Follow us

কর্মকর্তা: ৩, ৪৫০ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তন বিষয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ, মিয়ানমার

সুনীল বড়ুয়া ও জেসমিন পাপড়ি
কক্সবাজার ও ঢাকা
2019-08-16
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পের একটি দৃশ্য, কক্সবাজার, জুলাই ৭, ২০১৯
রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পের একটি দৃশ্য, কক্সবাজার, জুলাই ৭, ২০১৯
ছবি: সুনীল বড়ুয়া, বেনার নিউজ

গত শুক্রবার বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার বলেছে, দু বছর আগে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রথম প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে তারা কাজ করছেন।

উল্লেখ্য, রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নীপিড়নমূলক অভিযানের ফলে ২০১৭ সালের আগস্টের পর প্রায় সাড়ে সাত লাখ শরণার্থী বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে। যদিও আলোচিত প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে এখনও ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।

কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. আবুল কালাম বেনারকে বলেন, দুই দফায় ২২ হাজার ৪৩২ এবং ২৫ হাজার ৭ জন রোহিঙ্গার তালিকা মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এদের মধ্য থেকে ওই সংখ্যক (৩,৪৫০ জন) রোহিঙ্গাকে মিয়ানমার ক্লিয়ারেন্স দিয়েছে।

যদিও কবে এবং কীভাবে এই প্রত্যাবর্তনের কাজটি সম্পন্ন হবে, এ ব্যাপারে কোনো বিস্তারিত তথ্য দেন নি মো. আবুল কালাম। উল্লেখ্য, এর আগেও একবার প্রত্যাবর্তনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিলো, শরণার্থীদের বিক্ষোভ এবং প্রত্যাখানের কারণে সেটি কার্যকর হয়নি। শরণার্থীরা বলেছিলেন, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত তারা যাবেন না।

মো. আবুল কালাম আরও বলেছেন,  “প্রত্যাবাসন শুরুর বিষয়ে আমি এখনো বিস্তারিত জানি না। সরকার প্রত্যাবাসনের সিদ্ধান্ত নিলে আমরা মাঠ পর্যায়ে তা বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুত রয়েছি।”

এদিকে মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে গত শুক্রবার মিয়ানমার সরকারের মুখপাত্র জ থে এক প্রেস কনফারেন্সে বলেছেন যে, দুই প্রতিবেশি দেশ আগামী ২২ তারিখে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে সম্মত হয়েছেন। যদিও এ ব্যাপারে কোনো বিস্তারিত তথ্য তিনি দেন নি।

বাংলাদেশের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি  বলেন, ' যদি তারা এই ৩,৪৫০ জনকে ফেরত পাঠায়, আমরা সাথে সাথে তাদের গ্রহণ করবো।'

জ থে আরও বলেন, তাদেরকে দলবদ্ধভাবে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা তাঁর সরকারের রয়েছে।

প্রসঙ্গত, রোহিঙ্গারা কয়েক প্রজন্ম ধরে মিয়ানমারে বসবাস করলেও তাঁরা দেশটির নাগরিক হিসেবে স্বীকৃত নন।

গত নভেম্বরে মিয়ানমার এবং বাংলাদেশ ২০০০ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফেরত পাঠাতে সম্মত হয় । কিন্তু নাগরিকত্ব এবং নিরাপত্তার নিশ্চয়তা  না পাওয়ায় শরণার্থীরা সে সময় ফেরত যেতে অস্বীকৃতি জানান।

এদিকে ক্যানবেরায় অবস্থিত অস্ট্রেলিয়া ভিত্তিক একটি থিংক ট্যাংক অস্ট্রেলিয়ান স্ট্রাটেজিক পলিসি ইন্সটিউটের এক রিপোর্টে বলা হয়েছিলো, স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে- রাখাইন রাজ্যে কোনো ঘর বাড়ি নির্মাণ করা হয়নি, কিন্তু কিছু বড় ক্যাম্প এবং ছয়টি সামরিক স্থাপনা রয়েছে। রিপোর্টে আরও বলা হয়েছিলো, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের কোনো প্রস্তুতি সেখানে দৃশ্যমান নয়।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর মুখপাত্র জোসেফ ত্রিপুরা বেনারকে বলেন, “প্রত্যাবাসনের প্রাথমিক প্রক্রিয়া বা রোহিঙ্গাদের মতামত যাচাইয়ের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ৩ হাজার ৪৫০ জনের একটি তালিকা আমাদের কাছে দেওয়া হয়েছে। এই তালিকা ধরে কাজ শুরু করা হবে।”

“তবে কবে প্রত্যাবাসন শুরু করা হবে এটা সরকারের বিষয়। এ বিষয়ে এখন নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না,” বলেন তিনি।

“তবে ঠিক কোন বিবেচনায় এদের নাম ঠিক করা হয়েছে সে বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। মিয়ানমারই তা বলতে পারবে,” বলেন জোসেফ।

“২০১৮ সালের ৩১ অক্টোবর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ২২ হাজার ৪৩২ জনের একটি তালিকা মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। এই তালিকা থেকে ৩ হাজার ৪৫০ জন রোহিঙ্গার বিষয়ে ক্লিয়ারেন্স দেওয়া হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি,” যোগ করেন জোসেফ।

তবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের সম্মত হওয়ার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখছে বাংলাদেশ। তবে কাউকে জোর করে মিয়ানমারে ফেরত না পাঠানোর সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে সরকার।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নবগঠিত রোহিঙ্গা সেলের মহাপরিচালক মো. দেলোয়ার হোসেনকে বেনারকে বলেন, “প্রত্যাবাসনে সম্মত হওয়াটাই শেষ কথা নয়। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার পর সত্যিকার অগ্রগতি হয়েছে বলা যাবে। আমরা সেই পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চাই।”

প্রত্যাবাসন শুরুর খবরে রো​হিঙ্গা নেতাদের বিস্ময় প্রকাশ

বাংলাদেশের কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরুর খবরে বিস্ময় প্রকাশ করে রোহিঙ্গা নেতারা বলেছেন, মিয়ানমার তাদের সঙ্গে ছলচাতুরি করছে।

বেনার নিউজকে দেওয়া পৃথক প্রতিক্রিয়ায় তিনজন রোহিঙ্গা নেতা বলেছেন, প্রত্যাবাসনের বিষয়টি তাঁরা অবগত নন। গত জুলাইয়ে বাংলাদেশে আসা মিয়ানমারের প্রতিনিধিদল দুমাসের মধ্যে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সংলাপে বসার আশ্বাস দিয়ে যান। এখন আকস্মিকভাবে প্রত্যাবাসন শুরুর কথা বলে পরিস্থিতি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা হচ্ছে বলে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান তাঁরা।

রোহিঙ্গাদের সংগঠন আরাকান সোসাইটি ফর পিস এন্ড হিউম্যান রাইটসের সভাপতি মো. মুহিব উল্লাহ বেনারকে বলেন, “প্রত্যাবাসনের বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। আগামী সপ্তাহে প্রত্যাবাসন শুরুর কথা বলা হলেও বাংলাদেশ বা মিয়ানমার আজ পর্যন্ত বিষয়টি আমাদের জানায়নি। সংবাদ মাধ্যমে বিষয়টি জেনে আমরা রীতিমতো অবাক হয়েছি।”

গত ২৭ ও ২৮ জুলাই মিয়ানমারের স্থায়ী পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থোয়ের নেতৃত্বে বাংলাদেশে আসা মিয়ানমার প্রতিনিধি দলের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের কয়েক দফা বৈঠক হয়। সেখানে ৩৫ জন রোহিঙ্গা নেতার উপস্থিতিতে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে সংলাপে বসার আগ্রহ প্রকাশ করেন রোহিঙ্গা নেতারা।

“মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের আশ্বাস অনুযায়ী, আগামী দুই মাসের মধ্যে তাদের সঙ্গে আমাদের সংলাপ হওয়ার কথা। অথচ হঠাৎ করে প্রত্যাবাসনের এ খবর আমাদের উদ্বিগ্ন করেছে। তবে আমরা এখনও ধরে নিচ্ছি, বৈঠকের সিদ্বান্ত অনুযায়ী তারা আমাদের সাথে সংলাপে বসবে,” জানান আরাকান সোসাইটি ফর পিস এন্ড হিউম্যান রাইটসের সভাপতি মো. মুহিব উল্লাহ।

এই রোহিঙ্গা নেতা আরও বলেন, “আমরা অবশ্যই মিয়ানমারে ফিরে যেতে চাই। এজন্য আমরা এই সংলাপের নাম দিয়েছি ‘গো হোম ডায়ালগ’।”

“বৈঠকে রোহিঙ্গাদের তিনটি দাবি তুলে ধরা হয়েছিল। এগুলো হলো; নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা এবং নিজ ভিটেমাটি ফিরিয়ে দেওয়া। এসব দাবির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার আগে প্রত্যাবাসন সফল হবে না,” যোগ করেন মুহিব উল্লাহ।

রোহিঙ্গা নেতা মাষ্টার মো. ইলিয়াছ বেনারকে বলেন, “আমাদের সঙ্গে সংলাপে বসার কথা বলে প্রত্যাবাসন শুরুর ঘোষণায় আমরা বিস্মিত হয়েছি, নতুন ষড়যন্ত্রের আভাস পাচ্ছি।”

“রোহিঙ্গাদের উপর মিয়ানমার সেনাদের চালানো বর্বরতা ও গণহত্যার বিচার চাই আমরা। পাশাপাশি আমাদের নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, ভিটামাটি পাওয়া নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা প্রত্যাবাসন চাই না,” বলেন তিনি।

উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্প-৪ এর হেড মাঝি আব্দুর রহিম বেনারকে বলেন, প্রত্যাবাসন শুরুর বিষয়ে রোহিঙ্গারা কিছুই জানে না। তবে শুরু থেকেই বলে আসছি, আমরা মিয়ানমারে ফিরে যেতে চাই। তবে আমাদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে।”

রোহিঙ্গাদের দেওয়া মিয়ানমারের আশ্বাস প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন বলেন, মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলটি রোহিঙ্গাদের সাথে তাদের ভাষায় কথা বলে। আমরা সেসব কথা বেশি বুঝতে পারেনি। তবে সংলাপের কথা দুই পক্ষই বলেছিল।”

বিশেষজ্ঞের দৃষ্টিতে প্রত্যাবাসন

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বেনারকে বলেন, দু’পক্ষেরই ইচ্ছা জাতিসংঘের  আসন্ন সাধারণ অধিবেশনে কিছু একটা অগ্রগতির কথা জানানো। তবে মিয়ানমারের ব্যাপারটা এখন পর্যন্ত লোক দেখানো মনে হয়। বাংলাদেশের সদিচ্ছা আছে, সেটা থাকারই কথা।

তিনি বলেন, সব ধরনের প্রস্তুতি থাকার পরেও গত নভেম্বরে যেসব কারণে প্রত্যাবাসন শুরু হয়নি, সেসব কারণ দূর করা হয়েছে কিনা, তা স্পষ্ট নয়। এবার যাদের নাম তালিকায় রয়েছে তারা ফিরতে সম্মত কিনা সেই বিষয়টিও জানা যাচ্ছে না।

আসিফ মুনীর বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টির মধ্যে তাড়াহুড়া এবং অস্বচ্ছতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নাগরিকত্বের বিষয়টা সময়ের ব্যাপার হলেও রোহিঙ্গারা তাদের নিজ বাসস্থানে ফিরতে পারবে কিনা সেটাও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করা হয়নি।

এই অভিভাসন বিশেষজ্ঞের মতে, দ্রুত এই প্রক্রিয়া শুরুর নেপথ্যে চীনের ভূমিকা থাকতে পারে। তবে এই প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা আসলে কতটুকু, তা প্রকাশ্য নয়।

উল্লেখ্য, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা আসতে শুরু করে। এর আগে আসা রোহিঙ্গাসহ বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে বসবাস করছে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন