Follow us

পূজার দিনে ঢাকা সিটি নির্বাচন: তোপের মুখে নির্বাচন কমিশন

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2020-01-16
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
সরস্বতী পূজার দিন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তারিখ পড়ায় তা পেছানোর দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের অনশন কর্মসূচি। ১৬ জানুয়ারি ২০২০।
সরস্বতী পূজার দিন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তারিখ পড়ায় তা পেছানোর দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের অনশন কর্মসূচি। ১৬ জানুয়ারি ২০২০।
[বেনারনিউজ]

সরস্বতী পূজার দিনে ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে মুখোমুখি হিন্দু সম্প্রদায় ও নির্বাচন কমিশন (ইসি)। পূজার দিনে নির্বাচন পড়ায় তা পেছানোর দাবি করেছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মেয়র প্রার্থীরাও। তবে ইসি আগামী ৩০ জানুয়ারি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে অনড়।

হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী, সরস্বতী পূজা ২৯ ও ৩০ জানুয়ারি-দুদিন মিলে অনুষ্ঠিত হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পূজার দিনে নির্বাচনের তারিখ ঠিক করা হয়েছে।

এদিকে ইসির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রিট পিটিশন দাখিল করলেও মঙ্গলবার আদালত নির্বাচন পেছানোর দাবি নাকচ করে ৩০ জানুয়ারি ভোট অনুষ্ঠানের রায় দিয়েছে। এর বিরুদ্ধে বৃহস্পিতবার আপিল বিভাগে আবেদন করেন আইনজীবী অশোক কুমার ঘোষ।

হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাস গুপ্ত বেনারকে বলেন, “আমরা পূজার দিনে নির্বাচন করার এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারছি না। আর আদালত নির্বাচন না পিছিয়ে যে রায় দিয়েছে তাতে আমরা মর্মাহত।”

আওয়ামী লীগ সাংসদ পঙ্কজ নাথ বৃহস্পতিবার সংসদে বলেন, “আমার দাবি হলো, এসএসসি পরীক্ষা দু-এক দিন পিছিয়ে দিয়ে, নির্বাচন পিছিয়ে দেয়া হোক। যাতে আমরা একত্রে সরস্বতী পূজা পালন করতে পারি।”

প্রসঙ্গত, ৩০ জানুয়ারির পরের দিন শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি। তার পরদিন ১ ফেব্রুয়ারি থেকে সারা দেশে এসএসসি পরীক্ষা শুরু হবার কথা রয়েছে।

নির্বাচন পেছানোর দাবি প্রার্থীদেরও

হিন্দু ধর্ম অনুসারে বিদ্যার দেবী সরস্বতী, ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরস্বতী পূজা করেন তাঁরা। আবার নির্বাচন কেন্দ্রও হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে। এছাড়া নির্বাচনের দিন সংশ্লিষ্ট এলাকায় যানবাহন চলাচলেও বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা থাকে। সে কারণে বেশ কিছুদিন ধরেই নির্বাচন পেছানোর দাবি জানিয়ে আসছে হিন্দু সম্প্রদায়ের।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার সাখাওয়াত হোসেন বেনারকে বলেন, “নির্বাচনের দিনে যানবাহন চলাচলসহ বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা থাকে। সরস্বতী পূজার দিনে নির্বাচন অনুষ্ঠান না করাই ভালো।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারেক শামসুর রেহমান বেনারকে বলেন, “আমার জানা মতে, পূজার দিনে কোনো দিন কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। পূজা আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। এই দিনে নির্বাচন অনুষ্ঠান করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ভালো কাজ করেনি নির্বাচন কমিশন।”

“দু’এক দিন পিছিয়ে দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান করা হলে কোনো অসুবিধা হতো না,” মন্তব্য করে তিনি বলেন, “নির্বাচন পেছানো না হলে হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যরা যদি সিটি করপোরেশন বয়কট করেন, সেটি আমাদের দেশের জন্য খুব একটি বাজে উদাহরণ হবে।”

নির্বাচন পেছানোর দাবি জানিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের বিএনপি দলীয় মেয়র প্রার্থী তাবিথ আওয়াল বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন, “দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের জন্য পূজার দিনে নির্বাচন অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে। আমি মনে করি দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নির্বাচন পিছিয়ে দেয়া হোক।”

উত্তর সিটি কর্পোরেশনের আওয়ামী লীগ প্রার্থী মো. আতিকুল ইসলামও নির্বাচন পেছানোর পক্ষে।

তিনি বেনারকে বলেন, “আমরা চাই ঢাকার প্রতিটি ভোটার ভোট কেন্দ্রে আসুক। আমি চাই না হিন্দু সম্প্রদায়কে আঘাত করে নির্বাচন হোক। আলোচনার মাধ্যমে দু-এক দিন নির্বাচন পিছিয়ে দেয়া হোক।”

তবে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও নির্বাচন পর্যবেক্ষক ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ বেনারকে বলেন, “প্রকৃত অর্থে সরস্বতী পূজা ২৯ জানুয়ারি। আমি বুঝতে পারছি না হিন্দু নেতারা কেন ৩০ জানুয়ারি সরস্বতী পূজার কথা বলছেন।”

তিনি বলেন, “পূজার দিনে নির্বাচন করা হচ্ছে যারা বলছেন, তারা নির্বাচন কমিশনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাচ্ছেন।”

ড. নাজমুল আহসান বলেন, “স্থান প্রাপ্তি, আবহাওয়া, পরীক্ষা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্য প্রাপ্তি ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় মাথায় রেখে একটি নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। হঠাৎ করে তারিখ পরিবর্তন করা আসলে কঠিন।”

ইসির আয়োজন

সরস্বতী পূজা নির্বিঘ্নে উদ্‌যাপনের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ভোটকক্ষ সাজানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। এ জন্য দুই সিটির মোট ৫৩ কেন্দ্র চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে পূজার আয়োজনের পাশাপাশি ভোটও নেওয়া হবে।

ঢাকা উত্তর সিটির ২৭ কেন্দ্র ও দক্ষিণ সিটির ২৬ ভোটকেন্দ্রে পূজা উদ্‌যাপিত হবে বলে ইসির সিনিয়র সচিব মো. আলমগীর সাংবাদিকদের জানান।

তিনি বলেন, ওই সব প্রতিষ্ঠানে পূজা উদ্‌যাপনের নির্ধারিত স্থান বা কক্ষকে ভোটকক্ষ বানাবে না ইসি।

সচিব জানান, এ ছাড়া ভোটের দিন ভোটারদের যাতায়াতের সুবিধার্থে প্রাইভেট কার চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

কোন কোন জায়গায় পূজা হয় তার খোঁজ নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “যেমন, অগ্রণী বালিকা বিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে নয়, অডিটোরিয়ামে পূজা হয়। ওই প্রতিষ্ঠানের কিছু কক্ষকে ভোটকক্ষ হিসেবে এমনভাবে স্থাপন করা হবে যাতে ভোটের কারণে পূজার সমস্যা না হয়।”

রিটার্নিং কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন জানিয়ে সচিব আলমগীর বলেন, “প্রতিষ্ঠান প্রধানেরা জানিয়েছেন, ভোট ও পূজা করতে কোনো সমস্যা নেই।”

“পূজা কিন্তু ২৯ জানুয়ারি। হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকের সঙ্গেই আমার কথা হয়েছে। তারা বলেছেন পূজা ২৯ জানুয়ারি শেষ। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করেন, ৩০ জানুয়ারি ১১টা পর্যন্ত পূজার একটা সময় আছে,” বলেন ইসি সচিব।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন