Follow us

খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য ও সুবিচার নিয়ে অ্যামনেস্টির উদ্বেগ

পুলক ঘটক
ঢাকা
2019-12-19
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে নেয়া হচ্ছে। ১ এপ্রিল ২০১৯।
দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে নেয়া হচ্ছে। ১ এপ্রিল ২০১৯।
[এএফপি]

কারারুদ্ধ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য, চিকিৎসা এবং বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।

সরকার তাঁকে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য পরিচর্যা দিচ্ছে না বলে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর পরিবার এবং তাঁর দলের পক্ষ থেকে উপর্যুপরি অভিযোগের পর অ্যামনেস্টি থেকে বৃহস্পতিবার উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি প্রদান করা হয়।

তবে খালেদার চিকিৎসা এবং সুবিচার প্রাপ্তি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই বলে বেনারকে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

তিনি বলেছেন, “চিকিৎসা নিয়ে সরকার মোটেই অবহেলা করছে না। সরকার, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং খালেদার আইনজীবীদের বক্তব্য শোনার পর সন্তুষ্ট হয়েই সর্বোচ্চ আদালত যথাযথ আদেশ দিয়েছেন।”

বিবৃতিতে অ্যামনেস্টি বলছে, শোনা যাচ্ছে খালেদা জিয়াকে পর্যাপ্ত চিকিৎসা দেওয়া হয়নি এবং তাঁর অধিকার নিশ্চিত করা হয়নি।

এই পরিস্থিতিতে তাঁর চিকিৎসায় জাতিসংঘ আইন (নেলসন ম্যান্ডেলা বিধি) মেনে চলতে কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে অ্যামনেস্টি।

৭৪ বছর বয়স্ক খালেদা জিয়া ২০১৮ সালের ৮ জুলাই থেকে কারাবন্দী রয়েছেন। অ্যামনেস্টি বলেছে, “আগে থেকেই তিনি বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। তবে বন্দী অবস্থায় তাঁর অবস্থার আরও অবনতি হয়। এর ফলে গত ১ এপ্রিল তাঁকে সরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করে কর্তৃপক্ষ।”

বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অনেকগুলো মামলা থাকায় ন্যায়বিচার নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে বলে মনে করে সংস্থাটি।

সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দায়ের করা ৩৬টি মামলার মধ্যে ৩৪টিতে জামিন পেয়েছেন তিনি। আর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় তিনি সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন।

অ্যামনেস্টি বলেছে, “খালেদা জিয়ার মামলার সঠিক শুনানি নিয়েও উদ্বেগ আছে। যেমন চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় বয়স, শারীরিক অবস্থাসহ কিছু বিষয় বিবেচনা করে হাইকোর্ট জামিন দিলেও আপিল বিভাগ তাঁর আইনজীবীদের বক্তব্য না শুনেই তা স্থগিত করে দেয়, যা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।”

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বেনারকে বলেন, “অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আন্তর্জাতিক কোন আইন লঙ্ঘন হয়েছে বলে দাবি করেছে তা আমাদের জানা নেই। তারা কি যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আইনকে আন্তর্জাতিক আইন বলছে, নাকি যুক্তরাজ্যের কোনো আইনকে আন্তর্জাতিক আইন বলছে?”

তিনি বলেন, “বাংলাদেশের আইন আন্তর্জাতিক মানের এবং আমাদের সুপ্রিম কোর্ট যখন কোনো অধস্তন আদালতের কোনো আদেশকে স্থগিত করে দেয়, তা আইন অনুযায়ীই করে। এতে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হওয়ার কোনো কারণ নেই।”

বিবৃতিতে অ্যামনেস্টি বলেছে, “সুপ্রিম কোর্টের অনুমতি ছাড়াই পুরোনো ঢাকার কারাগারে খালেদা জিয়ার বিচারকার্য পরিচালনাকে তাঁর আইনজীবীরা নির্বাহী বিভাগের ‘জুডিশিয়াল পাওয়ার’-এর অপব্যবহার হিসেবে উল্লেখ করেছেন।”

অ্যামনেস্টি বলছে, এসব কারণে খালেদা জিয়ার বিচার পাওয়া ও প্রকাশ্য শুনানির অধিকার সম্পর্কে মারাত্মক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রের প্রধান আইনজীবী মাহবুবে আলম বলেন, “সুপ্রিম কোর্টের আদেশ লঙ্ঘন করে কারাগারে বিচারকার্য পরিচালনার অভিযোগ সত্য নয়। নির্বাহী বিভাগ জুডিশিয়াল পাওয়ার অপব্যবহার করছে এই অভিযোগও সত্য নয়।”

তবে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক খালেদা জিয়ার অন্যতম আইনজীবী মাহবুব উদ্দিন খোকন বেনারকে বলেছেন, “অ্যামনেস্টির উদ্বেগ যথার্থ। বেগম জিয়া এখন খুবই অসুস্থ। তাঁর যে চিকিৎসা দরকার, সেই চিকিৎসা তিনি জেলখানায় পাচ্ছেন না।”

তিন বলেন, “মেডিকেল বোর্ড বিভিন্ন পরীক্ষা করে ৩০শে অক্টোবর একটি রিপোর্ট দিয়েছে। ওই রিপোর্টে বোর্ড পরিষ্কারভাবে বলেছে, খালেদা জিয়া দিন দিন পঙ্গু হয়ে যাচ্ছেন। হাত বাঁকা হয়ে যাচ্ছে, পা বাঁকা হয়ে যাচ্ছে। সুচিকিৎসার প্রয়োজনে তাঁকে জামিন দেওয়া একটি মানবিক দাবি। এই দাবি উপেক্ষিত হয়েছে।”

তিনি বলেন, “খালেদা জিয়ার সঙ্গে আমাদের সিনিয়র আইনজীবীরা অনেকবার সাক্ষাতের অনুমতি চেয়েছেন। কিন্তু তাঁদের সাক্ষাতের অনুমতি দেয়া হয়নি। হাসপাতালে সরকার কাউকে যেতে দিচ্ছে না। এমনকি তাঁর আত্মীয় স্বজনকেও অনেক সময় অনুমতি দেয়া হয় না।”

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রথম থেকেই আমাদের আপত্তি আছে। কারা অভ্যন্তরে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিচার কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা বহুভাবে এর প্রতিবাদ করেছি। তাঁকে মিথ্যা মামলায় জেল খাটানো হচ্ছে।”

খালেদা জিয়ার সঙ্গে যেন জাতিসংঘ ঘোষিত নিয়ম অনুযায়ী আচরণ করা হয় এবং তাঁর ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয় তা নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানায় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।

চিকিৎসা নিয়ে উদ্বেগ

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল খালেদা জিয়াকে তাঁর চাহিদা অনুযায়ী বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

অ্যামনেস্টির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী খালেদা জিয়া আর্থরাইটিস ও অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসসহ নানা সমস্যায় ভুগছেন। মেডিকেল বোর্ডের রিপোর্টকে উদ্ধৃত করেই গণমাধ্যমে এই খবর দেয়া হয়েছে।

তাঁর পরিবারের সদস্যরা চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ এনে বলেছেন, খালেদা জিয়ার অনুরোধ সত্ত্বেও তাঁর মেডিকেল রেকর্ডস দিতে রাজি হয়নি সরকার।

তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসকেরা বেসরকারি হাসপাতালে বিশেষায়িত চিকিৎসা দেয়ার যে সুপারিশ করেছেন, তাও সরকার মানেনি। যদিও সরকার গঠিত মেডিকেল বোর্ড তাঁর স্বাস্থ্য ‘ভালো’ বলে মন্তব্য করেছে।

অ্যামনেস্টির বিজ্ঞপ্তিতে খালেদা জিয়ার পরিবারের বক্তব্য উল্লেখ করে বলা হয়, “এটা গভীর উদ্বেগের এবং বন্দীদের সাথে জাতিসংঘের বেঁধে দেয়া ন্যূনতমের মানদণ্ডের পরিপন্থী।”

ইউএন স্ট্যান্ডার্ড মিনিমাম রুলসের রুল ২৪ অনুযায়ী, বন্দীদের স্বাস্থ্যসেবা রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং কমিউনিটিতে যে ধরনের স্বাস্থ্যসেবা আছে সে মানের চিকিৎসা তাঁর পাওয়া উচিত কোনো বৈষম্য ছাড়াই।

অ্যামনেস্টি মনে করে, বাংলাদেশেরও অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি মানতে এবং একজন ব্যক্তির সম্ভাব্য সর্বোচ্চ মানের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার যে অধিকার রয়েছে তা পূরণ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন