২ লাখ নিবন্ধিত যানবাহন রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ লাখ ১৭ হাজার ৯৯৬টি যানবাহনের ফিটনেস সার্টিফিকেট নেই।

বিআরটিএ’র পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) লোকমান হোসেন মোল্লা বেনারকে বলেন, “ওই পাঁচ লাখ ১৭ হাজার ৯৯৬টি যানবাহনের মালিক গত পাঁচ থেকে ১০ বছর বিআরটিএ থেকে ফিটনেস সার্টিফিকেট নেননি। তবে, ফিটনেস সার্টিফিকেট নেয়া যানবাহনের গ্লাস না থাকা, অথবা অন্যকোন কিছুর ব্যতয় ধরলে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের সংখ্যা অনেক বেশি হবে।”

তিনি বলেন, “ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব পুলিশের ওপর। আমাদের নয়। আমরাও চাই রাস্তা থেকে ফিটনেসবিহীন যানবাহন বন্ধ হোক।”

বিশ্লেষকদের মতে, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, লাইসেন্সবিহীন চালক ও বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। নিহতদের অধিকাংশই বয়সে যুবক অথবা অর্থনৈতকিভাবে সচল।

বিআরটিএ’র দুর্ঘটনা ডাটা বিশ্লেষণ কর্মকর্তা আবু বক্কর সিদ্দিক বেনারকে বলেন, ২০১৭ সালে সারাদেশে দুই হাজার ৫৬২ টি সড়ক দুর্ঘটনায় দুই হাজার ৫১৩ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। আহত হয়েছেন এক হাজার ৮৯৮ জন।

তার দেয়া তথ্য অনুসারে, পরের বছর ২০১৮ সালে দুর্ঘটনা এবং হতাহতের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে।

২০১৮ সালে সারাদেশে দুই হাজার ৬০৯টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণহানি ঘটেছে দুই হাজার ৬৩৫ জন মানুষের। আহত হয়েছেন এক হাজার ৯২০ জন।

সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধে প্রায়ই দেশের বিভিন্ন অংশে আন্দোলনের সুত্রপাত হয়।

সাম্প্রতিক বছরে সবচে বড় আন্দোলন শুরু হয় গত বছরের ২৯ জুলাই। বেপরোয়া গতির একটি বাস ঢাকার শহীদ রমিজউদ্দিন স্কুল ও কলেজের অপেক্ষমান দুই শিক্ষার্থীকে চাপা দিয়ে হত্যা করলে ঢাকাসহ সারাদেশে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা রাস্তায় নেমে আসে।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে ঢাকাকে সাতদিন সারাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে আন্দোলনকারীরা। সরকার সেই আন্দোলনকে যৌক্তিক বলে অভিহিত করে। কিন্ত পরে পুলিশি অভিযানের মাধ্যমে সেই আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটে।

আন্দোলনকারীদের দাবির মুখে গত বছর ৮ অক্টোবর সড়ক আইন পাশ করা হয় সংসদে।

এই আইন অনুযায়ী, মোটরযান চালনাজনিত কোনো দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তি গুরুতর আহত বা নিহত হলে এ সংক্রান্ত অপরাধ বিচারে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি অনুযায়ী অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

আইনে বলা হয়, কোনো ব্যক্তির কারণে সংঘটিত কোনো দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তি গুরুতরভাবে আহত বা নিহত হলে চালক সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

শ্রমিক ও মালিকদের বিরোধিতায় এই আইন কার্যকর করতে গেজেট প্রকাশ করা যায়নি। শ্রমিক নেতারা ২৫ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে দেখা করে এই আইন সংশোধনের দাবি তুলেছে। মন্ত্রী বলেছেন, প্রয়োজনে ওই আইন সংশোধন করা হবে।

তবে বুধবার এক গেজেটের মাধ্যমে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ কার্যকারিতার তারিখ ঘোষণা করা হয়। গেজেট অনুসারে, আগামী পয়লা নভেম্বর থেকে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ কার্যকর হবে।

ফিটনেসবিহীন গাড়ির কারণে সারাদেশে বায়ুমানের ক্রমাবনতি ঘটছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক জিয়াউল হক বেনারকে বলেন, “পুরাতন ও ফিটনেসবিহীন যনবাহনের কারণে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বায়ুমান খারাপ হয়। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে। বৃষ্টিপাত কমে গেলে বাতাসে পার্টিকেলের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।”

তিনি বলেন, “বায়ুমান খারাপ হলে তা জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্নক প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগবালাই দেখা দেয়।”

পরিবেশ অধিদপ্তরের বায়ুমান মনিটরিং প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিবছর নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন শহরে বায়ুমান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ন থাকে। হাসপাতালে শ্বাসকষ্ট জনিত রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পায়।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন