Follow us

পরিবেশগত পরিবর্তনে বাংলাদেশে বাড়ছে বজ্রপাত

পুলক ঘটক
ঢাকা
2018-05-02
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
বৃষ্টির মধ্যে খেয়া নৌকায় ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদী পার হচ্ছেন যাত্রীরা। খোলা জায়গায় বজ্রপাতের আশঙ্কা বেশি বলে ঝড়-বৃষ্টির সময় খোলাস্থানে অনেকে মিলে একত্রে অবস্থান না করার পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর। ২৭ জুন ২০১৫।
বৃষ্টির মধ্যে খেয়া নৌকায় ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদী পার হচ্ছেন যাত্রীরা। খোলা জায়গায় বজ্রপাতের আশঙ্কা বেশি বলে ঝড়-বৃষ্টির সময় খোলাস্থানে অনেকে মিলে একত্রে অবস্থান না করার পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর। ২৭ জুন ২০১৫।
বেনারনিউজ

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বছরের এ সময়টিতে ঝড়-বৃষ্টির সঙ্গে বজ্রপাতও হচ্ছে ব্যাপকভাবে।

জলবায়ু পরিবর্তন, বনের পরিমাণ এবং উঁচু গাছের সংখ্যা কমে যাওয়াকে বজ্রপাত বৃদ্ধির কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

চলতি এক সপ্তাহে বজ্রপাতের কারণে সারা দেশে অন্তত ৫৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ২৩ জন। রোববার ১৬ জন, সোমবার ১৮, মঙ্গলবার ১১ এবং বুধবার ১৩ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে।

সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, চলতি মাসে এ নিয়ে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা অন্তত ৮০ জন।

তবে সরকারিভাবে গত সোমবার পর্যন্ত দুই মাসে ৭০ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রী মোফাজ্জ্বল হোসেন চৌধুরী মায়া।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রিয়াজ আহমেদ বেনারকে বলেন, “যাঁরা মারা গেছেন তাদের অধিকাংশই বজ্রপাতের সময় মাঠে-ময়দানে কাজ করছিলেন অথবা রাস্তায় চলাচলরত অবস্থায় ছিলেন।”

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. এম এ ফারুক এ বিষয়ে তার গবেষণার কথা উল্লেখ করে বেনারকে বলেন, “এ বছরের বজ্রপাতের সংখ্যা, বজ্রপাতের ফ্রিকোয়েন্সি, ইনটেনসিটি সবকিছুই বাড়বে।

জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত অন্যান্য বছরের তুলনায় তাপমাত্রা বেশি হবে। এই তাপমাত্রার সঙ্গে বজ্রপাত বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে।”

গবেষণা প্রতিবেদনে ফারুক বলেছেন, ২০১০ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বজ্রপাতের ঘটনায় ১ হাজার ৮০০-এর বেশি মানুষ মারা গেছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজের পরিচালক অধ্যাপক মাহবুবা নাসরিন বেনারকে বলেন, “এক সময় দেশে প্রচুর তাল, খেজুর, নারিকেল ও সুপারি গাছ ছিল। সে সময় বজ্রপাত হতো এসব গাছের ওপর। লম্বা গাছ বিজলি দণ্ডের মতো কাজ করে। এখন বড় গাছপালা কমে গেছে। ফলে বজ্রপাত সরাসরি সমভূমিতে মানুষ ও প্রাণীর ওপর আঘাত হানছে।”

ফাঁকা জায়গায় মৃত্যু বেশি

সোমবার নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ ও সোনারগাঁ উপজেলায় পৃথক দুটি বজ্রপাতে হাসেম মোল্লা, রফিকুল ইসলাম, ফরহাদ শেখ এবং ওবায়দুল হক নামে চার ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে চারজনই বজ্রপাতের সময় গ্রামের কৃষিজমিতে কাজ করছিলেন। নারায়ণগঞ্জ বন্দরের কলাগাছিয়ার নূরজাহান বেগম (৬৮) বাড়ির আঙিনায় বসা অবস্থায় বজ্রপাতে ঘটনাস্থলেই মারা যান।

সোনারগাঁ জামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হামিদ শিকদার শিপলু বেনারকে বলেন, “বেলা ১১টার দিকে মুসারচর গ্রামে জমিতে কাজ করছিলেন রফিকুল ও ওবায়দুল। এ সময় বজ্রপাত হলে তাঁরা ঘটনাস্থলেই মারা যান।”

পাবনা জেলার পাকশী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ শহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, সোমবার সকালে পদ্মানদীতে মাছ ধরার সময় এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে।

সুনামগঞ্জ উপজেলার জামখলার হাওরে ইয়াহিয়া আহমদ (২৪) এবং হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার দক্ষিণ তেলকুমার হাওরে শামসুল হক (৩০) নামের দুই ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

এ ছাড়া জামালপুরে দুজন, রাজবাড়ীতে একজন, ফেনীতে একজন, রাজশাহীতে তিনজন, মৌলভীবাজারে একজন এবং চুয়াডাঙ্গায় একজন মারা গেছেন।

মৃত্যুর পরিসংখ্যান

বজ্রপাতে মৃত্যুর সম্পূর্ণ পরিসংখ্যান সরকারের হাতে নেই। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তালিকা বলছে, ২০১০ সাল থেকে বজ্রপাতে দেড় হাজারের মতো মানুষ নিহত হয়েছেন।

দুর্যোগ ও ত্রাণ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১১ সালে ১৭৯ জন, ২০১৫ সালে ২৭৪ এবং ২০১৬ সালে ১০৩ জন মারা যান। বাংলাদেশ দুর্যোগ ফোরামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সালে বজ্রাঘাতে ২৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, দেশে প্রতিবছর গড়ে দু শ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে বজ্রপাতে। এ হার বিশ্বের দ্বিতীয়।

বজ্রপাতে মৃত্যুর শিকার মানুষের বেশির ভাগই হাওর অঞ্চলের ৯ জেলার। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ছিল সুনামগঞ্জে। বজ্রপাতের ভয়াবহতা বিবেচনায় নিয়ে গত বছর এটিকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে গণ্য করেছে সরকার।

বজ্রপাত নিয়ে প্রথম গবেষণা

বজ্রপাত নিয়ে এ যাবৎ সরকারিভাবে কোনো গবেষণা না হলেও বেসরকারিভাবে বিষয়টি নিয়ে প্রথম গবেষণা করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. এম এ ফারুকের নেতৃত্বে একটি দল।

গবেষণায় বজ্রপাতের কারণ অনুসন্ধান, ঘনত্ব এবং প্রাণহানি এবং প্রতিকারের বিষয়গুলো নির্ধারণের চেষ্টা করা হয়েছে।

সংবাদপত্রে প্রকাশিত বজ্রপাতে মৃত্যুর খবর পর্যালোচনা করে গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৮ বছরে অন্তত ১ হাজার ৮০০ জনের প্রাণহানি হয়েছে।

প্রাণহানির প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হবে বলে মনে করেন গবেষণা পরিচালক অধ্যাপক ফারুক। কারণ বজ্রপাতে মৃত্যুর সকল খবর সংবাদপত্রে প্রকাশ হয় না।

অধ্যাপক ফারুক বেনারকে বলেন, “জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম ব্যবহার করে দেখা গেছে, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় হাওর অঞ্চলে। তবে বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছে উত্তরাঞ্চলে। রংপুর বিভাগের মধ্যে ঠাকুরগাঁও এবং লালমনিরহাটে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয়।”

বজ্রপাত রোধে তালগাছে

বজ্রপাতে প্রাণহানি কমাতে সরকার গত বছর দেশজুড়ে তালগাছ রোপণের কর্মসূচি হাতে নিয়েছিল। উঁচু বলে বজ্রের আঘাত তালগাছের ওপর পড়ে। এতে জীবন রক্ষা হয় মানুষের। এই ধারণাকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে সারা দেশে ১০ লাখ তালগাছ রোপণের কর্মসূচি নেওয়া হয়।

তবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রিয়াজ আহমেদ বেনারকে বলেছেন, “এটা কোনো স্বতন্ত্র প্রকল্প নয়। কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) ও ‘কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) কর্মসূচির নীতিমালা পরিবর্তন করে তার সঙ্গে তাল গাছ রোপণের বাধ্যবাধকতা জুড়ে দেওয়া হয়েছিল।”

তিনি বলেন, গত বছর অনেক গাছ রোপণ করা হয়েছে। তালগাছ বড় হতে অনেক সময় লাগে। এর তাৎক্ষণিক ফলাফল আশা করা যায় না।”

গাছ লাগানো হলে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক জায়গায় গাছগুলো মরে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। রংপুর সদরের রাজেন্দ্রপুর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য নিরঞ্জন বর্মণ বলেছেন, “উদ্যোগটা ভালো ছিল। আমাদের এলাকায় অনেক গাছ লাগানো হয়েছিল। কিন্তু দেখাশোনা করার কেউ নেই।”

ফায়ার সার্ভিসের নির্দেশনা

বজ্রপাত থেকে বাঁচতে বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর ২০টি জরুরি নির্দেশনা দিয়েছে।

নির্দেশনাগুলোর মধ্যে রয়েছে-বজ্রপাতের ও ঝড়ের সময় বাড়ির ধাতব কল, সিঁড়ির ধাতব রেলিং, পাইপ ইত্যাদি স্পর্শ না করা, প্রতিটি ভবনে বজ্র নিরোধক দণ্ড স্থাপন, ঝড়-বৃষ্টির সময় খোলাস্থানে অনেকে মিলে একত্রে অবস্থান না করা, সবাই এক কক্ষে না থেকে আলাদা আলাদা কক্ষে চলে যাওয়া, খোলা জায়গায় কোনো বড় গাছের নিচে আশ্রয় না নেওয়া, বৈদ্যুতিক তারের নিচ থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকা এবং যন্ত্রপাতির বৈদ্যুতিক লাইন বিচ্ছিন্ন রাখা।

প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, এপ্রিল-জুন মাসে বজ্রপাত বেশি হয়। এই সময়ে আকাশে মেঘ দেখা গেলে ঘরে অবস্থান করা এবং যত দ্রুত সম্ভব দালান বা কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নেওয়া উচিত।

জরুরি প্রয়োজনে প্লাস্টিক বা কাঠের হাতলযুক্ত ছাতা ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে সংস্থাটি বলেছে, “ঘন-কালো মেঘ দেখা গেলে অতি জরুরি প্রয়োজনে রাবারের জুতা পরে বাইরে বের হতে পারেন। উঁচু গাছপালা, বৈদ্যুতিক খুঁটি, তার, ধাতব খুঁটি ও মোবাইল টাওয়ার ইত্যাদি থেকে দূরে থাকুন। খোলা জায়গা, মাঠ বা উঁচু স্থানে থাকবেন না।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন