Follow us

শাহজাহান বাচ্চুর কথিত হত্যাকারী ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত

শরীফ খিয়াম
2018-06-28
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকার শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে শাহজাহান বাচ্চু হত্যার প্রতিবাদ কর্মসূচি। ১২ জুন ২০১৮।
ঢাকার শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে শাহজাহান বাচ্চু হত্যার প্রতিবাদ কর্মসূচি। ১২ জুন ২০১৮।
বেনারনিউজ

গাজীপুর থেকে গ্রেপ্তারের তিন দিনের মাথায় পুলিশের কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন মুক্তমনা কবি ও প্রকাশক শাহজাহান বাচ্চুর হত্যাকারী আবদুর রহমান (৩০)।

মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার খাসমহল বালুরচরে বুধবার দিবাগত রাতে এই ঘটনা ঘটে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে হ্যান্ড গ্রেনেড, আগ্নেয়াস্ত্র ও মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছে।

জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ জায়েদুল আলম বৃহস্পতিবার দুপুরে বেনারকে বলেন, “নিহত আবদুর রহমানই শাহজাহান বাচ্চুকে গুলি করেছিল। তিনি জেএমবি’র (জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ) ‘ঢাকা বিভাগীয় সামরিক কমান্ডার’ ছিলেন।”

এ নিয়ে আলাপকালে মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন প্রশ্ন তোলেন, “এত গুরুত্বপূর্ণ এক আসামি কীভাবে বন্দুকযুদ্ধের শিকার হয়? কেউ কি প্রকৃত ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা করছে?”

তবে “তার সহযোগী জঙ্গিরা আয়ত্তের মধ্যেই আছে,” উল্লেখ করে এসপি জায়েদুল জানান, ১১ জুন বাচ্চু হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া চারজন মোটরসাইকেল আরোহী ছাড়াও আশপাশে তাদের আরও সহযোগী ছিল বলে ধারণা করছে পুলিশ।

লিটনের অভিমত, “এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পাঁচ-ছয় জনের মধ্যে এক-দুই জনকে না পাওয়া গেলেই পুরো ঘটনাটা উদঘাটন করা প্রায় অসম্ভব। জঙ্গি-মিশনগুলোয় একেকজন একেকটা বিষয়ে জ্ঞাত থাকে। পুরো বিষয়টা সবাই জানে না।”

যদিও এসপি’র দাবি, “আমাদের তদন্ত সমাপ্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।”

এর আগে দেশে জঙ্গি বিরোধী অভিযান চলাকালে ২০১৩ সাল থেকে ২০১৭ সালের জুন অবধি এক হাজার ১৭০টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, এর মধ্যে ৩৪৭ ব্যক্তি গুম হয়েছেন।

“এ কারণে বহু মামলার তদন্ত বিঘ্নিত হয়েছে” অভিযোগ করে আসক’র সাবেক নির্বাহী পরিচালক লিটন বেনারকে আরও বলেন, বেশ কিছুদিন বিরতির পর আমরা আবার ‘টার্গেট কিলিং’ দেখলাম শাহজাহান বাচ্চুর ঘটনায়। যে কারণে তাঁর হত্যাকারী নিঃসন্দেহে খুবই মূল্যবান ছিল।”

“কিন্তু ক্রসফায়ারের মধ্য দিয়ে যেভাবে বিষয়টির পরিসমাপ্তি ঘটানো হয়েছে, তাতে ব্যক্তিগতভাবে আমি সন্দেহ পোষণ করি,” যোগ করেন তিনি।

প্রসঙ্গত, গত ১১ জুন বিকেলে সিরাজদিখান উপজেলার কাকালদী মোড়ে দুটি মোটরসাইকেলে করে আসা চারজন শাহজাহান বাচ্চুকে (৫৭) গুলি করে হত্যা করে বোমা ফাটিয়ে পালিয়ে যায়।

এই ঘটনায় অজ্ঞাত চারজনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছিল।

যেভাবে নিহত হন আবদুর

এসপি জায়েদুল বেনারকে বলেন, “১৩-১৪ তারিখেই আমরা হত্যার ‘ক্লু’ পেয়েছিলাম। এরই ধারাবাহিকতায় ২৪ জুন (রোববার) ভোরে এসে গাজীপুরের শ্রীপুর পৌর এলাকার একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে আমরা জেএমবি নেতা আবদুর রহমানকে গ্রেপ্তার করি।”

“এরপর তার দেওয়া তথ্যানুযায়ী গত কয়দিন ধরে আমরা একটানা অভিযান পরিচালনা করে আসছি। এরই অংশ হিসেবে গত (বুধবার) রাতেও বালুরচরে (সিরাজদিখান উপজেলা) একটি অভিযানে যাওয়া হয়, যেখানে আমিও ছিলাম। সেখানে জঙ্গিরা যে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকত, আমরা গিয়ে সেটি তালাবদ্ধ দেখতে পাই।”

“পরে ফেরার পথে আমাদের ওপর আক্রমণ করে আবদুর রহমানকে কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে তার সহযোগীরা। পুলিশও তখন পাল্টা গুলি চালায়। গোলাগুলির মধ্যে আব্দুর রহমান নিহত হয়,” যোগ করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।

এর আগে সকালে মুন্সিগঞ্জ পুলিশের জেলা ইন্টেলিজেন্স অফিসার (ডিআইও-১) মো. নজরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, “ওই ঘটনায় সিরাজদিখান থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) দেলোয়ার, হাসান এবং কনস্টেবল মোশাররফও আহত হয়েছেন।”

এর আগে রবিবার গাজীপুরে অভিযান শেষে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ওই বাড়িতে পুরোনো জেএমবির সদস্যরা আস্তানা গেড়েছিল। সেখানে তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র ও চারটি বিস্ফোরক পাওয়া গেছে।

বাড়ির মালিক পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত হাবিলদার রফিকুল ইসলাম বলেছিলেন, “বাড়ির নিচ তলার ভাড়াটিয়া ও তার স্ত্রীকে আটক করেছে পুলিশ।”

কালিয়াকৈর সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) শাহীদুল ইসলাম বলেছিলেন, “আটক আবদুর রহমান (৩০) পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার জাকিয়াপাড়া গ্রামের মো. হোসেন আলীর ছেলে। তার স্ত্রী শামসুন্নাহার (২৮) একই উপজেলার কালীগঞ্জ গ্রামের মো. ফজলুল হকের মেয়ে।”

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা সেদিনই জানিয়েছিলেন, পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় শাহজাহান বাচ্চু ‘শুদ্ধ চর্চা কেন্দ্র’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতেন। সেখান থেকেই জেএমবি সদস্যরা তাঁকে টার্গেট করে।

তবে এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক বক্তব্যদানে অপারগতা প্রকাশ করে পুলিশের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) সহেলী ফেরদৌস সোমবার বেনারকে বলেছিলেন, “অপারেশন এখনো চলছে।”

অভিযানে ছিল পাঁচটি ইউনিট

এসপির দেওয়া তথ্যানুযায়ী, গাজীপুর থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছে মুন্সিগঞ্জ জেলা পুলিশ। তাদের সহায়তা করছে অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) এবং পুলিশ সদর দপ্তরের ইন্টেলিজেন্স উইং এবং বগুড়া ও গাজীপুর জেলা পুলিশ।

জায়েদুল বলেন, “মুন্সিগঞ্জের গোয়েন্দা ইউনিট এবং কাউন্টার টেররিজম ইউনিটসহ পুলিশের সকলেই জঙ্গিদের ব্যাপারে সতর্ক ছিলাম। তবে শাহজাহান বাচ্চুর বিষয়টি আমরা অবগতই ছিলাম না। এমনকি তাঁর কাছের অনেক বন্ধুও জানতেন না যে তিনি হুমকির মুখে আছেন।”

“আমরা জানলে অবশ্যই তার নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যবস্থা করতাম,” উল্লেখ করে এসপি আরও বলেন, “যদিও ‘টার্গেট কিলিং’ ঠেকানো বেশ মুশকিলের।”

বিশাকা প্রকাশনীর মালিক শাহজাহান বাচ্চু মুন্সিগঞ্জ জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ‘আমাদের বিক্রমপুর’ নামের একটি অনিয়মিত সাপ্তাহিক পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকও ছিলেন তিনি।

লেখালেখির কারণে ধর্মীয় উগ্রবাদীরা বিভিন্ন সময় তাঁকে হুমকি দিয়েছে বলে গণমাধ্যমকে নিজেই জানিয়েছিলেন বাচ্চু। তিনি নিহত হওয়ার পর তাঁর স্বজন-বন্ধুদের ভাষ্যে বিষটি ফের আলোচনায় আসে।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন