Follow us

সাংবাদিক সুবর্ণা নদী হত্যায় সাবেক শ্বশুর গ্রেপ্তার

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2018-08-29
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
সাংবাদিক সুবর্ণা নদী হত্যার প্রতিবাদে ও বিচার দাবিতে পাবনায় সাংবাদিকদের মানবন্ধন। আগস্ট ২৯, ২০১৮।
সাংবাদিক সুবর্ণা নদী হত্যার প্রতিবাদে ও বিচার দাবিতে পাবনায় সাংবাদিকদের মানবন্ধন। আগস্ট ২৯, ২০১৮।
নিউজরুম ফটো।

পাবনায় সাংবাদিক সুবর্ণা নদী হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন কয়েকটি জেলার সাংবাদিকেরা। একই সঙ্গে সারা দেশে সাংবাদিকদের হত্যা ও নির্যাতনকারীদের বিচারের দাবি জানান তাঁরা।

মঙ্গলবার রাত পৌনে ১১টার দিকে পাবনার শহরের রাধানগর মজুমদারপাড়া এলাকায় নিজ ঘরে সুবর্ণা নদীকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। সুবর্ণা হত্যার ঘটনায় তার মা মর্জিনা বেগম বুধবার বিকেল তিনটায় পাবনা থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় সুবর্ণার সাবেক শ্বশুর ও শিল্পপতি আবুল হোসেনকে প্রধান আসামি করা হয়েছে, পুলিশ বুধবার তাঁকে গ্রেপ্তার করে।

এদিকে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচার দাবিতে সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। চলতি ২০১৮ সালের ৮ মাসে ৩ জন সাংবাদিক খুন হলেন বলে জানিয়েছে সাংবাদিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-বিএফইউজে।

বুধবার পাবনা, রংপুর, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী জেলায় পৃথকভাবে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। এসব কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, বিগত দিনে সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতনের কোনো সুষ্ঠু বিচার হয়নি। সাগর-রুনিসহ সব সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতনের বিচার হলে সুবর্ণা নদীকে প্রাণ হারাতে হতো না।

তাঁরা বলেন, অবিলম্বে সুবর্ণা হত্যার সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে সারা দেশে সাংবাদিকদের হত্যা ও নির্যাতনকারীদের বিচার করতে হবে।

নিহত সুবর্ণা নদী (৩২) বেসরকারি টেলিভিশন  ‘আনন্দ টিভি’র পাবনা প্রতিনিধি এবং স্থানীয় অনলাইন পোর্টাল  ‘দৈনিক জাগ্রত বাংলার’  সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন। পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার একদন্ত গ্রামের মৃত আইয়ুব আলীর মেয়ে। সুবর্ণার ৬ বছরের একটি মেয়ে রয়েছে।

সুবর্ণা হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়েছে নারী সাংবাদিক কেন্দ্র। সংগঠনটির সভাপতি নাসিমুন আরা হক বেনারকে বলেন,  “বাংলাদেশে সাংবাদিক হত্যার বিচার হয় না এটা বাস্তবতা। এই দুঃখজনক পরিস্থিতির বিচার চাই।”

এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে বৃহস্পতিবার বেলা ১২ টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করবে নারী সাংবাদিক কেন্দ্র।

সাংবাদিক সুবর্না নদী। ফাইল ফটো। নিউজরুম ফটো।

 

মামলা দায়ের

সুবর্ণা নদী হত্যার ঘটনায় তার মা মর্জিনা বেগম বুধবার বিকেল তিনটায় পাবনা থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া সুবর্ণার সাবেক শ্বশুর আবুল হোসেন ইড্রাল ইউনানি কোম্পানি ও শিমলা ডায়াগনস্টিকের মালিক। তার ছেলে রাজীবের সঙ্গে তিন-চার বছর আগে বিয়ে হয়েছিল সুবর্ণার। বছরখানেক আগে তাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়।

পাবনা থানার ওসি ওবাইদুল হক বেনার নিউজকে বলেন,  “ব্যক্তিগত বিরোধের কারণেই সুবর্ণাকে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। মামলায় তিনজন এজাহার নামীয় এবং ৪-৫ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।”

তিনি জানান, মামলার আগেই পুলিশ সন্দেহভাজন হিসেবে আবুল হোসেনকে আটক করেছিল। মামলার পর তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইবনে মিজান বেনারকে বলেন, “বাসার কলিং বেল টিপে কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি তাকে ডেকে বের করে। সুবর্ণা নদী গেট খোলার সাথে সাথে তাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।”

সুবর্ণার পরিবার বলছে সাবেক স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর সুবর্ণা পাবনার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে আদালতে একটি মামলা করেন। এ মামলায় সুবর্ণা তার সাবেক স্বামী রাজীব ও তার বাবা আবুল হোসেনসহ তিনজনকে আসামি করেন। মামলাটি আদালতে বিচারাধীন। এর জের ধরেই তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে তাদের ধারণা।

সুবর্ণা নদীর বড় বোন চম্পা বেনারকে জানান, মঙ্গলবার ওই মামলায় সাক্ষ্য দেোয়ার দিন ছিল। এতে সুবর্ণা তার পক্ষে আদালতে সাক্ষ্যও উপস্থাপন করেন। তার দাবি, মামলায় ফেঁসে যাওয়ার আশঙ্কায় আসামিরা পরিকল্পিতভাবে সুবর্ণাকে হত্যা করেছে।

বিএফইউজে-ডিইউজের বিবৃতি

পাবনায় বেসরকারি টেলিভিশন আনন্দ টিভির জেলা প্রতিনিধি ও দৈনিক জাগ্রত বাংলার সাংবাদিক সুবর্ণা নদীকে বাসার সামনে কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যার তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ জানিয়েছেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-বিএফইউজে ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন। বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করবে তারা।

বিএফইউজে’র সভাপতি রুহুল আমিন গাজী ও মহাসচিব এম আবদুল্লাহ এবং ডিইউজে’র সভাপতি কাদের গনি চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক মোঃ শহিদুল ইসলাম এক বিবৃতিতে বলেছেন, এ নিয়ে বর্তমান মহাজোট সরকারের দশ বছরের কম সময়ে মোট ৩৩ জন সাংবাদিক খুন হয়েছেন।

বিবৃতিতে বলা হয়, চলতি ২০১৮ সালের ৮ মাসে ৩জন সাংবাদিক খুন হলেন। চাঞ্চল্যকর সাগর-রুনিসহ সাংবাদিক হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার না হওয়ায় খুনিরা আশকারা পাচ্ছে। সাংবাদিকসহ কোনো নাগরিকেরই জীবনের নিরাপত্তা যে নেই তা আরেকবার প্রমাণিত হয়েছে।

ঢাকায় পুলিশের সামনে হেলমেট বাহিনী অন্তত ৪০জন কর্তব্যরত সাংবাদিককে নির্মমভাবে পিটিয়ে-কুপিয়ে রক্তাক্ত করার পর প্রায় এক মাস অতিবাহিত হলেও কোনো সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়নি বলেও উল্লেখ করা হয় এ বিবৃতিতে।

সাংবাদিক হত্যার বিচার হয় না

১৯৯৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে অন্তত ২২জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডসহ অন্তত ২০ টি হত্যাকাণ্ডের বিচার ঝুলে রয়েছে।

সাগর-রুনি ছাড়াও এ তালিকায় যারা রয়েছেন তারা হলেন; মোহাম্মদ কামরুজ্জামান, সাইফুল আলম মুকুল, মির ইলিয়াস হোসাইন, শামসুর রহমান, নহর আলি, হারুনুর রশিদ, শুকুর হোসাইন, সৈয়দ ফারুক আহমেদ, মানিক সাহা, হুমায়ুন কবির, কামাল হোসেন, দীপঙ্কর চক্রবর্তী, শহীদ আনোয়ার, শেখ বেলালউদ্দিন আহমেদ, গোলাম মাহফুজ, গৌতম দাস, বেলাল হোসেন দফাদার, জামাল উদ্দিন, তালহাদ আহমেদ কবিদ ও সদরুল আলম।

গত বছরের ৩১ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটি-টু-প্রটেক্ট জার্নালিস্ট (সিপিজে) প্রকাশিত সূচকে উল্লেখ করা হয়েছে বিশ্বের যে কটি দেশে সাংবাদিক হত্যার বিচার হয় না এমন দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান নিচের দিক থেকে দশম। গত এক দশকে এখানে সাতজন সাংবাদিক হত্যার কোনো বিচার হয়নি।

‘গেটিং অ্যাওয়ে উইথ মার্ডার’ শিরোনামে প্রকাশিত সিপিজে সূচকে বলা হয়, বাংলাদেশে উগ্রবাদী ও অপরাধচক্রের সদস্যরা সাংবাদিকদের চিহ্নিত করে হত্যা করেছে।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন