Follow us

মজুরি নিয়ে অসন্তোষ: তৈরি পোশাক শ্রমিকেরা চারদিন ধরে রাস্তায়

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2019-01-09
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে ঢাকার মিরপুর এলাকায় সড়ক অবরোধ করে রাখেন বিক্ষোভকারী গার্মেন্টস শ্রমিকরা। ৯ জানুয়ারি ২০১৯।
মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে ঢাকার মিরপুর এলাকায় সড়ক অবরোধ করে রাখেন বিক্ষোভকারী গার্মেন্টস শ্রমিকরা। ৯ জানুয়ারি ২০১৯।
[মেঘ মনির/বেনারনিউজ]

মজুরি নিয়ে শ্রমিকদের চলমান অসন্তোষ থামছেই না। প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকায় অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ছে।

সরকার ঘোষিত নতুন মজুরি বোর্ডের নানা অসংগতির বিরুদ্ধে বুধবার টানা চতুর্থ দিনের মতো ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও মিরপুরে রাস্তায় বিক্ষোভ করেছেন তৈরি পোশাক শিল্পের হাজার হাজার শ্রমিক।

বিক্ষোভ ও পুলিশের সাথে দফায় দফায় সংঘর্ষে অচল হয়ে পড়ে ঢাকা মহানগরীর কিছু অংশ এবং সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও আশেপাশের এলাকা।

শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, গত চার দিনের বিক্ষোভের সময় পুলিশি অ্যাকশনে একজন নিহত ও কমপক্ষে দুই শতাধিক শ্রমিক আহত হয়েছেন।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বুধবার বেশ কিছু কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে বেনারকে জানিয়েছেন তৈরি পোশাক শিল্প কারখানার মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান।

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বুধবার গাজীপুরে আধা-সামরিক বিজিবি মোতায়েন করা হয় বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন গাজীপুর জেলা প্রশাসক দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ূন কবির।

তবে বিকালের পর থেকে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে। ঢাকা-আরিচা, ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল রুটে যান চলাচল শুরু হয়েছে।

কেন এই বিক্ষোভ?

তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির জন্য ২০১৮ সালে মজুরি বোর্ড গঠন করে সরকার। কিন্তু জানুয়ারি মাসে নতুন মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে দেখা যায় অনেক শ্রমিকের বেতন বর্তমান মজুরির চেয়ে কম।

পোশাকশিল্প মালিকেরা বাড়িভাড়া, যাতায়াত, খাদ্য ও চিকিৎসা ভাতা বাড়িয়ে দিলেও মূল মজুরি বাড়াতে কৃপণতা করেছেন। গত পাঁচ বছরে শ্রমিকের মূল মজুরি ৫ শতাংশে হারে বৃদ্ধির বিষয়টিও আমলে নেওয়া হয়নি। ফলে নতুন শ্রমিকের মোট মজুরি ২ হাজার ৭০০ টাকা বৃদ্ধি পেলেও দক্ষ বা পুরোনোদের তার অর্ধেকও বাড়েনি। মালিকপক্ষের এই কৌশলের জন্যই বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন শ্রমিকেরা।

বুধবারও প্রথমে মিরপুর, এরপর উত্তরায় শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করতে থাকেন। সোমবার ও মঙ্গলবার ঢাকার বিমানবন্দর সড়ক কয়েক ঘণ্টার জন্য বন্ধ করে দেয় শ্রমিকরা।

বুধবার সেই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে আশুলিয়া, সাভার, গাজীপুর, মিরপুর ও অন্যান্য এলাকায়। তাঁরা রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে প্রতিবাদ করতে থাকেন। বন্ধ হয়ে যায় ঢাকা-আরিচা, ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা ময়মনসিংহ মহাসড়ক।

বিক্ষুদ্ধ শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে ও কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা।

গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশু বেনারকে বলেন, “গত চারদিনে প্রতিবাদ করতে গিয়ে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে একজন শ্রমিক নিহত এবং দুই শতাধিক শ্রমিক আহত হয়েছে। তার মধ্যে আজ বুধবার সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও মিরপুরে সংঘর্ষে শতাধিক শ্রমিক আহত হয়েছে।”

তিনি বলেন, “মঙ্গলবার নিহত শ্রমিক আনলিমা অ্যাপারেলের সুমন মিয়া। সে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়।”

মিশু বলেন, “২০১৮ সালের মজুরি বোর্ডের মজুরি নির্ধারণে সাতটি গ্রেডের মধ্যে তিন, চার ও পাঁচ নম্বর গ্রেডের শ্রমিকদের বেতন ২০১৩ সালের মজুরি বোর্ডের হিসাবের চেয়ে কমে গেছে।”

তিনি বলেন, “তৈরি পোশাক শিল্পের শতকরা ৮০ ভাগের বেশি কর্মী তিন, চার ও পাঁচ গ্রেডের মধ্যে পড়েন। তাদের বেতন ২০১৮ সালের মজুরি বোর্ড অনুসারে বৃদ্ধির চাইতে কমে গেছে। সে কারণে শ্রমিকরা রাস্তায়।”

মিশু বলেন, “সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে একমাসের মধ্যে এই সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু আমরা দেখতে চাই, মালিক পক্ষ মজুরির যে অসঙ্গতি রয়েছে সেগুলো দূর করে কি না। অন্যথায় শ্রমিকেরা আবার রাস্তায় নামবে।”

সাভারের একটি কারখানায় কর্মরত সালেহা নামের এক শ্রমিক বেনারকে বলেন, “আমরা শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করছিলাম। কিন্তু কোনো উসকানি ছাড়াই আমাদের ওপর পুলিশ লাঠিপেটা করেছে। গ্যাস মেরেছে।”

তবে পুলিশ এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, শ্রমিকদের আক্রমণে বেশ কিছু পুলিশ সদস্য আহত হয়েছে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ এর নির্বাহী পরিচালক সুলতান উদ্দিন খান বুধবার বেনারকে বলেন, “২০১৮ সালের যে মজুরি কাঠামো ঘোষণা করা হয়েছে, সেখানে অপারেটরদের মজুরি নিয়ে অসঙ্গতি রয়েছে। এই মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুসারে অপারেটরদের বেতন বাড়ার চাইতে কমে গেছে। সেকারণেই শ্রমিকেরা রাস্তায় নেমেছে।”

তিনি বলেন, “বলা হচ্ছে ন্যূনতম মজুরি ৫,৩০০ টাকা থেকে ৮,০০০ টাকা করা হয়েছে। মজুরি বেড়েছে ২,৭০০ টাকা। কিন্তু সেটা বেড়েছে সর্বনিম্ন ধাপে। সব ধাপে বেতন বাড়েনি। বরং ২০১৩ সালের মজুরি বোর্ডের চেয়ে কমেছে।”

উদাহরণ হিসাবে তিনি বলেন, ২০১৮ সালের মজুরি বোর্ডের স্কেল অনুসারে ৪,৯৩০ টাকা মূল মজুরি ধরে একজন অপারেটরের মোট মজুরি ধরা হয়েছে ৯,২৪৫ টাকা।

“কিন্তু দেখা গেছে ২০১৩ সালের মজুরি বোর্ড অনুসারে বর্তমানে অনেক অপারেটরের মূল বেতন ৪,৯৩০ টাকার বেশি,” বলেন তিনি।

সুলতান উদ্দিন বলেন, “২০১৩ সালের মজুরি বোর্ড অনুসারে একজন অপারেটরের মূল মজুরি ছিল ৩৮০০ টাকা। প্রতি বছর মূল বেতনের শতকরা পাঁচ ভাগ বৃদ্ধি হয়।”

তিনি বলেন, “মূল মজুরি কমে গেলে বাসা ভাড়া, ওভার টাইম সবকিছুই কমে যায়। মালিক পক্ষের উচিৎ অতিসত্বর মজুরি বোর্ডের এই অসঙ্গতি দূর করে সঠিক মজুরি পুনঃনির্ধারণ করা। অন্যথায় শ্রমিক অসন্তোষ বন্ধ হবে না।”

সাবেক শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক বলেন, “শ্রমিকদের রাস্তায় নামার কারণ অযৌক্তিক নয়।”

বেনারকে তিনি বলেন, “নতুন মজুরি বোর্ড অনুসারে কিছু শ্রমিকের বেতন কমেছে। আসলে আমরা মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্ত ঘোষণার সময় এগুলো বুঝতে পারিনি। বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সমস্যা দেখা দিচ্ছে,” স্বীকার করেন চুন্নু।

সদ্য সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী মনে করেন, “এখন সরকারের উচিৎ মালিক-শ্রমিক দুই পক্ষের সাথে আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা। অন্যথায় আমাদের শিল্পের ক্ষতি হয়ে যাবে।”

তৈরি পোশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বেনারকে বলেন, “আমরা বলেছি, মজুরির অসঙ্গতি আমরা পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেব। গত রাতে সরকার মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধিদের নিয়ে কমিটি করে দিয়েছেন। এরপরও কেন সহিংসতা?”

এদিকে নবনিযুক্ত বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বুধবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন, আগামী একমাসের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামোর সমস্যাগুলো সমাধান হবে।

তিনি বলেন, “নতুন বেতন কাঠামোর কারণে কোনও শ্রমিকের যদি বেতন কমে যায় তাহলে তা আগামী মাসের বেতনের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিশোধ করা হবে।”

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, “নতুন বেতন কাঠামোর অসঙ্গতি দূর করতে শ্রমিক পক্ষের পাঁচজন, মালিক পক্ষের পাঁচজনসহ শ্রম এবং বাণিজ্য সচিবের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি কাজ করবে। এই কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর গার্মেন্ট শ্রমিকদের বেতনের বিষয়ে আর কোনো সমস্যা থাকবে না।”

তিনি গার্মেন্ট শ্রমিকদের কাজে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন