Follow us

চাঞ্চল্যকর নুসরাত হত্যা মামলায় ১৬ আসামির সবারই মৃত্যুদণ্ড

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2019-10-24
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
রায় ঘোষণার পর পুলিশ প্রহরায় অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ দৌলাকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। ফেনী, অক্টোবর ২৪, ২০১৯।
রায় ঘোষণার পর পুলিশ প্রহরায় অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ দৌলাকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। ফেনী, অক্টোবর ২৪, ২০১৯।
ছবি: বেনার নিউজ

অধ্যক্ষের যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদ করায় ফেনীর নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগে ১৬ আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে বাংলাদেশের একটি আদালত। বৃহস্পতিবার জনাকীর্ণ আদালতে এ রায় ঘোষণা করেন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশীদ।

পাশাপাশি নারীত্বের মর্যাদা রক্ষায় নুসরাতের ‘তেজদীপ্ত আত্মত্যাগ’ চিরকাল অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে বলেও পর্যবেক্ষণ দিয়েছে আদালত।

নুসরাত হত্যার সাত মাসের মাথায়, মাত্র ৬১ কার্যদিবস শুনানির পর বৃহস্পতিবার এ মামলার রায় এলো। এ রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে নুসরাতের পরিবার। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, ‘ঐতিহাসিক’ এ রায় নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় ভূমিকা রাখবে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী পরিচালক শিপা হাফিজা বেনারকে বলেন, “এই রায় সন্তোষজনক হয়েছে। তবে আসামিদের এই দণ্ড যেন উচ্চ আদালতেও বহাল থাকে। আর তা যেন বাস্তবায়িত হয়। আমরা এ ধরনের রায় এখনো বাস্তবায়িত হতে দেখিনি।”

মানবাধিকার আইনজীবী সালমা আলী বেনারকে বলেন, “নারী ও শিশু নির্যাতন দমনে আইনের আওতায় ছয় মাসের মধ্যে মামলা শেষ হওয়ার কথা সেখানে ৬১ কর্মদিবসে এই মামলা শেষ হওয়াতে আমরা খুশি।”

“আলোচিত এই মামলা মনিটরিং করছে পুরো বাংলাদেশ। আশা করি উচ্চ আদালতেও দ্রুত এই মামলার রায় এবং তা কার্যকর হবে,” বলেন তিনি।

এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে মামলার তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই)। সংস্থার প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার সাংবাদিকদের বলেন, “এমন রায়ই প্রত্যাশা করেছিলাম। আমরা পেশাদারিত্বের সাথে মেধা দিয়ে নুসরাত হত্যার তদন্তকাজ করেছি।”

উল্লেখ্য, সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার ছাত্রী আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলেছিলেন। ওই ঘটনায় তাঁর মায়ের করা মামলায় চলতি বছরের ২৭ মার্চ অধ্যক্ষ সিরাজকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

কিন্তু মামলা তুলে নিতে তাদের ওপর নেওয়ার জন্য চাপ আসতে থাকে। শেষ পর্যন্ত মামলা তুলে না নেওয়ায় ৬ এপ্রিল মাদ্রাসার প্রশাসনিক ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে বোরকা পরা পাঁচ দুর্বৃত্ত নুসরাতের হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয়।

পরে ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অগ্নিদগ্ধ নুসরাতের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। মামলাটি পরে হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।

মৃত্যুর আগে দেওয়া জবানবন্দিতে নুসরাত সকল ঘটনার বর্ণনা দেন। তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর সাথে হওয়া নির্মম ঘটনার প্রতিবাদে ফেটে পড়ে পুরো দেশ।

সন্তুষ্ট নুসরাতের পরিবার

নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বেনারকে বলেন, যে রায় হয়েছে তাতে আমরা সন্তুষ্ট। এখন এ রায় দ্রুত কার্যকর চাই।

“শুরু থেকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নুসরাত হত্যা মামলা দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তির আশ্বাস দিয়েছিলেন। তিনি সে কথা রেখেছেন। তাঁকে ধন্যবাদ। এই রায় বাস্তবায়িত হলে নুসরাতের আত্মা শান্তি পাবে।”

এদিকে কন্যার নির্মম হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের সর্বোচ্চ সাজার রায় শুনে কেঁদে ফেলেন নুসরাতের বাবা একেএম মুসা মানিক। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “রায়ে আমি সন্তোষ প্রকাশ করছি। কিন্তু দ্রুত এর বাস্তবায়ন চাই।”

পাশাপাশি নিজের পরিবারের পূর্ণ নিরাপত্তা দাবিও করেন মুসা মানিক।

তবে একজনকে হত্যার মামলায় ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার এই ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত বলছে আসামিপক্ষ। এই রায়ে ন্যায় বিচার নিশ্চিত হয়নি বলেও মন্তব্য করেছে তাঁরা।

আসামিপক্ষের আইনজীবী গিয়াস উদ্দিন নান্নু বেনারকে বলেন, “আমরা ন্যায় বিচার পাইনি। একজনকে হত্যার ঘটনা ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, এটা দুর্ভাগ্যজনক, অনাকাঙ্ক্ষিত।”

“আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন। আশা করি সেখানে ন্যায় বিচার নিশ্চিত হবে,” বলেন তিনি।

আদালতে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সাংবাদিক ডালিম হাজারি। তিনি বেনারকে বলেন, “রায়ের আগে অধ্যক্ষ সিরাজসহ এই মামলার ১৬ আসামিকে প্রিজনভ্যানে করে আদালতে আনা হয়।”

“ভ্যান থেকে নামার সময় বেশ হাসিখুশিই ছিলেন। এমনকি এজলাসে ওঠা থেকে রায় ঘোষণার আগ পর্যন্ত তাঁকে খোশমেজাজে দেখা যায়,” বলেন তিনি।

“তবে রায় শুনে সিরাজকে বিমর্ষ দেখা যায়। অন্য আসামিরা কেঁদে ওঠেন,” বলেন এই সাংবাদিক।

 

 

সরকারেও স্বস্তি

নুসরাত হত্যার রায়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন সরকার। এই রায় বিচার বিভাগের জন্য মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা মাহবুবে আলম। অন্যান্য মামলারও এমন দ্রুত বিচার হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

বৃহস্পতিবার মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, “নুসরাত হত্যার বিচারকাজ অতি তড়িৎ গতিতে সম্পন্ন হয়েছে বলে আমি সন্তোষ প্রকাশ করছি। সকল বিচারকাজ যদি এমন গতিতে সম্পন্ন হয়- বিশেষ করে খুনের মামলাগুলো, তাহলে অন্ততপক্ষে জনগণ বিচার পাবে।”

“যেমন পৈচাশিকভাবে নুসরাতকে হত্যা করা হয়, যদি তার সুষ্ঠু বিচার যদি না হতো তাহলে সমাজের কাছে এই বার্তাটা যেতো না যে, খুন-রাহাজানি করলে কেউ পার পায় না। এ মামলার রায়ে সেটাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।”

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল এক অনুষ্ঠানে বলেন, “সরকারের পক্ষ থেকেও আমরা স্বস্তি প্রকাশ করছি। রায় নিয়েও কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়নি। আমার মনে হয়, তার পরিবারও সন্তুষ্ট হবে।”

অমরত্ব পেয়েছে নুসরাত

রায়ের পর্যবেক্ষণে নুসরাতের সাহসিকতার প্রশংসা করেছে আদালত।

রায়ে বলা হয়, “সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসা ফেনী জেলার অন্যতম বৃহৎ বিদ্যাপীঠ। দুই হাজারের বেশি ছাত্রছাত্রী সেখানে পড়ালেখা করছে।”

“এলাকার শিক্ষা সম্প্রসারণে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার আলোকোজ্জ্বল ভূমিকায় কালিমা লিপ্তকারী এ ঘটনা বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে। নারীত্বের মর্যাদা রক্ষায় ভিকটিম নুসরাত জাহান রাফির তেজদীপ্ত আত্মত্যাগ তাকে ইতিমধ্যে অমরত্ব দিয়েছে।”

আদালত বলেছে, “তার এ অমরত্ব চিরকালের অনুপ্রেরণা। পাশাপাশি আসামিদের ঔদ্ধত্য কালান্তরে মানবতাকে লজ্জিত করবে নিশ্চয়। বিধায়, দৃষ্টান্তমূলক কঠোরতম শাস্তিই আসামিদের প্রাপ্য।”

মানবাধিকার কর্মী সালমা আলী বেনারকে বলেন, “নুসরাত সাহসী নারী, প্রতিবাদী নারী। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সে অন্যায়ের প্রতিবাদ করে গেছে। তাঁর নামে সরকারের একটি পদক প্রচলন করা উচিত।”

পুলিশকে তিরস্কার

রায়ে আসামিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি নুসরাত হত্যার ঘটনায় গাফিলতির অভিযোগে সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) তিরস্কার করেছেন আদালত।

আদালত বলেন, “এ ঘটনায় তৎকালীন ওসি গাফিলতি করেছেন। ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের কর্মকাণ্ড আর না ঘটে, সে ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক করে দেন আদালত।”

তবে এই মামলার তদন্তকারী সংস্থা পিবিআইয়ের প্রশংসা করেছে আদালত।

উল্লেখ্য, আলোচিত এই মামলায় পুলিশের অবহেলার অভিযোগে ১৩ মে ফেনীর তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি) এসএম জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করা হয়। পরে থানায় নুসরাতকে হেনস্তা করার ভিডিওটি প্রকাশ হলে ৮ মে সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেমসহ পুলিশের দুই এসআইকে বহিষ্কার করা হয়। পরে ওই ওসির নামে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হলে ১৬ জুন মোয়াজ্জেমকে আটক করে পুলিশ।

মানবাধিকার কর্মী সালমা আলী বেনারকে বলেন, “উচ্চ আদালতে বিচারাধীন মামলায় ওসি মোয়াজ্জেম কঠোর শাস্তি পাবেন—এমন প্রত্যাশা করছি।”

দণ্ডপ্রাপ্ত যারা

এই আলোচিত মামলার রায়ে নুসরাত হত্যার হুকুমদার সোনাগাজীর ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাসহ যারা হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নে আর্থিকসহ নানারকম সহযোগিতা করেছেন তাদের সকলকেই মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। দণ্ডপ্রাপ্তদের বয়স ১৯-৫৭ বছর।

এর মধ্যে রয়েছেন ওই মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সহসভাপতি স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমীন এবং সোনাগাজীর পৌর কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা মাকসুদ আলম।

এছাড়া দণ্ডপ্রাপ্ত অন্যান্যরা হলেন নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, সাইফুর রহমান, মো. জোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, হাফেজ আব্দুল কাদের, মো. আফসার উদ্দিন, কামরুন নাহার মনি, উম্মে সুলতানা পপি, আব্দুর রহিম শরীফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, মো. শামীম, ও মহিউদ্দিন শাকিল।

রায়ে আসামিদের সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড করা হয়েছে। এই অর্থ আদায় করে নুসরাতের বাবা-মাকে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

নির্জন প্রকোষ্টে ১৭০০ ফাঁসির আসামি

এদিকে সারা দেশের বিভিন্ন কারাগারের কারাগারের কনডেমন সেলে (নির্জন প্রকোষ্ঠে) মৃত্যুদণ্ডের সাজাপ্রাপ্ত ১ হাজার ৭০৪ আসামি রয়েছেন বলে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। উচ্চ আদালত থেকে চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় রয়েছেন তাঁরা।

এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যাপারে রাষ্ট্রপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আইন মন্ত্রণালয়কে লেখা এক চিঠিতে অনুরোধ জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

এই চিঠিতে বলা হয়, এ বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন কারাগারে আটক মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত বন্দীদের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে অনিষ্পন্ন ১ হাজার ৪৬৭টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এ ছাড়া আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে ২৩৭টি মামলা।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন