Follow us

ভীতি ও পক্ষপাতহীন সাংবাদিকতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পুরস্কৃত শহিদুল আলম

প্রাপ্তি রহমান
ঢাকা
2020-07-13
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
জেল থেকে ছাড়া পাবার পর নিজের প্রতিষ্ঠিত ঢাকার দৃক গ্যালারিতে আলোকচিত্রী শহিদুল আলম। ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮।
জেল থেকে ছাড়া পাবার পর নিজের প্রতিষ্ঠিত ঢাকার দৃক গ্যালারিতে আলোকচিত্রী শহিদুল আলম। ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮।
[বেনারনিউজ]

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) এ বছরের ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ফ্রিডম অ্যাওয়ার্ডের জন্য নির্বাচিত করেছে বাংলাদেশের শহিদুল আলমসহ চারজনকে।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফটোগ্রাফার শহিদুল আলমসহ মনোনয়নপ্রাপ্ত চারজনকেই সংবাদিকতার জন্য হয় কারাভোগ করতে হয়েছে, না হয় মুখোমুখি হতে হয়েছে মামলার।

পুরস্কারপ্রাপ্তদের নাম প্রকাশ করে সিপিজের নির্বাহী পরিচালক জোয়েল সাইমন বলেন, “তাঁরা কাজ করেছেন ভয়ভীতি ও পক্ষপাতহীনভাবে, একাগ্রভাবে তাঁরা সমাজ, রাষ্ট্র ও পৃথিবীর জন্য কাজ করে গেছেন।”

এদিকে পুরস্কারপ্রাপ্তিতে খুশি হয়েছেন বলে বেনারকে জানিয়েছেন শহিদুল আলম।

তিনি বেনারকে বলেন, “আমি খুশি। এই স্বীকৃতি সব ধরনের নির্যাতনের বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলনকে আরও জোরদার করবে।”

তিনি আরও বলেন, “তবে আমি মনে করি সিপিজে যে দেশে অবস্থিত, সে দেশে বিরুদ্ধ মতের জন্য যাঁরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন তাঁদের পুরস্কারপ্রাপ্তিতে অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। সে হিসেবে আমার আগে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ পেতে পারতেন।”

প্রসঙ্গত, বহুল আলোচিত উইকিলিস এর প্রতিষ্ঠাতা অস্ট্রেলিয় সাংবাদিক জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশের গোপন নথি প্রকাশ করে দেবার পর ২০১২’র জুন থেকে ২০১৯ এর এপ্রিল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের ইকুয়েডর দূতাবাসে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে ছিলেন।

পরবর্তীতে ইকুয়েডর দূতাবাস তাঁকে যুক্তরাজ্য পুলিশের কাছে হস্তান্তর করার পর বর্তমানে তিনি লন্ডনে কারাবন্দি রয়েছেন।

এদিকে শহিদুল আলম এমন এক সময়ে এই স্বীকৃতি পেলেন, যখন বাংলাদেশের অন্তত ৪০ জন সাংবাদিক ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলার মুখোমুখি রয়েছেন।

আরও যারা পুরস্কৃত

চলতি বছর বিশ্বব্যাপী মুক্ত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাওয়া অলাভজনক প্রতিষ্ঠান সিপিজের এই স্বীকৃতি আরও যারা পেলেন, তাঁরা হলেন ইরানের মো মোসায়েদ, নাইজেরিয়ার দাপো ওলোরুনিওমাই ও রাশিয়ার স্ভেতলানা প্রোকোপিভা।

এর বাইরেও স্বাধীন সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠায় একনিষ্ঠ অবদানের জন্য গোয়েন আইফিল প্রেস ফ্রিডম অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে আইনজীবী আমাল ক্লুনিকে। মিয়ানমারে রয়টার্সের দুই প্রতিনিধি ওয়া লোন ও কিয়াও সোয়ে ওও’র পক্ষে আইনী লড়াই করেন আমাল।

দীর্ঘ ১৭ মাস জেল খাটার পর তাঁরা মুক্তি পান।

জোয়েল সাইমন বলেন, পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিকরা শক্তিশালী পক্ষ এবং যারা সত্যকে মেনে নিতে পারে না তাঁদের সঙ্গে লড়াই করেছেন। কিন্তু মহামারির সময় তাঁদের এই কাজটা হয়ে উঠেছে আরও কঠিন।

“মহামারি সাংবাদিকদের কাজকে কঠিন করেনি, মুক্ত গণমাধ্যমকে কঠোরভাবে দমনের পথ ধরেছে সারা বিশ্বের স্বৈরশাসকেরা। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার দোহাই দিয়ে তাঁরা নিজেদের দুর্বলতা ঢাকতে সংবাদ প্রকাশে বাধা সৃষ্টি করছেন,” বিবৃতিতে বলেন জোয়েল সাইমন।

শহিদুল আলম সম্পর্কে যা বলেছে সিপিজে

শহিদুল আলম সম্পর্কে সিপিজে বলেছে, তিনি খ্যাতিমান ফটোসাংবাদিক, ভাষ্যকার এবং বাংলাদেশের মাল্টিমিডিয়া প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান পাঠশালা মিডিয়া ইনস্টিটিউট এবং দৃক ফটো লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠাতা।

২০১৮ সালে আগস্টে ঢাকার ছাত্র আন্দোলনের সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও প্রকাশের পর শহিদুল আলম গ্রেপ্তার হন। এরপর ১০২ দিন জেলে খেটে ওই বছরের নভেম্বরে মুক্তি পান তিনি। জেল থেকে ছাড়া পাবার পর শহিদুল বলেন, আটকাধীন অবস্থায় তিনি মারধরের শিকার হয়েছিলেন।

গ্রেপ্তারের কয়েক ঘন্টা আগে তিনি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরাকে সাক্ষাৎকার দেন ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে ভিডিও পোস্ট করেন।

প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের জুলাইতে ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করে। ওই আন্দোলনে যে সাংবাদিকরা কাজ করছিলেন তাঁরাও হামলার শিকার হন। সিপিজে সে সময় ঘটনাগুলো নথিবদ্ধ করে।

সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ, সরকারের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো এবং মিথ্যা ও বানোয়াট কথা প্রচারের দায়ে ওই সময় শহিদুল আলমের বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে মামলা দায়ের করা হয়। আদালত তাঁর সাতদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে।

গ্রেপ্তারের পরের ঘটনা সম্পর্কে শহিদুল ওই সময় সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “ওরা আমাকে মেরেছে। আমার পাঞ্জাবিতে রক্ত লেগে গেলে ওরা সেটা ধুয়ে আবার পরতে দিয়েছে।”

সে সময় সিপিজে প্রকাশ্যে শহিদুল আলমের মুক্তি দাবি করেছিল।

যে কারণে পুরস্কৃত অপর তিনজন

ইরানের ফ্রি ল্যান্স সাংবাদিক মোহাম্মদ মোসায়েদ জেল খেটেছেন দুই দফা। তিনি অর্থনৈতিক বিষয়, দুর্নীতি ও শ্রমিকদের স্বার্থ নিয়ে লেখেন। ২০১৯ সালে একবার একটি টুইট বার্তার জন্য গ্রেপ্তার হন তিনি। এ বছর আবারও গ্রেপ্তার হন মহামারি নিয়ন্ত্রণে ইরান সরকারের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনার জন্য।

নাইজেরিয়ার দাপো ওলোরুনিওমাই প্রিমিয়াম টাইমসের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন তিন দফা। সর্বশেষ ২০১৭ সালে নিজের কার্যালয় থেকে গ্রেপ্তার হন তিনি।

রাশিয়ার স্ভেতলানা প্রোকোপিয়েভা রেডিও ফ্রি ইউরোপ/রেডিও লিবারটির সংবাদদাতা। রেডিওতে একটি আত্মঘাতী বোমা হামলা বিষয়ে আলোচনা করার জন্য তাঁর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের পক্ষাবলম্বনের অভিযোগ আনা হয়। পুলিশ তাঁকে জেরা করে। সম্প্রতি আদালত তাঁকে পাঁচ লাখ রুবল জরিমানা করেছে।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন