শহিদুলকে গ্রেফতার: প্রধানমন্ত্রীর ছেলে জয় ও ভাগ্নি টিউলিপের ভিন্নমত

জেসমিন পাপড়ি
2018.08.30
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
     শহীদুল আলমের মুক্তির দাবীতে মানববন্ধন । আগস্ট ১১, ২০১৮
রয়টার্স

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রী শহিদুল আলমকে নিয়ে পরষ্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং তাঁর বোনের মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক। একই ইস্যুতে তাঁদের এই ভিন্নমত নিয়ে রাজনীতি ছাড়াও সাধারণ মানুষের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে​।

জয় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা। টিউলিপ সিদ্দিক ব্রিটিশ পার্লামেন্টে লেবার পার্টির একজন সদস্য, তিনি শেখ রেহানার মেয়ে এবং প্রধানমন্ত্রীর ভাগ্নি। জয় ও টিউলিপের নানা ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

গত ৫ আগস্ট দৃক গ্যালারির প্রতিষ্ঠাতা শহিদুল আলমকে ঢাকায় তাঁর বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি এখন কারাগারে। শহিদুলের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, তীব্র চোয়ালের ব্যথা ও শ্বাস কষ্টে ভুগছেন তিনি। তাঁর জামিনের জন্য চেষ্টা চলছে।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্র আন্দোলন শুরু হওয়ার পর আল জাজিরা টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দেন শহিদুল। এর পরপরই তাঁকে প্রথমে বাসা থেকে তুলে নিয়ে, পরে গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমাণ্ডে নেয় পুলিশ। ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ‘অপপ্রচার’ চালানোর অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা দায়ের করা হয়।

বুধবার গণমাধ্যমে সজীব ওয়াজেদ জয়ের প্রকাশিত মতামতে বলা হয়, শহিদুল আলমকে গ্রেফতার করা যথাযথ হয়েছে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে শহিদুল উসকানিদাতাদের একজন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

জয় বলেন, শান্তিপূর্ণ আন্দোলন দ্রুত সহিংস হয়ে ওঠা এবং শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে বিএনপির ঢুকে পড়ার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের একজন ছিলেন শহিদুল। তাই জননিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে।

সজীব ওয়াজেদ আরো বলেন, “তিনি (শহিদুল আলম) গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে শিক্ষার্থী মৃত্যুর মিথ্যা তথ্য ছড়িয়েছেন। যার ফলে সরকার দলীয় কার্যালয়ে হামলার ঘটনা ঘটে এবং সহিংসতার সূত্রপাত হয়। তার এই মিথ্যা ও উসকানিমূলক বক্তব্যের কারণে অনেক লোক আহত হয়।”

এর আগে শহিদুল আলম গ্রেপ্তার হওয়ার পরপরই জয় ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাসে তাঁকে গ্রেপ্তারের যুক্তি তুলে ধরেন। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও শহিদুল আলমকে গ্রেপ্তারের কারণ তুলে ধরে বক্তব্য দেন।

কিন্তু শহিদুল আলম ইস্যুতে ভিন্নরকম বক্তব্য দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বোনের মেয়ে এবং ব্রিটিশ সাংসদ টিউলিপ সিদ্দিক। লেবার পার্টির এই এমপি বলেছেন, শহিদুল আলমের গ্রেপ্তার হওয়া অত্যন্ত পীড়াদায়ক ও অবিলম্বে তার অবসান হওয়া উচিত।

গত মঙ্গলবার যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টাইমস’ এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়, শহিদুল আলমকে মুক্তি দিতে টিউলিপ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

শহিদুল আলমকে গ্রেপ্তারের নিন্দা জানিয়ে এরই মধ্যে নোবেল বিজয়ী, চিত্র পরিচালক, অভিনেতা, শিল্পী ও ব্যবসায়ীসহ বিশ্বের বিশিষ্ট নাগরিকেরা সরব হয়েছেন। এঁদের মধ্যে ছিলেন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন, স্যার রিচার্ড ব্র্যানসন, শ্যারন স্টোন, রিচার্ড কার্টিস, আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটুসহ আরো অনেকেই। টিউলিপ সিদ্দিকও তাঁদের সঙ্গে যোগ দিলেন।

টিউলিপ বলেছেন, “দেশের মানুষের বিচারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা উচিত। আমি আশা করি, বন্ধুরাষ্ট্র বিবেচনায় ব্রিটেনের পররাষ্ট্র দপ্তর এ ব্যাপারে বাংলাদেশের কাছে দৃঢ় বার্তা পাঠাবে।”

স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ

শহিদুল আলমের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তাঁর আইনজীবীরা। পুলিশ হেফাজতে তাঁর উপর শারীরিক নির্যাতনের ডাক্তারি পরীক্ষা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।

এক ফেসবুক পোস্টে জ্যোতির্ময় লিখেছেন, শহিদুল আলমকে দুইবার ডাক্তাররা পরীক্ষা করেছেন। প্রতিবারই তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, তিনি কেমন আছেন। কিন্তু পুলিশী নির্যাতন তদন্তের জন্য নিয়ম মাফিক কোনো পরীক্ষা করা হয়নি। তিনি আরো লিখেছেন, আঘাতজনিত কারণে তাঁর ঠোঁট কেটে গেছে, দাঁতও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

গ্রেপ্তার হওয়ার পর গত ৬ আগস্ট আদালত চত্বরে তাঁর ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছিলেন শহিদুল আলম।

“তার চোয়ালে তীব্র ব্যাথা রয়েছে। তাঁর শ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছে, চোখেও সমস্যা আছে। গত ৭ দিন ধরে তিনি শক্ত কোনোকিছুই মুখে দিতে পারছেন না,” বেনারকে জানান অধ্যাপক রেহনুমা আহমেদ, যিনি শহিদুলের জীবনসঙ্গী।

চলছে জামিনের চেষ্টা

শহিদুলের জামিন পাওয়ার বিষয়টি আ​ইনি জটিলতায় আটকে গেছে। তবে জামিনের ব্যাপারে হাইকোর্টে আগাম শুনানির জন্য আবেদন করা হয়েছে বলে বেনার নিউজকে জানিয়েছেন শহিদুলের আইনজীবি ব্যারিস্টার সারা হোসেন।

আদালত সূত্র জানায়, এই আবেদনের ওপর জামিন শুনানি আগামী সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হবে। তবে ঠিক কোনদিন শুনানি হবে তা বলা হয়নি। তবে সোমবার শুনানি হতে পারে বলে জানা গেছে।

গত ২৯ আগস্ট শুনানির বিষয়টি ধার্য করে বিচারপতি মো. রুহুল কুদ্দুস ও বিচারপতি খন্দকার দিলীরুজ্জামানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ আদেশ দেন।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।