Follow us

সীমান্ত হত্যার যৌথ তদন্তের সিদ্ধান্ত থেকে সরে গেলো বিজিবি-বিএসএফ

ঢাকা থেকে পুলক ঘটক
2017-02-21
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
যৌথ ঘোষণায় স্বাক্ষর করেন বিজিবি এবং বিএসএফ–এর মহাপরিচালক। ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৭।
যৌথ ঘোষণায় স্বাক্ষর করেন বিজিবি এবং বিএসএফ–এর মহাপরিচালক। ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৭।
সৌজন্যে: বিজিবি

বছর না যেতেই সীমান্ত হত্যার যৌথ তদন্তের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি এবং বিএসএফ। দুই পক্ষের মত হচ্ছে, সীমান্ত হত্যা বন্ধ হয়নি, তবে কমে এসেছে।

তবে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর সদস্যরা সীমান্তে ইদানিং বেশি আক্রান্ত হচ্ছে বলে দাবি করেছেন বিএসএফ–এর মহাপরিচালক কে কে শর্মা। জবাবে বাংলাদেশের বিশ্লেষকেরা বলছেন, নিরস্ত্র মানুষ সশস্ত্র বিএসএফ–এর জওয়ানদের ওপর হামলা করতে পারে—এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।

গতকাল মঙ্গলবার ঢাকায় বিজিবি সদর দপ্তরে বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের ৪৪তম সম্মেলন শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। বুধবার এই সম্মেলন শেষ হওয়ার আগে গতকাল মঙ্গলবার ওই সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করা হয়।

এসময় বিএসএফ–এর মহাপরিচালক বলেন, “প্রাণঘাতী নয়, এমন কৌশল অবলম্বন করার ফলে মৃত্যুর ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু বিএসএফের সদস্যদের ওপর আক্রমণের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে।”

তবে ভারতের এই দাবিকে বাংলাদেশের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে ভারতের কৌশল হিসেবেই দেখছেন তাঁরা।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন বেনারকে বলেন, “বিএসএফ–এর এই দাবি বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল হতে পারে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশি নাগরিকদেরই বেশি হত্যা করা হয়, যা বন্ধের প্রতিশ্রুতিও দিলেও সবটুকু পূরণ করছে না ভারত।”

এদিকে যৌথ তদন্তের বিষয় থেকে সরে দাঁড়ানোর কারণ জানতে চাইলে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবুল হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, “কোনো হত্যাকাণ্ডের ঘটনার তদন্ত বিএসএফ বা বিজিবি করতে পারে না। তদন্তের কাজ করে উভয় দেশের পুলিশ।”

এ বিষয়ে ড. দেলোয়ার বলেন, “সীমান্ত হত্যা কমাতে এ ধরনের হত্যাকাণ্ডগুলো যৌথভাবে তদন্তের প্রয়োজন। বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের মতানৈক্য দেখা দিয়েছে। তাই দুই দেশের সরকার পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”

নিরপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব) আব্দুর রশিদ বেনারকে বলেন, “উভয় দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব আন্তরিকভাবে চাচ্ছেন এগুলো বন্ধ হোক। তারপরও কেন এ ধরনের হত্যা হয়, মাঠ পর্যায়ে তা অনুসন্ধান করা দরকার।”

গত বছর ১৬ মে ঢাকায় ছয় দিনব্যাপী সম্মেলনে দীর্ঘ আলোচনার পর সীমান্তে হত্যাগুলোর তদন্ত যৌথভাবে করার সিদ্ধান্ত নেয় বিজিবি ও বিএসএফ। বিএসএফ—এর আপত্তির মুখে মহাপরিচালক পর্যায়ের এবারের সম্মেলনে দুপক্ষ সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে।

তবে সীমান্তের যেসব এলাকায় হত্যার ঘটনা ঘটে সেসব এলাকা চিহ্নিত করে হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবুল হোসেন।

মঙ্গলবার যৌথ ঘোষণায় সই করেন উভয় মহাপরিচালক। সংবাদ সম্মেলনে যৌথ বিবৃতি পড়ে শোনান বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মুহাম্মদ মোহসিন রেজা।

এতে বলা হয়, সীমান্তে জঙ্গি তৎপরতা প্রতিরোধে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পাশাপাশি সীমান্তে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উভয়পক্ষ যৌথভাবে কাজ করবে। ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর বাংলাদেশে সম্ভাব্য অবস্থান ধ্বংসে বিজিবির সহযোগিতা চেয়েছে ভারত। জবাবে বিজিবি প্রধান মেজর জেনারেল আবুল হোসেন বলেছেন, বাংলাদেশে কোনো ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর ক্যাম্প বা অবস্থান নেই।

সীমান্তে মৃত্যু শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে গবাদি পশু ও মাদক চোরাচালানপ্রবণ এলাকায় সমম্বিত যৌথটহল, সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী জনসাধারণকে আন্তর্জাতিক সীমান্তের বিধি-নিষেধ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিজিবি ও বিএসএফ কর্তৃক যৌথ পদক্ষেপ গ্রহণ করার বিষয়ে উভয়পক্ষ সম্মত হয়েছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বা হত্যার ক্ষেত্রে যৌথভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, কারণ শনাক্ত ও মূল্যায়নের বিষয়ে উভয়পক্ষ সম্মত হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, “বিজিবির মহাপরিচালক বাংলাদেশি নাগরিকদের গুলি করা ও হত্যার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং এ ধরনের মৃত্যুর ঘটনা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে বিএসএফ কর্তৃক সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন ও ভারতীয় নাগরিকদের সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।”

তবে কে কে শর্মার দাবি, শুধু আত্মরক্ষার জন্যই অস্ত্র ব্যবহার করেন বিএসএফ সদস্যরা।

বিজিবি-বিএসএফের শীর্ষ পর্যায়ে দফায় দফায় বৈঠকের পরও সীমান্ত হত্যা বন্ধ না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে বিজিবির মহাপরিচালক বলেন, “প্রতিটি ঘটনায় বিজিবির পক্ষ থেকে কড়া প্রতিবাদ জানানো হয়। আর বিএসএফের পক্ষ থেকে বলা হয় আত্মরক্ষার্থে গুলি চালানোর কথা।

সীমান্ত হত্যা চলছেই

ব্যাপক সমালোচনা সত্ত্বেও বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে নিরস্ত্র মানুষের উপর গুলিবর্ষণ বন্ধ হয়নি। বিএসএফ–এর হাতে গত এক বছরে সীমান্তে ৩১ বাংলাদেশি নিহত এবং ৩৯ জন আহত হয়েছেন বলে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। একই সময়ে অপহৃত হয়েছেন ২৪ জন বাংলাদেশি। গত বছর নিহতদের মধ্যে ২৩জনকে গুলি করে এবং সাতজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালে সীমান্তে নিহত হয়েছে ৪৪জন, ২০১৪ সালে ৩৫ জন, ২০১৩ সালে ২৯ জন এবং ২০১২ সালে ৩৮ জন।

প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও সীমান্ত হত্যা বন্ধ না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকেরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ড. এ এস এম আলী আশরাফ বেনারকে বলেন, “বিগত কয়েক বছরে সীমান্তে হত্যা কমে এসেছে। তবে একদম বন্ধ হয়নি। এটা আশাহত হওয়ার মতো বিষয়।”

তবে সীমান্তে শান্তির জন্য দুদেশের সীমান্তবর্তী নাগরিকদের চলাচলে বৈধপন্থা চালু করা উচিত বলে মত পাওয়া যাচ্ছে। মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশিদ বলেন, “সীমান্তের নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত ট্রানজিট পাস চালু করা যেতে পারে। এ ছাড়া চোরাচালান বন্ধ করার জন্য সীমান্ত এলাকার আর্থ–সামাজিক অবস্থার উন্নয়নসহ বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।”

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন ঢাকা থেকে জেসমিন পাপড়ি

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন