Follow us

দুই মাসের মধ্যে সব কলকারখানায় ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপনের নির্দেশ

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2020-02-18
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকার এক হাসপাতালে মায়ের কোলে একটি শিশু। দুই মাসের মধ্যে দেশের সব কলকারখানায় ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপন করতে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। ২০ এপ্রিল ২০১৯।
ঢাকার এক হাসপাতালে মায়ের কোলে একটি শিশু। দুই মাসের মধ্যে দেশের সব কলকারখানায় ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপন করতে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। ২০ এপ্রিল ২০১৯।
[বেনারনিউজ]

গার্মেন্টসসহ দেশের সব কলকারখানায় আগামী দুই মাসের মধ্যে ব্রেস্ট ফিডিং বা বেবি কেয়ার কর্নার স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশের উচ্চ আদালত।

মঙ্গলবার এ বিষয়ে এক সম্পূরক আবেদনের শুনানির পরে এ আদেশ দেয় বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাই কোর্ট বেঞ্চ।

গত অক্টোবরে ৯ মাস বয়সী শিশু উমাইর বিন সাদী ও তার মা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান ব্রেস্ট ফিডিং রুম ও বেবি কেয়ার কর্নার স্থাপনে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট করেন।

এর প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গত বছরের ২৭ অক্টোবর সরকারি প্রতিষ্ঠান, কর্মস্থল ও জনসমাগম স্থলে ব্রেস্ট ফিডিং এবং বেবি কেয়ার কর্নার স্থাপনে পদক্ষেপ প্রশ্নে রুল দেয় আদালত।

এর ধারাবাহিকতায় ইশরাত হাসান ২০০৬ সালের শ্রম আইনের শিশু কক্ষ স্থাপন সংক্রান্ত ৯৪ (৭) ধারার বাস্তবায়ন চেয়ে সর্ম্পূরক আবেদনটি করেন। আদালতে আবেদনের পক্ষে তিনি নিজে শুনানিও করেন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন ডেপুটি অ্যার্টনি জেনারেল অমিত তালুকদার।

আইনজীবী ইশরাত হাসান বেনারকে বলেন, “২০০৬ সালে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার করার জন্য আইন করা হলেও এখনো তার বাস্তবায়ন হয়নি। খোদ শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রীও বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। গত বছর এ সংক্রান্ত এক রুল জারির পর সম্প্রতি রেলওয়ে স্টেশন, বাস স্টেশন, বিমানবন্দরে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপনের কাজ করছে সরকার।”

“কিন্তু গার্মেন্টসসহ দেশের কলকারখানাগুলোতে এ ব্যপারে তেমন কোনো অগ্রগতি চোখে পড়ে না। অথচ গার্মেন্টস সেক্টরে যেসব নারীরা কাজ করেন, তাঁদের অধিকাংশের বয়স ১৭ থেকে ৩১ বছর। এদের বেশির ভাগেরই শিশু সন্তান রয়েছে,” বলেন তিনি।

ইশরাত হাসান বলেন, “এ কারণে আমরা একটি সম্পূরক আবেদন করে এ বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা চেয়েছিলাম। এর প্রেক্ষিতে গার্মেন্টসসহ দেশের সকল কলকারখানায় ৬০ দিনের মধ্যে ব্রেস্ট ফিডিং ও বেবি কেয়ার কর্নার স্থাপন করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।”

এ আদেশ পালন করে ৬০ দিনের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দিতে শ্রম সচিব ও শ্রম অধিদপ্তরের চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন এই আইনজীবী।

সন্তোষ প্রকাশ শ্রমিকদের

আদালতের এই নির্দেশে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন পোশাকখাতের শ্রমিকরা। তবে স্বল্প সময়ের মধ্যে এই নির্দেশ পালনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কতটুকু সমর্থ হবে তা নিয়ে সন্দেহান তাঁরা।

এ বিষয়ে গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাংগঠনিক সম্পাদক কে এম মিন্টু বেনারকে বলেন, “উচ্চ আদালতের এই রায় নিঃসন্দেহে প্রশংসার। কর্মজীবী মায়েদের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক রায়। কিন্তু দুই মাসের ভেতর বাস্তবায়ন করাটা কঠিন হবে বলে আমি মনে করি।”

তিনি বলেন, “আইন থাকলেও দেশের পোশাক খাতের এ গ্রেডের কারখানাগুলোতেও ডে কেয়ার সেন্টার নেই। আর থাকলেও নারী শ্রমিক ও তাঁদের সন্তানদের তুলনায় সেসব ডে কেয়ারের সক্ষমতা অনেক কম। ফলে অকে শ্রমিকই এই সুবিধা নিতে পারেন না।”

শ্রমকি নেতা নারী সহকর্মীদের দুর্দশার অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, “তাছাড়া ডে কেয়ার সেন্টারগুলোতে এক বছরের কম বয়সী বাচ্চা রাখে না। কিন্তু বাচ্চার মাকে সাধারণত দরকার হয় যখন তিনি মাতৃত্বকালীন ছুটি কাটিয়ে ফ্যাক্টরিতে যোগ দেবেন তখন।”

এ গ্রেড ছাড়া অন্যান্য গ্রেডের কারখানাগুলোতে নামমাত্র এসব সুবিধা রয়েছে উল্লেখ করে কে এম মিন্টু বলেন, বিদেশি ক্রেতারা আসলেই কেবল দেখানোর জন্য এই নামমাত্র ডে কেয়ার রয়েছে বহু কারখানায়।”

“যেসব কারখানাগুলোকে কমপ্লায়েন্স বলা হয় সেগুলোর ৩০ শতাংশেও এই ডে কেয়ার সুবিধা নেই। এখন আদালতের নির্দেশ কে কতটুকু মানবে দেখা যাক,” বলেন তিনি।

রাজধানীর উত্তরার আজিমপুর এলাকার একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন মুসলিমা পারভীন (২২)। তিনি বেনারকে বলেন, “আমাদের কারখানাতে কোনো ডে কেয়ার নেই। ফলে নিজের দেড় বছর বয়সী ছেলেকে মায়ের কাছে রেখে এসেছি।”

“বাচ্চার আট মাস বয়সে চাকরিতে যোগ দেই। তখন থেকেই আমার বাচ্চাটাকে আর বুকের দুধ খাওয়াতে পারিনি। অথচ দুই বছর পর্যন্ত বুকের দুধ খাওয়াতে বলেছিল ডাক্তার।”

বেনার প্রতিবেদকের কাছে আদালতের রায়ের কথা শুনে মুসলিমা বলেন, “যদি এটা প্রত্যেক কারখানায় হয় তাহলে সত্যি দারুণ ব্যাপার হবে। অন্তত কোনো বাচ্চা আর মায়ের বুকের দুধ থেকে বঞ্চিত হবে না।”

এর আগে জারি করা রুলে সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, কর্মস্থল, হাসপাতাল, শপিং মল, বিমানবন্দর, বাস ও রেলওয়ে স্টেশনের মতো জনসমাগমস্থলে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপনে পদক্ষেপ নিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না তা জানতে চায় উচ্চ আদালত।

পাশাপাশি ব্রেস্ট ফিডিং ও বেবি কেয়ার কর্নার স্থাপনে একটি প্রস্তাবনা তৈরি করতে মহিলা ও শিশু বিষয়ক সচিবকে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তাও জানতে চাওয়া হয় রুলে।

“শিশুদের রাখা এবং দুধ খাওয়ানোর সঠিক পরিবেশের অভাবে অনেক কর্মজীবী নারী চাকরি পর্যন্ত ছাড়তে বাধ্য হন। এসব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে রিট করা হয়। আশা করি আদালতের আদেশে পরিস্থিতি বদলাবে,” বলেন ইশরাত হাসান।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন