Follow us

জামিন পেলেন শহিদুল আলম

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2018-11-15
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
খ্যাতিমান আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের জামিন হওয়ার পর তাঁর আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেনকে জড়িয়ে ধরেন শহিদুলের স্ত্রী রেহনুমা আহমেদ (ডানে)। ঢাকা, ১৫ নভেম্বর ২০১৮।
খ্যাতিমান আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের জামিন হওয়ার পর তাঁর আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেনকে জড়িয়ে ধরেন শহিদুলের স্ত্রী রেহনুমা আহমেদ (ডানে)। ঢাকা, ১৫ নভেম্বর ২০১৮।
[কামরান রেজা চৌধুরী/বেনারনিউজ]

রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন ও সরকারের বিরুদ্ধে উসকানি দেয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার ১০২ দিন পর উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রী ও দৃক গ্যালারির প্রতিষ্ঠাতা শহিদুল আলম।

বৃহস্পতিবার বিচারপতি শেখ আব্দুল আউয়াল ও বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ তিনটি বিষয় বিবেচনায় শহিদুলের জামিন মঞ্জুর করেন বলে বেনারকে জানান তাঁর আইনজীবী সারা হোসেন।

তবে রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছে, তারা হাইকোর্টের এই জামিন আদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে যাবে।

সুতরাং, জামিন পেলেও শহিদুলের মুক্তি পাওয়ার সম্ভবনা কম বলে মনে করেন আইনজীবীরা।

কেন জামিন পেলেন?

শহিদুল আলমের আইনজীবী সারা হোসেন বেনারকে বলেন, আদালত মূলত তিনটি কারণে জামিন দিয়েছেন।

তিনি বলেন, “প্রথমত, রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, শহিদুল আলম আল-জাজিরা টেলিভিশনে সাক্ষাতকারে সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যা-অসত্য তথ্য দিয়েছেন। কিন্তু মামলার প্রাথমিক তথ্য বিবরণীতে অভিযোগের স্বপক্ষে যে ফেসবুক লিঙ্ক দেয়া হয়েছে সেগুলোর সাথে বক্তব্য মেলে না।”

সারা হোসেন বলেন, জামিন দেয়ার আরেকটি কারণ হলো, তাঁকে সাত দিন পুলিশি রিমান্ডে নেয়া হয়েছিল এবং তিনি সেখানে কোনো স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেননি। আদালত বলেছেন, রিমান্ডে নেয়ার পর তাঁকে আর আটকে রাখার যৌক্তিকতা নেই।

তিনি বলেন, আদালত বলেছেন গ্রেপ্তারের ১০০ দিন পরেও অভিযোগ তদন্তে কোনো অগ্রগতি নেই। তাছাড়া তিনি, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একজন ফটোগ্রাফার। তাঁর শারিরিক অবস্থা ভালো নয়।

সারা হোসেন বলেন, আদালত বলেছে শহিদুল আলম ইতোমধ্যে জেলাখানায় অনেক ভুগেছেন।

রাষ্ট্রের পক্ষে শহিদুলের জামিনের বিরোধিতা করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

তিনি বলেন, “আমরা খুশি নই। আমরা এই রায়ের বিরুদ্ধে অবশ্যই আপিল বিভাগে যাব। আগামী রোববারেই যাব।”

ছাড়া পাবেন শহিদুল?

ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, জামিন আদেশ আদালত থেকে জেল কর্তৃপক্ষের কাছে গেলেই মুক্তি পাবেন শহিদুল আলম। আগামী রোববার শহিদুল ছাড়া পেতে পারেন বলে আশা করছেন তিনি।

তবে রোববারের মধ্যে আপিল বিভাগ কোনো আদেশ দিলে শহিদুল মুক্তি পাবেন না বলে জানান আইনজীবীরা।

শহিদুলে স্ত্রী রেহনুমা আহমেদ বেনারকে বলেন, “আমি খুশি। আমরা বিচার পেয়েছি।”

জামিন আদেশ হওয়ার পর হাইকোর্টের বারান্দায় আনন্দে সারা হোসেনকে জড়িয়ে ধরেন রেহনুমা আহমেদ।

ধানমন্ডির বাসা থেকে গ্রেপ্তারের পরদিন শহিদুল আলমকে আদালতে হাজির করে পুলিশ। ৬ আগস্ট ২০১৮ [বেনারনিউজ]
ধানমন্ডির বাসা থেকে গ্রেপ্তারের পরদিন শহিদুল আলমকে আদালতে হাজির করে পুলিশ। ৬ আগস্ট ২০১৮ [বেনারনিউজ]
কী অভিযোগ?

২৯ জুলাই বাস চাপায় রাজধানীর শহিদ রমিজউদ্দিন স্কুল ও কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত হলে শুরু হয় নিরাপদ সড়ক আন্দোলন। স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকদের অংশগ্রহণে সেই আন্দোলনে এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে অচল হয়ে পড়ে সারা দেশ।

শহিদুল আলম নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন। সাংবাদিক হিসাবে ফেসবুক লাইভে এসে কয়েকদফা আন্দোলনের খবর পোস্ট দেন তিনি।

আন্দোলন চলাকালে তিনি কাতার ভিত্তিক আল জাজিরা টেলিভিশনে লাইভ সাক্ষাতকারে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন দমনে আওয়ামী লীগ সরকারের কার্যক্রমের সমালোচনা করে বক্তব্য দেন।

সেই বক্তব্যে তিনি আওয়ামী লীগ সরকারকে ‘অনির্বাচিত’ বলে আখ্যা দেন এবং তাদের দেশ শাসন করার কোনো অধিকার নেই বলে মন্তব্য করেন।

তাঁর বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা পর ৫ আগস্ট রাতে ডিবি ‍পুলিশ তাঁর ধানমন্ডির বাসা থেকে শহিদুলকে গ্রেপ্তার করে। তাঁর বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা দায়ের করা হয়।

পুলিশ অভিযোগ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘মিথ্যা ও অসত্য’ তথ্য দিয়ে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনকে সরকার বিরোধী আন্দোলনে রূপান্তরিত করতে ‘উসকে’ দেন শহিদুল আলম।

পুলিশ জানায় শহিদুল আল-জাজিরা টেলিভিশনে সাক্ষাতকারে সরকারকে অনির্বাচিত বলে বিশ্বের কাছে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছেন।

পরদিন তাঁকে নিম্ন আদালতে উপস্থাপন করলে আদালত তাঁর জামিন আবেদন নাকচ করে সাত দিনের পুলিশি রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

পরে তাঁকে জেলখানায় পাঠিয়ে দেয় হয়।

গ্রেপ্তারের পর থেকে নিম্ন আদালতে তিনবার ও হাইকোর্টে কমপক্ষে দুইবার চেষ্টা করেও তাঁর জামিন মেলেনি।

বৃহস্পতিবার মিলল জামিন।

বৃহস্পতিবার আদালতে কী হলো?

শহিদুলের জামিন শুনানি করতে হাইকোর্টের প্রথম বেঞ্চ বিব্রত বোধ করলে তিনি জামিন পাননি। এরপর হাইকোর্টের আরেকটি বেঞ্চ জামিন আবেদন শুনলেও জামিন না দিয়ে কার্যতালিকা থেকে বাদ দেয়।

এরপর নিয়ম অনুসারে শহিদুল আলমের আইনজীবীদের পছন্দ অনুসারে বিচারপতি শেখ আব্দুল আউয়াল ও বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তীর বেঞ্চে পুনরায় জামিন শুনানির আবেদন জানান।

আদালত বুধবার শুনানির দিন ধার্য করলেও অ্যাটর্নি জেনারেলের অসুস্থতার কারণে শুনানি হয়নি। বৃহস্পতিবার সেই শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।

প্রথমেই সারা হোসেন জামিন চেয়ে বলেন, পুলিশের প্রাথমিক তথ্য বিবরণীতে শহিদুল আলমের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগে বলা হয়েছে তিনি আল-জাজিরায় সাক্ষাতকারে মিথ্যা-অসত্য তথ্য দিয়ে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছেন।

তিনি বলেন, কিন্তু এসকল অভিযোগের পক্ষে যে লিঙ্ক পুলিশের প্রাথমিক তথ্য বিবরণীতে দেয়া হয়েছে সেগুলো মেলে না।

সারা হোসেন বলেন, শহিদুল আলম একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফটোগ্রাফার। তিনি ১০৪ দিন ধরে জেলে আছেন। তাঁর স্বাস্থ্যের অবস্থা অবনতির দিকে যাচ্ছে। তাঁর চোখের সমস্য দেখা দিয়েছে।

তিনি বলেন, ১০৪ দিন পার হওয়ার পরও পুলিশ তদন্ত শেষ করেনি।

জামিনের বিরোধিতা করে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আদালতে আল-জাজিরায় দেয়া সাক্ষাতকার পড়ে শুনিয়ে বলেন, তিনি আওয়ামী সরকারকে অনির্বাচিত বলেছেন। বলেছেন, এই সরকারের ক্ষমতায় থাকার কোনো অধিকার নেই। তিনি বলেছেন, সরকার ও তার সহযোগীরা ব্যাংক লুট করছে। গুম-খুন নিত্যদিনের ঘটনা।

মাহবুবে আলম বলেন, শহিদুল বলেছেন সরকার পালানোর পথ পাবে না।

তিনি বলেন, “এত বড় একজন মানুষ কেমন করে একথা বলতে পারেন?”

জবাবে বিচারক ভীষ্মদেব চক্রবর্তী অ্যাটির্নি জেনারেলকে বলেন, এধরনের কথা তো রাজনৈতিক নেতারা সবসময় বলছেন। আপনি ইউটিউব খুলুন দেখবেন কী বিশ্রি ভাষায় গালাগাল করা হচ্ছে।

জবাবে মাহবুবে আলম বলেন, সাধারণ মানুষ বলতে পারেন। উনার মতো একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানুষ কীভাবে বলেন?

উত্তরে বিচারক ভীষ্মদেব চক্রবর্তী বলেন, উনি তো ‘সাফারও করেছেন।”

এরপর অ্যাটর্নি জেনারেল আর কথা বলেননি।

দুপক্ষের যুক্তি শোনার পর বিচারক শহিদুল আলমকে জামিন প্রদান করেন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন