Follow us

ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে ইভিএম বিতর্ক

শরীফ খিয়াম
ঢাকা
2019-12-30
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলীয় মেয়র প্রার্থী আতিকুল ইসলাম (বামে) ও ফজলে নূর তাপসকে (ডানে) পরিচয় করিয়ে দেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। ২৯ ডিসেম্বর ২০১৯।
আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলীয় মেয়র প্রার্থী আতিকুল ইসলাম (বামে) ও ফজলে নূর তাপসকে (ডানে) পরিচয় করিয়ে দেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। ২৯ ডিসেম্বর ২০১৯।
[বেনারনিউজ]

সরকার বিরোধীদের আপত্তি সত্ত্বেও রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

এ ব্যাপারে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল সোমবার বেনারকে বলেন, “ইসি নিজের জেদ পূরণে সচেষ্ট থাকবে, নাকি ভোটারদের প্রত্যাশানুযায়ী ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়াটাকে সহজতর করবে, সেটি দেখার বিষয়।”

ইসির জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাইদুল ইসলাম সব ভোট কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবস্থাপনায় সশস্ত্র বাহিনীর পাঁচ হাজার ২৮০ জন সদস্য মোতায়েনের কথা জানানোর এক দিন পর আলাল এ কথা বললেন।

“এ ক্ষেত্রে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের দিন পর্যন্ত আমরা দেখব। এরপর পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে,” বেনারকে বলেন আলাল।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) ৩০ জানুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য এই ভোটযুদ্ধে অংশ নিলেও শুরু থেকেই ইভিএম ব্যবহারের বিরোধিতা করছে বিএনপি।

এরই মধ্যে রবিবার ইসি কর্মকর্তা সাইদুল সাংবাদিকদের বলেন, “প্রায় ১৫ হাজার ভোট কক্ষে ব্যবহারের জন্য ৩৫ হাজার ইভিএম প্রস্তুত রাখা হয়েছে।”

একইদিন “ইভিএমে বিশ্বাসযোগ্য ফল পাওয়া অসম্ভব” দাবি করে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, “ঢাকার দুই সিটির নির্বাচনে সরকারের কারসাজি করার ইচ্ছা পূরণেই ইসি ইভিএম ব্যবহারে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।”

ইসি এক ভয়াবহ পথে অগ্রসর হচ্ছে—এমন মন্তব্য করে স্থানীয় সরকার ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদার সোমবার বেনারকে বলেন, “মানুষের মধ্যে অনাস্থা, অবিশ্বাস ও অসন্তোষ আছে। নির্বাচন কমিশনারেরা কানে তুলো আর বিবেকে তালা দেওয়ায় সাধারণ ভোটারেরা হতাশ।”

“বিগত জাতীয় নির্বাচনে এই ইসি কলঙ্কজনক প্রতারণায় জাতির ভোটাধিকার হরণ করেছে। যার ফলে আজ আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থা অনেকাংশেই ভেঙে পড়েছে,” যোগ করেন নাগরিক সংগঠন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক।

এর আগে ২২ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণার দিনই দুই সিটির সব কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহারের ঘোষণা দেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা। পরে ২৫ ডিসেম্বর রিটার্নিং কর্মকর্তা, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহায়ক কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের উদ্বোধনীতে তিনি বলেন, “সবাই যদি বলে ইভিএমে নির্বাচন করা যাবে না, তাহলে সেটা করব না।”

“আমরা ইভিএম দিয়ে অনেকগুলো নির্বাচন করেছি, সেখানে সফলতাও পেয়েছি। আমরা চাই ভোটার যেন তার ভোট দিতে পারে,” বলেন সিইসি।

একই অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেন, “স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলেও জাতীয় নির্বাচনের মতোই এতে সমগ্র দেশবাসীর দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকবে।”

সরগরম ভোটের রাজনীতি

একাদশ জাতীয় নির্বাচনের ঠিক এক বছর এক মাস পর অনুষ্ঠিতব্য এই দুই সিটির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বহুদিন পর সরগরম হয়েছে নির্বাচনী রাজনীতি।

সিইসি ভোটগ্রহণের তারিখ ঘোষণার পরই মাঠে নেমে পড়েন রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। ইতোমধ্যেই নিজেদের প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে দুই দলই আগের প্রার্থী বহাল রাখলেও দক্ষিণে পরিবর্তন এসেছে। সেখানে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন সংসদ সদস্য ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাতিজা (ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে) ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস।

দলের এই সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে মনোনয়ন বঞ্চিত ডিএসসিসির বর্তমান মেয়র সাঈদ খোকন সোমবার বিকেলে সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত তিনি খুশি মনে মেনে নিয়েছেন।

অবিভক্ত ঢাকার সাবেক মেয়র মোহাম্মদ হানিফের ছেলে খোকন আগেরবার পাঁচ লাখ ৩৫ হাজার ২৯৬ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁর আসনে এবার তাপসের বিপরীতে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন অবিভক্ত ঢাকার শেষ মেয়র সাদেক হোসেন খোকার বড় ছেলে ইশরাক হোসেন।

অন্যদিকে উত্তরে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বর্তমান মেয়র, ব্যবসায়ী নেতা আতিকুল ইসলাম। মেয়র আনিসুল হকের মৃত্যুর পর এক বছর আগে উপ-নির্বাচনে মেয়র হন আতিক৷

তাঁর বিপরীতে থাকছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও ব্যবসায়ী আব্দুল আউয়াল মিন্টুর ছেলে তাবিথ আউয়াল, যিনি ২০১৫ সালে আনিসুল হকের কাছে হেরে গিয়েছিলেন।

মনোনয়ন প্রত্যাশী দুই সহস্রাধিক

মেয়র, সাধারণ ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত মোট দুই হাজার ২৬০টি মনোনয়নপত্র বিতরণ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। উত্তর সিটিতে এক হাজার ১৫টি এবং দক্ষিণ সিটিতে এক হাজার ২৪৫টি মনোনয়নপত্র বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে মেয়র পদে উত্তরে ১০ জন এবং দক্ষিণে আটজন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন।

সিটি নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে ড. বদিউল বেনারকে বলেন, “একটি রাজনৈতিক দল যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে, তবে তারা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। এর আগে নির্বাচন বয়কট করে বিএনপি কোনো ইতিবাচক ফলাফল সৃষ্টি করতে পারেনি। এই জন্যই তারা এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে; যা ইতিবাচক।”

এর আগে দলীয় মনোনয়ন বিক্রি শুরুর দিনে (২৫ ডিসেম্বর) বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, “জনগণের রায় প্রতিফলিত হবে না। তারপরও যেহেতু আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি, সে জন্য অংশ নিচ্ছি।”

একইদিন বিএনপিকে ‘স্বাগত’ জানিয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও প্রভাবশালী মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, “আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই, এই নির্বাচন ‘ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার’ (অবাধ ও নিরপেক্ষ) থাকবে, সুষ্ঠু হবে। ‘একসেপ্টেবল অ্যান্ড ক্রেডিবল’ (গ্রহণযোগ্য এবং বিশ্বাসযোগ্য) একটি নির্বাচন হবে।”

স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন ২০০৯ বলছে, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ১৮০ দিনের মধ্যে ভোটগ্রহণ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল দুই সিটির নির্বাচনের পর ডিএনসিসির প্রথম সভা হয় ওই বছরের ১৪ মে আর ডিএসসিসির ১৭ মে।

এই হিসাব অনুযায়ী ঢাকা উত্তরের মেয়াদ শেষ হবে ২০২০ সালের ১৩ মে (উপনির্বাচনে মেয়াদ বাড়বে না), আর দক্ষিণে ১৬ মে।

মুখোমুখি নৌকা-ধানের শীষ

ঢাকায় স্থানীয় সরকার পর্যায়ে নির্বাচনে এবারই প্রথমবারের মতো নিজস্ব প্রতীক নিয়ে পরস্পরের মুখোমুখি হচ্ছে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি। এর আগে ডিএনসিসির উপনির্বাচন দলীয় প্রতীকে হলেও তা বর্জন করেছিল বিএনপি।

৫৪টি সাধারণ ওয়ার্ড ও ১৮টি সংরক্ষিত মহিলা ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ডিএনসিসিতে আসন্ন নির্বাচনে এক হাজার ৩৪৯টি ভোটকেন্দ্রের সাত হাজার ৫১৬টি কক্ষে ভোট নেওয়া হবে। মোট ৩০ লাখ ৩৫ হাজার ৬২১ জন ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন।

আর ৭৫টি সাধারণ ওয়ার্ড ও ২৫টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডের ডিএসসিসির এক হাজার ১২৪টি ভোটকেন্দ্রের পাঁচ হাজার ৯৯৮টি কক্ষে ভোট নেওয়া হবে। সেখানে মোট ২৩ লাখ ৬৭ হাজার ৪৮৮ জন ভোটার রয়েছেন।

তফসিল অনুযায়ী, এই নির্বাচনের মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময় ৩১ ডিসেম্বর, যা যাচাই-বাছাই করা হবে ২ জানুয়ারি, প্রার্থিতা প্রত্যাহার করা যাবে ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত, প্রতীক বরাদ্দ হবে ১০ জানুয়ারি।

এ ছাড়া ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করা যাবে। ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারকে আপিল কর্তৃপক্ষ হিসেবে নিয়োগ করেছে ইসি।

তারিখ পরিবর্তনের দাবি

সরকারি হিসাবে হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব সরস্বতী পূজা ২৯ জানুয়ারি আর পঞ্জিকা মতে, ৩০ জানুয়ারি। যে কারণে সিটি নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তনের আহবান জানিয়েছে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশসহ কয়েকটি সংগঠন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন