Follow us

বিডিআর বিদ্রোহের নেপথ্যে জড়িতদের খুঁজতে কমিশন করুন: হাইকোর্ট

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2020-01-08
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
পিলখানায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের বিশেষ আদালতে হাজিরা দেবার পর একজন সাবেক বিডিআর সদস্যকে অন্যদের সাথে প্রিজন ভ্যানে করে জেলখানায় ফেরত নেওয়া হচ্ছে। ১৩ আগস্ট ২০১২।
পিলখানায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের বিশেষ আদালতে হাজিরা দেবার পর একজন সাবেক বিডিআর সদস্যকে অন্যদের সাথে প্রিজন ভ্যানে করে জেলখানায় ফেরত নেওয়া হচ্ছে। ১৩ আগস্ট ২০১২।
[মেঘ মনির/বেনারনিউজ]

বিডিআর বিদ্রোহের নেপথ্যে জড়িতদের খুঁজে বের করতে একটি তদন্ত কমিশন গঠনের সুপারিশ করেছে সর্বোচ্চ আদালত। রক্তাক্ত ওই বিদ্রোহের ঘটনায় ২৯ হাজার পৃষ্ঠার বেশি রায় লিখেছেন তিনজন বিচারপতি, যা বুধবার প্রকাশ করা হয়।

প্রায় ১১ বছর আগে ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার পিলখানায় আধাসামরিক বাহিনী বাংলাদেশ রাইফেলসের (বিডিআর) বিদ্রোহী জওয়ানের হাতে একসাথে ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন। সেই মামলার আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় বুধবার প্রকাশ করেছে হাইকোর্ট। এর আগে বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিল আবেদনের ওপর হাইকোর্ট রায় দেয় ২০১৭ সালের নভেম্বরে।

বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী তাঁর দীর্ঘ রায়ে ‘ঘটনার পেছনের ঘটনা’ উদ্‌ঘাটনে একটি তদন্ত কমিশন গঠনের নির্দেশনা দেন।

অন্যদিকে বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার তৎকালীন বিডিআরের রাইফেলস সিকিউরিটি ইউনিট (আরএসইউ) কেন সম্ভাব্য বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে আগাম তথ্য দিতে পারেনি, তা খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কমিটি এবং কমিটির প্রতিবেদন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জনসম্মুখে প্রকাশ করার সুপারিশ করেন।

রায়ে বলা হয়, ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে চালু করা ডাল-ভাত কর্মসূচির মতো কোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ভবিষ্যতে সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), র‌্যাব, পুলিশসহ অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনীকে যেন যুক্ত না করা হয়।

এ ধরনের আর্থিক লেনদেন ও লাভক্ষতির হিসাব-নিকাশ বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে অহেতুক বিভেদ ও নৈতিক স্খলনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়। বাংলাদেশ রাইফেলসের ক্ষেত্রে ডাল-ভাত এমন একটি উদাহরণ বলে রায়ে বলা হয়েছে।

ডাল–ভাত কর্মসূচি সম্পর্কে বিচারপতি মো. শওকত হোসেন লিখেছেন, “এটা প্রতীয়মান হয় যে, কর্মসূচিটি ছিল জওয়ানদের কিছু ক্ষোভের উৎস। ওই কর্মসূচি সাধারণ মানুষের কতটা উপকারে এসেছিল, সেই বিতর্ক এখনো রয়ে গেছে। অবশ্যই এই কর্মসূচি শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের একটা ভয়ঙ্কর উসকানির মধ্যে ঠেলে দিয়েছিল।”

তিনি বলেন, “এ ধরনের কর্মসূচি থেকে শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যদের সর্বদাই দূরে রাখা উচিত। আশা করি, সামনের দিনগুলোতে এটা রক্ষা করা হবে।”

উল্লেখ্য, ডাল–ভাত কর্মসূচি ছিল কম আয়ের মানুষের জন্য কম দামে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সরবরাহের একটি কর্মসূচি। এই কর্মসূচি পরিচালনায় যুক্ত ছিল আধাসামরিক বাহিনী বিডিআর। বিদ্রোহের পর নাম পাল্টে বাহিনীর নাম রাখা হয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।

ওই বিদ্রোহের ঘটনায় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ব্যর্থতা খুবই আলোচিত। এ সম্পর্কে বিচারপতি মো. শওকত হোসেন রায়ে লিখেছেন, “নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। …আমরা নিহতদের সুরতহাল প্রতিবেদন দেখেছি। এবং তাতে বুলেট বৃষ্টিতে তাদের ঝাঝরা করার মতো নিষ্ঠুরতা ফুটে উঠেছে। খুব সম্ভবত এটা সেনা কর্মকর্তাদের অশোভন ও অনভিপ্রেত আচরণে জওয়ানদের ক্ষুব্ধতার প্রতিফলন।”

মোট ৫৫২ জনকে সাজা

বিডিআর বিদ্রোহের মামলায় ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, চারজনকে সাত বছরের কারাদণ্ড এবং ৬৯ জনকে খালাস প্রদান করে বিচারিক আদালত।

রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। ২০১৭ সালে রায় ঘোষণা করে হাইকোর্ট। আপিল রায়ে ১৩৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয় হাইকোর্ট। তবে তখন পূর্ণাঙ্গ রায় ঘোষণা করেনি।

পূর্ণাঙ্গ রায় ঘোষণার ফলে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে সংক্ষুদ্ধ আসামি অথবা রাষ্ট্রপক্ষ হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করতে পারবে।

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বেনারকে বলে, যারা খালাস পেয়েছেন তাঁদের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করবে রাষ্ট্রপক্ষ।

তিনি বলেন, “আজকের রায় সই করে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। মোট ২৯ হাজার ৫৯ পৃষ্ঠার রায় এটি।”

মাহবুবে আলম বলেন, “রায়ে ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। ইতোমধ্যে তিনজন মারা গেছেন। যাবজ্জীবন দেওয়া হয়েছে ১৮৫ জনকে। এদের ভেতর একজন মৃত্যুবরণ করেছেন। ১৩ বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছে দুজনের। ১৫৭ জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড হয়েছে, তাঁদের মধ্যে দুজন মারা গেছেন।”

তিনি জানান, “এ ছাড়া ১৩ জনকে সাত বছর, ১৪ জনকে তিন বছর এবং এক বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে দুজনকে। অর্থাৎ মোট ৫৫২ জনকে সাজা এবং ২৮৩ জনকে খালাস দেওয়া হয়েছে। মোট মারা গেছেন ১৪ জন।”

গোয়েন্দা সংস্থার ব্যর্থতা ছিল

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশীদ বেনারকে বলেন, “আজকে হাইকোর্ট বিডিআর বিদ্রোহের আপিলের যে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করল সেখানে তারা ঘটনার ব্যাপারে তাদের পর্যবেক্ষণ ও কিছু নির্দেশনা দিয়েছে। আমি মনে করি নির্দেশনা ও পর্যবেক্ষণগুলো সঠিক। আমরা বিভিন্ন আলোচনায় এই কথাগুলো বলেছি। তবে আদালতের এই রায়ের ফলে বিষয়টি প্রাতিষ্ঠানিকতা পেল।”

তিনি বলেন, “যারা নৃশংস এই ঘটনা ঘটিয়েছে বা সহায়তা করেছে, তাদের বিচার হচ্ছে। কিন্তু যারা ঘটনার জন্য দায়ী তাদের খুঁজে বের করা দরকার। এই দায়িত্ব সরকারের। সরকার চাইলে আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক একটি শক্তিশালী কমিশন গঠন করে ঘটনার নেপথ্যে যারা ছিলে, তাদের বের করতে পারে।”

আব্দুর রশীদ বলেন, “আদালত সঠিকভাবেই বলেছেন যে, শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ডাল–ভাত কর্মসূচির মতো বেসামরিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা উচিত নয়। কারণ এ​ই কর্মসূচি বিডিআর বিদ্রোহের অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয়।”

তিনি বলেন, “গোয়েন্দা ব্যর্থতার বিষয়ে যে পর্যবেক্ষণ দেয়া হয়েছে সেটাও ঠিক। প্রধানমন্ত্রী বিডিআরের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। তিনি যাওয়ার আগে বিডিআর সদস্যরা বিভিন্ন লিফলেট বিতরণ করেছে, উস্কানিমূলক কথা বলেছে। কিন্তু গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এ ব্যাপারে কিছু জানায়নি।”

আব্দুর রশীদ বলেন, “ফলাফল খুবই মর্মান্তিক। একসাথে ৫৪ জন চৌকস অফিসারসহ ৭৪ জন মানুষের প্রাণহাণি ঘটল। এটি সত্যিই দুঃখজনক। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আগে থেকে ঘটনা সম্পর্কে জানালে হয়তো এত বড় হত্যাকাণ্ড সংঘঠিত হতো না।”

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক ও বর্তমান সাংসদ নূর মোহাম্মদ বিডিআর বিদ্রোহে তাঁর জামাতাকে হারিয়েছেন। তিনি বেনারকে বলেন, “আদালত ডাল–ভাত কর্মসূচির কারণে ঘটনাটি ঘটতে পারে বলে উল্লেখ করেছে। হয়তো ওই কর্মসূচির ভাগ কোনও বিডিআর সদস্য পায়নি, অথবা কম পেয়েছে। সেকারণে সংক্ষুদ্ধ কেউ এই ঘটনা ঘটাতে অথবা উস্কানি দিয়ে থাকতে পারে।”

তিনি বলেন, “গোয়েন্দা সংস্থার ব্যর্থতা তো সব জায়গায় আমরা দেখি। দেশে, বিদেশে সব জায়গায়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে যখন হত্যা করা হলো, সেখানে তো গোয়েন্দা সংস্থার ব্যর্থতা ছিল।”

সাবেক ওই পুলিশ প্রধানের মতে, “গোয়েন্দাদের কাজ হলো ঘটনা ঘটার আগেই খবর কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানো। ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর তো আর গোয়েন্দাদের দরকার নেই।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন