Follow us

বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের 'বিশেষ বিধান' অপ্রাপ্তবয়স্ক বিয়ে বাড়িয়ে দেবার আশঙ্কা

ঢাকা থেকে জেসমিন পাপড়ি
2016-12-02
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
বিশেষ বিধান বাতিল করে মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ করার দাবিতে প্রতিদিনই কর্মসূচি পালন করছে বিভিন্ন সংগঠন। নভেম্বর ২৯, ২০১৬।
বিশেষ বিধান বাতিল করে মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ করার দাবিতে প্রতিদিনই কর্মসূচি পালন করছে বিভিন্ন সংগঠন। নভেম্বর ২৯, ২০১৬।
স্টার মেইল

বিশেষ বিধান যুক্ত করে ১৮ থেকে কমবয়সী মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার সুযোগ রেখে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন পাস না করতে বাংলাদেশের সংসদ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরসি)

বাংলাদেশের বিভিন্ন সংগঠনও দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সভা সমাবেশের মাধ্যমে প্রস্তাবিত ওই আইনের বিশেষ ধারাটি বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছিল।

এরই মাঝে গত মাসে মন্ত্রিসভায় আইনের খসড়াটি অনুমোদন পায়। যেখানে সাধারণভাবে ছেলেদের বিয়ের বয়সসীমা ২১ ও মেয়েদের ১৮ বছর রাখা হলেও বিশেষ ক্ষেত্রে অপ্রাপ্তবয়স্ক যে কোনো মেয়েকে আদালতের নির্দেশ এবং মা-বাবার সম্মতিতে বিয়ে দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। যার বিরুদ্ধে সরব অবস্থান নিয়েছে মানবাধিকার কর্মীরা।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এই আইন পাস হলে ‘বিশেষ ক্ষেত্রের’ সুযোগ নিয়ে দেশে বাল্য বিবাহ বাড়বে। এতে করে বেড়ে যাবে শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হারও। পাশাপাশি নারী নির্যাতনের পরিমাণ ভয়াবহ আকার নেওয়ার আশঙ্কাও করছেন তারা।

তবে শুরু থেকেই বিষয়টি অস্বীকার করে আইনের অপব্যবহার বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে সরকার।

চাপের কাছে নতি স্বীকার না করার আহবান

রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পাওয়া খসড়াটি সংসদে গেলে তা বাতিল করতে সংসদ সদস্যদের প্রতি আহবান জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। এটি পাস হলে বাংলাদেশের মেয়েদেরকে বাল্যবিয়ের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া হবে জানিয়েছে সংগঠনটি।

শুক্রবার দেওয়া বিবৃতিতে এইচআরডব্লিউ উইমেন রাইটস বিভাগের জ্যেষ্ঠ গবেষক হিদার বার বলেছে, “ওই খসড়াটি আইন হিসেবে পাস হলে, এটি বাংলাদেশকে অনেকটা পেছনের দিকে ঠেলে দেবে।”

বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম বাল্যবিবাহ প্রবণ দেশ আখ্যা দিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, এখানে ১৮ বছরের আগেই ৫২ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়। আর ১৫ বছরের আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসানো হয় ১৮ শতাংশ কন্যা শিশুকে। ফলে এসব মেয়েদের স্কুল ছাড়তে হয়। দারিদ্র্যের মধ্যে পড়তে হয়। কম বয়সে মা হওয়ায় ওই মা ও তার শিশু স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ে।”

এতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছিলেন, ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ বছরের কম বয়সীদের বিয়ে বন্ধ করতে একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে। পাশাপাশি ২০১৮ সালের মধ্যে ১৮ বছরের কম বয়সীদের বিয়ে বন্ধ করার কথাও বলেন তিনি। তবে আজও এ বিষয়ে তেমন কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করেনি সরকার।

এ বিষয়ে সরকারের সমালোচনা করে হিদার বার বলেন, “প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কোনো কর্ম পরিকল্পনা গ্রহণ না করে সরকার ভুল পথে মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স শিথিল করার সুযোগ দিচ্ছে।”

প্রস্তাবিত ওই নতুন আইনে বিশেষ প্রেক্ষাপটে ন্যূনতম কোন বয়সের মেয়েদের বিয়ে দেওয়া যাবে সে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়নি। এক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশের কথা বলা হয়েছে।

তবে মন্ত্রিসভায় পাস হওয়ার পরে এ বিষয়ে যুক্তি তুলে ধরে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেছিলেন, “মাত্র ১০-১১ বছর বয়সেও ছেলেমেয়েরা পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে, এমনকি প্রেগন্যান্ট হয়ে যায়। সেসব সমস্যা থেকে বাঁচতে এই বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।”

হিদার বার এই যুক্তির কড়া সমালোচনা করে বলেন, “এই যুক্তি মেনে নিলে মেয়েরা ধর্ষককে বিয়ে করতে বাধ্য হবে।”

এ প্রসঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে ঢাকার ৩৫ বছর বয়স্ক গৃহকর্মী রাহেলা বেগম জানান তার বিয়ে হয়েছে ১৪ বছর বয়সে। তিনি বলেন “আমার বয়স যখন ১৫ তখন আমার প্রথম ছেলেটা অপুষ্টির কারণে মাত্র তিন মাস বয়সে মারা যায়।”

তার বড়ো মেয়ের বিয়ে ১৬ বছর বয়সে হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এখন আমি একজন নানি। মেয়েটার দিকে তাকানো যায় না। ১৭ বছর বয়সে তাকে ৪০ বছরের মতো দেখায়।”

তার ছোট মেয়ে পড়াশোনার করছে জানিয়ে রাহেলা বেগম যোগ করেন, “অত অল্প বয়সে বড়ো মেয়েটার বিয়ে না দিলে, আজ সেও ছোট মেয়ের মতো সুন্দর আর ভালো স্বাস্থ্য নিয়ে থাকতে পারত।”

আইনের অপব্যবহারের আশঙ্কা

প্রস্তাবিত আইনটি পাস হলে এর অপব্যবহার হবে বলে আশঙ্কা করছেন নারী নেত্রী ও মানবাধিকার কর্মীরা। এটি নারীর ক্ষমতায়নের জন্য হুমকি হতে পারে বলেও অভিমত তাঁদের।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির (বিএনডব্লিউএলএ) নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সালমা আলী বেনারকে বলেন, “আইনটিতে অনেক ইতিবাচক বিষয় আছে, বলা যায় এটি প্রতিরোধমূলক আইন। অথচ ওই একটি ধারা পুরো আইনটিকে নষ্ট করে দেবে।”

তিনি বলেন, “আমাদের দেশে যেকোনো কিছুর অপব্যবহারের প্রবণতা অনেক বেশি। এই আইনের বিশেষ বিধানটিরও অপব্যবহার হবে। এই বিধানে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে। অথচ কোনো নির্দিষ্ট বয়স উল্লেখ করা হয়নি। এই সুযোগে কন্যা শিশুদের বিয়ের সংখ্যা বাড়বে।”

জাতীয় সংসদে ক্ষমতাসীন দলের হুইপ আতিউর রহমান আতিক বেনারকে জানান, “আগামী ৪ ডিসেম্বর পরবর্তী সংসদ অধিবেশন শুরু হতে যাচ্ছে। বাল্যবিবাহ নিরোধ বিলটি এই অধিবেশনেই  উঠতে পারে।”

এইচআরসি’র মতো আইনটি রুখতে সাংসদদের প্রতি আহবান জানিয়ে জাতীয় মহিলা পরিষদের সভানেত্রী আয়শা খানম বেনারকে বলেন, “এ আইনটির ফলে নারী  নির্যাতন বাড়বে। শিশু বয়সে মা হওয়ার প্রবণতা বাড়বে। যা নারীর ক্ষমতায়নকে হুমকির মুখে ফেলবে।”

তিনি বলেন, “নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ অনেকটাই এগিয়ে গেছে। এই আইনটি পাস হলে আবারও সেখান থেকে পিছন দিকে হাঁটা শুরু হবে।”

তবে এসব আশঙ্কাকে অমূলক দাবি করা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে।

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী বেনারকে বলেন, “সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ক্ষেত্রের জন্য এই বিশেষ বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এর যাতে অপব্যবহার না হতে পারে সেজন্য বাল্যবিবাহ সংক্রান্ত আইনের সকল ফাঁক ফোকর বন্ধ করা হবে।”

তিনি বলেন, “বাল্যবিয়ের মাধ্যমে একজন শিশুকে অনিশ্চিত এবং হিংস্র ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। এতে তার মানসিক বিকাশ ও এগিয়ে যাওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। এর মাধ্যমে একজন শিশুর কাছ থেকে তার শৈশবকেই কেড়ে নেওয়া হয়।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন