Follow us

বিপুল আয়োজনে শুরু মুজিববর্ষের ক্ষণগণনা, চলবে বছরজুড়ে

পুলক ঘটক
ঢাকা
2020-01-10
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকার তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দরে আনুষ্ঠানিকভাবে মুজিববর্ষের লগো উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (মাঝখানে)। প্রধানমন্ত্রীর ডানে তাঁর বোন শেখ রেহানা ও ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং বামে মুজিববর্ষ উদযাপন কমিটির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম ও সদস্য সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী। ১০ জানুয়ারি ২০২০।
ঢাকার তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দরে আনুষ্ঠানিকভাবে মুজিববর্ষের লগো উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (মাঝখানে)। প্রধানমন্ত্রীর ডানে তাঁর বোন শেখ রেহানা ও ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং বামে মুজিববর্ষ উদযাপন কমিটির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম ও সদস্য সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী। ১০ জানুয়ারি ২০২০।
[ছবি: তথ্য অধিদপ্তর]

দেশজুড়ে বিপুল ও বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে ‘মুজিববর্ষে’র ক্ষণগণনা শুরু করেছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার, দেশে–বিদেশে এই কর্মসূচি চলবে এক বছরজুড়ে।

কর্মসূচি শুরুর দিন হিসেবে ১০ জানুয়ারি বেছে নেওয়ার কারণ হচ্ছে, ১৯৭২ সালের ওই দিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ​

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঢাকার তেজগাঁওয়ে অবস্থিত পুরাতন বিমানবন্দরে বিশাল সমাবেশ থেকে ক্ষণগণনা কর্মসূচি উদ্বোধন করেন।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তৃতায় বলেন, “বঙ্গবন্ধু আমাদের হাতে বিজয়ের মশাল তুলে দিয়েছেন, আমরা এখন এই বিজয় নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চাই।”

শেখ হাসিনা আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশের মানুষ জাতির পিতার স্বপ্নের ‘সোনার বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্বে মযার্দার আসনে অধিষ্ঠিত করবে।

শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে এ বছরের ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ১৭ মার্চ পর্যন্ত পুরো এক বছর হবে মুজিববর্ষ। দেশ স্বাধীন হওয়ার প্রায় সাড়ে তিন বছরের মাথায় সেনাবাহিনীর একদল বিপথগামী কর্মকর্তা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে।

‘অতি আয়োজনের’ সমালোচনা বিএনপির

মুজিববর্ষ পালনের প্রক্রিয়ায় বিরোধী দল বিএনপির অংশগ্রহণ নেই। দলটির যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বেনারকে বলেন, “আমরা বঙ্গবন্ধুকে জাতীয় নেতা হিসেবে মর্যাদা দেই। আমাদের নেত্রী খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে বঙ্গবন্ধুর মাজার জিয়ারত করেছিলেন। তিনি অনেক বক্তৃতায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নামের আগে বঙ্গবন্ধুর নাম নিতেন।”

বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই তাঁর জন্মশতবার্ষিকীতে অতি-আয়োজনের সমালোচনা করে আলাল বলেন, “যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে, তা নিয়ে আমাদের প্রশ্ন আছে।”

মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, “আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুকে তাদের পারিবারিক এবং দলীয় সম্পদ হিসেবে মূল্যায়ন করে। তারা যে আয়োজন করছে তা নিতান্তই দলগত এবং বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার জন্য। বঙ্গবন্ধুকে জাতীয় সম্পদ মনে করলে তারা বিএনপিকেও অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানাত।”

শুক্রবার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন ও বিকল্পধারা বাংলাদেশের সভাপতি সাবেক রাষ্ট্রপতি ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ।

মুজিববর্ষ আয়োজনের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এম এ মাননান বেনারকে বলেন, “এর মধ্য দিয়ে দেশের ইতিহাস ও জাতীয়তাবোধকে মর্যাদা দেয়া হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গুরুত্বকে জাতীয়ভাবে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা হচ্ছে।”

তিনি বলেন, “বঙ্গবন্ধুর অবদান, দর্শন, আদর্শ ও চিন্তা–চেতনা মুজিববর্ষে তুলে ধরা হবে। এতে বাঙালি জাতি নতুন শক্তি পাবে, তরুণ প্রজন্ম স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারবে।”

ইউনেস্কোর সদস্য-তালিকাভুক্ত ১৯৫টি দেশে একযোগে পালিত হবে মুজিববর্ষ। ইউনেস্কোর ৪০তম সাধারণ পরিষদের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে সর্বসম্মতভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে মুজিবর্ষ উদযাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

আয়োজনের ঘটা

বঙ্গবন্ধু যে আলোকবর্তিকা হয়ে সেদিন দেশে ফিরেছিলেন, তারই প্রতীকী উপস্থাপনা ছিল ঢাকার কেন্দ্রীয় আয়োজনে।

শুক্রবার বিকেল ৪টা ৩৭ মিনিটে বিমান বাহিনীর একটি বিশেষ উড়োজাহাজ প্রতীকী হিসেবে পুরানো বিমানবন্দরের (তৎকালীন তেজগাঁও বিমানবন্দর) রানওয়েতে অবতরণ করে। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বিকালে ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ারফোর্সের এরকম একটি উড়োজাহাজে করেই দেশে ফিরেছিলেন বঙ্গবন্ধু।

বিমানটি ধীরে ধীরে এসে টারমাকে অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে এসে থামে। এ সময় বাজানো হয় ভারতের প্রখ্যাত শিল্পী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠের সেই গান- ‘বঙ্গবন্ধু ফিরে এলে তোমার স্বপ্নের স্বাধীন বাংলায়’।

বিমানটি টারমাকে পৌঁছানোর পর দরজা খোলা হলে ২১ বার তোপধ্বনি দেওয়া হয়। ‘জয়বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে চারিদিক। লেজার লাইটের মাধ্যমে বিমানের দরজার ফুটিয়ে তোলা হয় বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি।

পুষ্পবৃষ্টির মধ্যে সেই আলোকবর্তিকা ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসে লাল গালিচার মাথায় ছোট্ট মঞ্চে এসে থেমে যায়। এরপর গার্ড অব অনারের মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনীর একটি সুসজ্জিত চৌকস দল রাষ্ট্রীয় সালাম জানায়।

বক্তব্য শেষে প্রধানমন্ত্রী ল্যাপটপের বোতাম চেপে মুজিববর্ষের লোগো উন্মোচন ও ক্ষণগণনার উদ্বোধন করেন। প্রধানমন্ত্রীর হাতে লোগো তুলে দেন উদযাপন কমিটির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম ও সদস্য সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী।

প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধনের পর প্রতিটি জেলা, উপজেলা ও জনপরিসরে ক্ষণগণনা শুরু হয়। দেশের ৫৩ জেলা, দুটি উপজেলা, ১২টি সিটি করপোরেশনের ২৮টি পয়েন্ট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাজধানীর ৮৩টি পয়েন্টে কাউন্টডাউন ঘড়ি বসানো হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে এ বছরের ১৭ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে মূল অনুষ্ঠান, এতে যোগ দেবেন বিশ্ব নেতারা। সেদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, ওআইসি মহাসচিব ড. ইউসেফ এ আল-ওথাইমিন, ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী, ভারতের কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি সোনিয়া গান্ধী অনুষ্ঠানে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এ ছাড়া ওই অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ, কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো, আবুধাবির যুবরাজ শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল-নাহিয়ান, জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন, ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নামগিয়েল ওয়াংচুক এবং ইউনেস্কোর সাবেক মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভো প্রমুখ।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ৭৭ মিশনে ২৬১টি অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন