Follow us

অভিজিৎ হত্যা মামলার অগ্রগতি নিয়ে হতাশ বাদীপক্ষ

শরীফ খিয়াম
ঢাকা
2018-02-26
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
জঙ্গিদের হাতে বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অভিজিৎ রায় হত্যার তিন বছর পূর্তিতে ঢাকায় হত্যা ঘটনার স্থলে মোমবাতি জ্বালিয়ে নিহতের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানায় গণজাগরণ মঞ্চ। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮।
জঙ্গিদের হাতে বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অভিজিৎ রায় হত্যার তিন বছর পূর্তিতে ঢাকায় হত্যা ঘটনার স্থলে মোমবাতি জ্বালিয়ে নিহতের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানায় গণজাগরণ মঞ্চ। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮।
মনিরুল আলম/বেনারনিউজ

আপডেট: ২৬ ফেব্রুয়ারি, ইস্টার্ন টাইম জোন রাত ০৮.৩০

তিন বছরেও শেষ হয়নি মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ও বিজ্ঞানমনস্ক লেখক ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যার তদন্ত। আদালতে এই মামলার চার্জশিট দেওয়ার জন্য এখন পর্যন্ত ৩২ বার সময় নিয়েছেন তদন্তকারীরা। তিন মাস আগে বদলে গেছে তদন্ত সংস্থাও।

পুলিশের মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) মামলাটি আড়াই বছর তদন্তের পর গত নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এটির দায়িত্ব নিয়েছে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)। হত্যাকাণ্ডের তৃতীয় বছর পূর্তির প্রাক্কালে মামলার নতুন তদন্ত সংস্থার প্রধান মনিরুল ইসলাম দাবি করেছেন, তদন্ত প্রায় শেষ। খুব তাড়াতাড়ি অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হবে।

তবে তদন্তের গতি-প্রকৃতি নিয়ে ‘হতাশ’ মামলার বাদিপক্ষ।

উগ্র মৌলবাদী মুসলিম জঙ্গিগোষ্ঠীর দ্বারা ‘বিধর্মী-নাস্তিক’ আখ্যা পাওয়া মার্কিন নাগরিক অভিজিৎ রায় ও তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকে ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি একুশে বইমেলা থেকে ফেরার পথে রাত সোয়া আটটার দিকে কুপিয়ে জখম করে দৃর্বৃত্তরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় আক্রমণের স্বীকার হন এ দম্পতি।

তাঁদের মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান এক ফটোসাংবাদিক। রাত সাড়ে ১০টার দিকে মারা যান অভিজিৎ। গুরুতর আহত বন্যা বেঁচে গেলেও একটি আঙুল হারান।

পরদিন ২৭ ফেব্রুয়ারি নিহতের পিতা বাদী হয়ে শাহবাগ থানায় একটি মামলা করেন। সেদিনই আল-কায়েদার ভাবানুসারী বাংলাদেশি নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি) অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে৷

পরবর্তীতে এবিটি নাম বদলে আনসার আল ইসলাম নামে আত্মপ্রকাশ করে।

একই বছরের ২ মে আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখার (একিউআইএস) প্রধান অসিম উমরের নামে প্রচারিত এক ভিডিও বার্তায় দাবি করা হয়, একিউআইএস-এর সদস্যরাই অভিজিৎকে হত্যা করেছে৷

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক অভিজিৎ রায় পেশায় প্রকৌশলী ছিলেন। মুক্তবুদ্ধি ও বিজ্ঞানমনস্কতার প্রসার আর মানবাধিকার ও সমকামীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় লেখালেখি করতেন। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রেই থাকতেন।

অভিজিতের বাবা একুশে পদক বিজয়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ড. অজয় রায়ও বিজ্ঞান লেখক ও মানবাধিকার কর্মী হিসাবে সমধিক পরিচিত। অভিজিৎ হত্যা মামলার তদন্ত প্রসঙ্গে তিনি বেনারকে বলেন, “এ বিষয়ে আমার বক্তব্য একটি শব্দ, হতাশাব্যঞ্জক। আর কিছুই ব্যাখ্যা করার নেই।”

“দোষী ধরা না পড়লে এবং বিচারকাজ বিলম্বিত হলে, তা অবিচারেরই নামান্তর,” বলেন অজয় রায়।

এর আগে তিনি বহুবার এই মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি তুলেছেন।

উল্লেখ্য, প্রথম দুই বছরে ১৬ বার পেছানো হয়েছে চার্জশিট জমা দেওয়ার তারিখ, আর গত এক বছরে আরও ১৬ বার। সর্বশেষ ১৩ ফেব্রুয়ারি ছিল চার্জশিট জমা দেওয়ার তারিখ। তদন্তকারীরা সেদিনও ব্যর্থ হওয়ায় ঢাকা মহানগর আদালতের বিচারক ১৫ মার্চ নতুন তারিখ রেখেছেন।

মিলেছে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ

দীর্ঘ আড়াই বছর অভিজিৎ রায় মামলার দায়িত্বে ছিলেন মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের পরিদর্শক ফজলুর রহমান। ঘটনার পরপরই তাঁকে সহায়তা করতে দেশে এসেছিল যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) চার প্রতিনিধি। বহু চেষ্টায় তিনি আড়াই বছরেও তদন্ত শেষ করতে না পারায় মামলাটি সিটিটিসি-র হাতে চলে যায়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে রোববার দুপুরে অনানুষ্ঠানিক এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, “আমরা তদন্ত প্রায় শেষ করে এনেছি। এই মামলার বিচারকাজ চালিয়ে নেওয়ার মতো যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ পেয়েছি।”

সিটিটিসি মামলার দায়িত্ব নেওয়ার পর মোজাম্মেল হোসেন সায়মন, আরাফাত ওরফে শামস ওরফে সাজ্জাদ ও আবু সিদ্দিক ওরফে সোহেল নামের তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

মনিরুল বলেন, “সেনাবাহিনীর বহিষ্কৃত মেজর, জঙ্গিগোষ্ঠী আনসার আল ইসলামের প্রধান সৈয়দ জিয়াউল হকসহ আরও পাঁচজনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে, যারা পলাতক রয়েছেন। এর মধ্যে দুই-এক জনকে গ্রেপ্তার করা গেলে তদন্তকাজ শেষ হয়ে যাবে। তবে আর কাউকে গ্রেপ্তার করা না গেলেও মামলাটি খুব বেশিদিন আটকে রাখা হবে না।”

এর আগে অভিজিৎ হত্যায় জড়িত সন্দেহে মোট সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছিল র‌্যাব ও ডিবি। যার মধ্যে মুকুল রানা নামের একজন ডিবির সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। তবে সিটিটিসি ঘটনার সঙ্গে এদের কারোই সম্পৃক্ততা পায়নি বলে উল্লেখ করেন এ পুলিশ কর্মকর্তা।

“সিটিটিসির হাতে গ্রেপ্তার তিনজনই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ত ও ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। মূলত লেখালেখির কারণে আনসার আল ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অভিজিৎকে খুন করা হয়,” জানান মনিরুল।

 

অভিজিৎ স্মৃতি পুরস্কার ঘোষণা

অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের তৃতীয় বর্ষপূর্তিতে তাঁর নামে একটি স্মৃতি পুরস্কার দেবার ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক নাস্তিক ও মুক্ত চিন্তকদের সংগঠন ফ্রিডম ফ্রম রিলিজিওন ফাউন্ডেশন (এফএফআরএফ)।

পুরস্কারটি প্রসঙ্গে এফএফআরএফ এর ওয়েবসাইটে শনিবার এক ঘোষণায় বলা হয়, “অভিজিৎ পুরস্কারটি তাঁকেই দেওয়া হবে, যিনি মানবিক ও বৈষম্যহীন একটি সমাজ গড়ার উদ্দেশ্যে ধর্মীয় মৌলবাদী চেতনার প্রভাব দূর করে যুক্তিবাদিতার প্রসারে কাজ করছেন।”

এতে আরো বলা হয়, জীবনের হুমকি আছে জেনেও বিশ্বব্যাপী যারা নির্ভীকভাবে তাঁদের সৃষ্টিশীল কাজের মাধ্যমে বিজ্ঞান, যুক্তিবাদ ও মানবতবাদ প্রচার করে যাচ্ছেন, তাঁদেরকেই এই পুরস্কারের মাধ্যমে স্বীকৃতি দেওয়া হবে।

“যুক্তিবাদ ও চিন্তার স্বাধীনতা সমুন্নত রাখার জন্য অভিজিতের কাজ এগিয়ে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ,” পুরস্কারের ঘোষণায় বলেন এফএফআরএফ এর সহ-সভাপতি এনি লরি গেলর।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন