Follow us

বৃহস্পতিবার শেষ হতে পারে শহিদুল আলমের জামিন শুনানি

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2018-10-29
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
হাই কোর্টে জামিন শুনানি শেষে শহিদুল আলমের আইনজীবী সারা হোসেন তাঁর স্ত্রী রেহনুমা আহমেদের সাথে কথা বলছেন। ২৯ অক্টোবর ২০১৮।
হাই কোর্টে জামিন শুনানি শেষে শহিদুল আলমের আইনজীবী সারা হোসেন তাঁর স্ত্রী রেহনুমা আহমেদের সাথে কথা বলছেন। ২৯ অক্টোবর ২০১৮।
কামরান রেজা চৌধুরী/বেনারনিউজ

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের পঞ্চম জামিন শুনানি আর লম্বা না করে আগামী বৃহস্পতিবার নাগাদ শেষ করতে চেয়েছে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ।

এজন্য শহিদুলের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের প্রমাণ করতে আগামী বৃহস্পতিবার অ্যাটর্নি জেনারেলকে অনলাইন কনটেন্ট উপস্থাপনের নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

সোমবার বিচারপতি একেএম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি মজিবুর রহমান সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে শহিদুল আলমের জামিনের পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন দুপক্ষের আইনজীবীরা।

গত ৫ আগস্ট থেকে কারারুদ্ধ শহিদুলের এ পর্যন্ত জামিন প্রশ্নে নিম্ন আদালতে তিনবার ও হাইকোর্টে দুইবার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। তবে জামিন মেলেনি দৃক গ্যালারির প্রতিষ্ঠাতা শহিদুল আলমের।

তাঁর জামিনের পক্ষে সোমবার আদালতে ব্যারিস্টার সারা হোসেন ও ড. শাহদীন মালিক এবং রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম যুক্তি উপস্থাপন করেন। বেনারনিউজ প্রতিনিধি আদালতে উপস্থিত থেকে ‍শুনানি প্রত্যক্ষ করেন।

দু'পক্ষের শুনানি শেষে বিচারপতি আসাদুজ্জামান অ্যাটর্নি জেনারেলকে কনটেন্টটি নিয়ে আসতে বললে তিনি আগামী বৃহস্পতিবার সময় চেয়ে নেন।

বিচারপতিরা তাঁর প্রস্তাবে সম্মতি জানালে শহিদুলের আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, “পুলিশের এফআইআরে যে লিংক দেয়া হয়েছে সেটার কনটেন্ট বিচার করতে আরও দুটি দিনের দরকার নেই। আপনি অথবা অ্যাটর্নি জেনারেল অথবা এই কক্ষের সবাই এখনই মোবাইল থেকে ক্লিক করে দেখতে পারেন।”

ব্যারিস্টার সারা বলেন, “শহিদুল আলম কী বলেছেন সেটা বিচার-বিবেচনা না করে এফআরআই এ যে লিংক দেয়া আছে, দেখতে হবে সেখানে কী আছে। এর বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।”

সারা হোসেনের যুক্তি খণ্ডণ করে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এফআরআই এর বাইরে কেন যাওয়া যাবে না।

এক পর্যায়ে বিচারপতি একেএম আসাদুজ্জামান অ্যাটর্নি জেনারেলকে উদ্দেশ্যে করে বলেন, “আপনি বৃহস্পতিবার কনটেন্ট নিয়ে আসেন। এটা দ্রুত শেষ হওয়া উচিত। এটা শেষ করতে চাই।”

এ সময় সারা হোসেন শহিদুল আলমের মামলাটি বৃহস্পতিবার কজলিস্টের প্রথমে রাখার কথা বললে বিচারকদ্বয় সম্মত হন।

শহিদুলের জামিনের পক্ষে সারা হোসেন বলেন, “গত ১০ দিন ধরে শহিদুল আলমের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটেছে। কারাগারে তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই।”

“শহিদুল আলম বিচারের মুখোমুখি হবেন। তিনি কেন পালাবেন? তিনি একজন খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তি। তাঁকে জামিন দিতে কোনো বাধা নেই,” বলেন তিনি।

জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, “উনি একজন খ্যাতিসম্পন্ন ফটোগ্রাফার সেটা ঠিক। কিন্তু তিনি আল-জাজিরায় সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকার ‘নন-ইলেক্টেড’। তাই, সরকারের শাসন করার অধিকার নেই।”

“শহিদুল আলম বলেছেন সরকার ও তার সহযোগীরা ব্যাংক লুট করছে। হরহামেশা গুম-খুন হচ্ছে। শহিদুল আলম এমনভাবে বক্তব্য দিয়েছেন যে দেশ ধ্বংস হয়ে গেছে,” বলেন অ্যাটর্নি জেনারেল।

অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতকে বলেন, “তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে শহিদুল আলম রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধ করেছেন।”

শহিদুলের আরেক আইনজীবী শাহদীন মালিক আদালতকে বলেন, “বাংলাদেশের পেনাল কোডের নয়টি ধারা অনুসারে কথা বলার কারণে কোনো অপরাধ হয় না। শহিদুল কোনো অপরাধ করেননি।”

পুলিশ জানিয়েছে, ২৯ জুলাই ঢাকায় দুই স্কুল শিক্ষার্থী বাসের চাপায় নিহত হওয়ার পর দেশব্যাপী শুরু হওয়া নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন শহিদুল আলম। আন্দোলন চলার সময় তিনি ফেসবুক লাইভে এসে আন্দোলনে উস্কানি দেন।

তাঁদের মতে, শহিদুল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া খবর প্রচার করে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনকারীদের সরকারের বিরুদ্ধে উস্কে দিয়েছিলেন। ফলে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-ছাত্রীরা ক্ষমতাসীন দলের অফিস আক্রমণ করে।

শহিদুলের স্ত্রী রেহনুমা আহমেদ বেনারকে বলেন, তাঁর স্বামী সরকারের বিরুদ্ধে কোনো অপপ্রচার করেননি বা কোনো ভুয়া খবর প্রচার করে সরকারের বিরুদ্ধে কোনো উসকানি দেননি। শহিদুল আলম সাংবাদিক হিসাবে তার পেশাগত দায়িত্ব পালন করেছেন মাত্র।

জামিন আবেদনের ডায়েরি

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া খবর প্রচার ও ‘উস্কানি’ দেয়ার অভিযোগে গত ৫ আগস্ট গোয়েন্দা পুলিশ তাঁর ধানমন্ডির বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে শহিদুল আলমকে। পরদিন তাঁকে নিম্ন আদালতে হাজির করা হয়।

আদালতে তোলার সময় পুলিশের বিরুদ্ধে তাঁকে নির্যাতনের অভিযোগ করেন শহিদুল। পুলিশ সে অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

একই আদালতে শহিদুল আলমকে রিমান্ডে নিতে পুলিশ ও জামিনের জন্য তাঁর আইনজীবীরা আবেদন করেন। আদালত জামিন আবেদন খারিজ করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড শেষে শহিদুল আলমকে কারাগারে পাঠানো হয়।

নিম্ন আদালতে খারিজের পর হাইকোর্টে শহিদুলের জামিন আবেদন করা হলে ৪ সেপ্টেম্বর, সে শুনানিতে বিব্রতবোধ করে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ।

নিয়ম অনুযায়ী, শহিদুলের জামিন শুনানির জন্য হাইকোর্টের অন্য আরেকটি বেঞ্চকে নির্দেশ দেন প্রধান বিচারপতি। ওই বেঞ্চ শহিদুলের জামিনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে মহানগর দায়রা জজ আদালতকে নির্দেশ দেয়।

গত ১১ সেপ্টেম্বর দায়রা জজ আদালত আবারও জামিন আবেদন নাকচ করে। শহিদুলের জামিনের জন্য এক সপ্তাহ পর পুনরায় হাইকোর্টের শরণাপন্ন হন আইনজীবীরা।

৮ অক্টোবর দ্বিতীয় দফায় জামিন শুনানিতে ‘শহিদুলকে কেন জামিন দেয়া হবে না’ এ বিষয়ে রুল জারি করে এর জবাব দিতে সরকারকে সাত দিন সময় দেয় হাইকোর্ট। তবে জবাব দেয়নি সরকারপক্ষ। তাঁদের মতে, এ ধরনের রুলের জবাব লিখিত আকারে জানানোর বাধ্যবাধকতা নেই।

সাত দিন পার হয়ে যাওয়ার পর শহিদুলের আইনজীবীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ২১ অক্টোবর শুনানির দিন ধার্য করে আদালত। সেই দিন আদালতের কর্মতালিকার ২৫৯টি মামলার মধ্যে শহিদুলের মামলাটি ২৫৮ নম্বরে ছিল।

ওই দিন শহিদুলের জামিন শুনানি জরুরি ভিত্তিতে করার জন্য তাঁর আইনজীবীরা দৃষ্টি আকর্ষণ করলে আদালত গত ২৫ আগস্ট শুনানির দিন ধার্য করে।

আদালতের আদেশ থাকার পরেও সেদিন শহিদুলের জামিন কার্যতালিকায় (কজলিস্টে) অন্তর্ভুক্ত হয়নি। শহিদুলের আইনজীবী বিষয়টি নজরে আনলে রোববার জামিন শুনানি করার কথা জানায় আদালত।

রোববার সকালে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম দুপুর দু’টায় রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি পেশ করার আবেদন জানালে আদালত তা মঞ্জুর করে। বেলা দু’টায় বেঞ্চের দু’জন বিচারকের একজন অসুস্থ বলে জানানো হয়। সে কারণে সেই শুনানি অনুষ্ঠিত হয়নি।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন