করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় আবারো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ

কামরান রেজা চৌধুরী
2022.01.21
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় আবারো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ দেশে করোনা সংক্রমণ বাড়তে থাকলেও পুরান ঢাকার ফুটপাতের একটি সড়কে ভিড় করে কেনাকাটা করছেন লোকজন, স্বাস্থ্যবিধি না মেনেই রাস্তায় চলছেন অনেকে। ২১ জানুয়ারি ২০২২।
[বেনারনিউজ]

সাম্প্রতিককালে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়ায় শনিবার থেকে দুই সপ্তাহের জন্য সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে সরকার।

শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনের এই ঘোষণা দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। করোনার অমিক্রন ধরনের কারণেই এই সংক্রমণ বৃদ্ধি বলে মনে করা হচ্ছে।

“এত দ্রুত সংক্রমণ বৃদ্ধির কারণ হয়তো অমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট হতে পারে,” সংবাদ সম্মেলনে বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

তিনি জানান, দুই সপ্তাহ পর সংক্রমণ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

২০২০ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত হওয়ার পর এবার দ্বিতীয় দফায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হলো। মহামারির কারণে এর আগে একটানা ১৭ মাস সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখে সরকার।

গত বছর ১১ ডিসেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকা সফর থেকে দেশে ফেরা বাংলাদেশি নারী ক্রিকেটারের শরীরে করোনাভাইরাসের অমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট ধরা পড়ে ।

দুদিন আগেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জানান, বাংলাদেশে মূলত ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের কারণে শতকরা ৮০ ভাগ সংক্রমণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বাকি ২০ ভাগ অমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট।

তবে শুক্রবারই প্রথমবারের মতো অমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের কারণে শনাক্ত বৃদ্ধির কথা জানান হলো।

পরীক্ষা করা নমুনার বিপরীতে জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহের শেষে যেখানে শনাক্তের হার ছিল শতকরা পাঁচ ভাগ, শুক্রবার সেই হার পৌঁছেছে প্রায় ২৯ ভাগে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে সংক্রমণের হার শতকরা ৩৩ ভাগ। চট্টগ্রামকে রেড জোনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

গ্রিন হেরাল্ড বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক মো. মিজানুর রহমান বেনারকে বলেন, “আমি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্তে খুবই হতাশ। কারণ একটানা প্রায় দেড় বছর স্কুল বন্ধ থাকার কারণে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আবার আমাদের ছেলেমেয়েরা ক্ষতির মুখে পড়বে।”

তিনি বলেন, “সরকারের উচিত লেখাপড়া যেন শুধু অনলাইন ভিত্তিক না হয়। কারণ অনলাইনে ক্লাস না করে অনেক শিক্ষার্থী অন্যান্য ওয়েবসাইটে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের ছবি, নাচ-গান, দেখে, গেম খেলে।”

মিজানুর বলেন, “অনেক শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসের সাথে টিকতে না পেরে ঝরে পড়ছে। আমি চাই, প্রজন্ম রক্ষার জন্য যত দ্রুত সম্ভব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া। কারণ করোনাভাইরাস নিয়েই আমাদের বাঁচতে হবে। এটি হয়তো আর কোনোদিন যাবে না।”

তবে সেন্ট জোসেফ স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্র আবরার জারিফের মতে, “সরকারের এই সিদ্ধান্ত সঠিক।”

কারণ হিসেবে জারিফ বেনারকে বলেন, “করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য স্বাস্থ্যবিধি মানা দরকার। স্কুল কর্তৃপক্ষও চেষ্টা করছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে স্কুলে গেলে আমরা স্বাস্থ্যবিধি মানতে পারছি না। আমি নিজেই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছি।”

“তবে স্কুল কর্তৃপক্ষের উচিত অনলাইন ক্লাসগুলোকে ভালোভাবে ব্যবস্থা করা যাতে লেখাপড়া সঠিকভাবে হয়,” মনে করেন এই শিক্ষার্থী।

শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণাকে সমর্থন করলেও এই বন্ধ যেন বেশিদিন না হয় বলে মত দেন অভিভাবক ওয়ারেছ হোসেন।

তিনি বেনারকে বলেন, “এই দুই তিন সপ্তাহের মধ্যে সরকারের উচিত সকল শিক্ষার্থীকে টিকার আওতায় এনে যত দ্রুত সম্ভব সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া।”

অমিক্রনই কারণ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বেনারকে বলেন, “সাম্প্রতিক সপ্তাহে করোনাভাইরাস সংক্রমণের উচ্চ হারের কারণ দেখে মনে হচ্ছে অমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের জন্যই এটি হচ্ছে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর “সরকারের নিয়ন্ত্রণ আছে” বলে সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, “কিন্তু আমাদের বেসরকারি গণপরিবহনের ওপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। গণপরিবহন পূর্ণ মাত্রায় চলছে, আজকে সরকার যে আদেশ দিয়েছে সেগুলো পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা মানবে না।”

উদাহরণ হিসাবে তিনি বলেন, “সরকার গণপরিবহনে অর্ধেক যাত্রী পরিবহন করবে। কিন্তু তারা সেটি না মেনে উপরন্তু গাড়ি চলাচল বন্ধের হুমকি দিলো এবং সরকার এই আদেশ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হলো। সুতরাং, অন্যান্য অনেক খাতের চেয়ে বেশি করে সংক্রমণ ছড়াবে গণপরিবহন।”

করোনা সংক্রমণ মোকাবেলায় সরকার নতুন করে যে নির্দেশনা জারি করেছে তা “বাস্তবায়ন করতে পারলে ভালো,” মনে করলেও সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এর সাবেক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোশতাক হোসেন শুক্রবার বেনারকে বলেন, “কিন্তু এটি মনে করার কারণ নেই যে আদেশ দিলেই জনগণ সেটি মানতে শুরু করবে।”

তিনি বলেন, “সরকারের এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য সরকারি সংস্থা এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে কমিউনিটি স্তরে বিভিন্ন কমিটি করে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে। এই কমিটি বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের সাথে সভা করে এই মহামারি প্রতিরোধে জনগণকে এই আদেশ মানতে উজ্জীবিত করবে।”

“কিন্তু দুঃখের বিষয় সরকারি সকল পর্যায় এবং স্থানীয় সরকারের পক্ষ থেকে কমিউনিটি পর্যায়ে কমিটি করা হয়নি। সুতরাং, সরকার থেকে যত ভালো আদেশই দেয়া হোক না কেন, সেগুলোর পুরোপুরি বাস্তবায়িত হবে না বলে আমার আশঙ্কা,” বলেন ড. মোশতাক।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শুক্রবারের বুলেটিন অনুসারে সারাদেশে বৃহস্পতিবার সকাল আটটা থেকে শুক্রবার সকাল আটটার মধ্যে ১১ হাজার ৪৩৪ জন নতুন করে করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন এবং ১২ জন মৃত্যুবরণ করেছেন।

এই নিয়ে ২০২০ সালের ৮ মার্চ থেকে আজ পর্যন্ত মোট ১৬ লাখ ৬৪ হাজার ৬১৬ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এবং ১৮ মার্চ থেকে শুক্রবার পর্যন্ত ২৮ হাজার ১৯২ জনের প্রাণহানি ঘটেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, শুক্রবার পর্যন্ত সারাদেশে মোট নয় কোটি ২৪ লাখের বেশি মানুষ প্রথম ডোজ টিকা নিয়েছেন। দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন, পাঁচ কোটি ৮০ লাখ মানুষ। তৃতীয় ডোজ নিয়েছেন সাড়ে নয় লাখের বেশি মানুষ।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন