Follow us

করোনাভাইরাসের প্রভাব পড়তে পারে পদ্মা সেতুসহ বড় প্রকল্পগুলোতে

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2020-02-12
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
শরীয়তপুর জাজিরা এলাকা থেকে তোলা নির্মাণাধীন পদ্মাসেতু। ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২০।
শরীয়তপুর জাজিরা এলাকা থেকে তোলা নির্মাণাধীন পদ্মাসেতু। ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২০।
[বেনারনিউজ]

চীনের করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে চীনা সহায়তায় নির্মাণাধীন বাংলাদেশের পদ্মাসেতুসহ দেশের অন্যতম বৃহৎ প্রকল্পগুলোতে।

এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দীর্ঘমেয়াদী হলে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন সরকারের নীতি নির্ধারকেরা। এমনকি নির্ধারিত সময়ে পদ্মাসেতুর নির্মাণ কাজ শেষ নাও হতে পারে—এমন আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম বেনারকে বলেন, “এখন পর্যন্ত আমরা স্বাভাবিক আছি। তবে চীনে করোনাভাইরাস পরিস্থিতির যদি উন্নতি না হয় তাহলে ভবিষ্যতে সমস্যা হবে। পদ্মা সেতুর উপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।”

এই প্রকল্পে প্রায় এক হাজার চীনের নাগরিক কাজ করছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, “তাঁদের মধ্যে প্রায় তিনশজন ছুটিতে গেছেন। কিন্তু চীন সরকার আপাতত তাঁদের দেশ ছাড়তে নিষেধ করেছে। পাশাপাশি নতুন করে বাংলাদেশ থেকে ছুটিও দেওয়া হচ্ছে না কাউকে।”

পদ্মাসেতু সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে আপাতত চীন থেকে নির্মাণ সামগ্রী আনা বন্ধ রাখা হয়েছে। বর্তমানে সেতুর কাজ চললেও এই অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে দু-এক মাসের মধ্যে মালামালের সংকট দেখা দিতে পারে।

“আপাতত নির্মাণ সামগ্রীসহ মালামালের ঘাটতি নেই। কিন্তু ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে না এলে কয়েকমাসের মধ্যে ঘাটতি হওয়াটা স্বাভাবিক,” বলেন শফিকুল ইসলাম।

এদিকে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, বাংলাদেশে অন্তত আট হাজার চীনা কর্মী কাজ করছেন। যাদের দুই-তৃতীয়াংশ গত জানুয়ারিতে নববর্ষের ছুটি কাটাতে দেশে গেছেন। করোনাভাইরাসের কারণে আপাতত তাঁদের বাংলাদেশ ফিরতে নিষেধ করা হয়েছে।

এর ফলে বাংলাদেশে চীনসম্পৃক্ত বৃহৎ প্রকল্পগুলোর কাজ মাস দুয়েক পিছিয়ে যেতে পারে। তবে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন চীনা রাষ্ট্রদূত।

এর আগে গত বুধবার সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, “করোনাভাইরাস আগামী দুই মাসের মধ্যে স্থিতিশীল না হলে পদ্মা সেতুর কাজে প্রভাব পড়তে পারে।”

চলমান পরিস্থিতি সম্পর্কে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বেনারকে বলেন, “করোনাভাইরাসের স্বল্পকালীন নেতিবাচক অভিঘাত আমরা ইতিমধ্যে প্রত্যক্ষ করছি।”

তিনি বলেন, “পদ্মাসেতু, রেল, পোর্টসহ বিভিন্ন প্রকল্পে যেসব চীনা শ্রমিক কাজ করেন তাঁদের অনেকে দেশে গিয়েছিলেন। পরিস্থিতির কারণে কারও কারও ফিরতে বিলম্ব হচ্ছে। যারা এসেছেন তাঁদের ১৪ দিনের জন্য বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে।”

“তা ছাড়া বাংলাদেশের শ্রমিকেরাও তাঁদের সাথে কাজ করার ক্ষেত্রে কিছুটা দুশ্চিন্তার মধ্যে আছেন। সব মিলিয়ে পদ্মাসেতুসহ এসব প্রকল্পের কাজে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে,” বলেন মোস্তাফিজুর রহমান।

তবে বাংলাদেশে কোনো চীনা নাগরিক এবং চীনে কোনো বাংলাদেশি নাগরিক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হননি বলে গত বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের জানান ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং।

এখন পর্যন্ত সিঙ্গাপুরে দুজন বাংলাদেশি শ্রমিকের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সংবাদ নিশ্চিত করেছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এর বাইরে কোথাও কোনো বাংলাদেশির করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সংবাদ জানা যায়নি।

চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহর থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসে এখন পর্যন্ত দেশটিতে মারা গেছেন ১ হাজার ১০৭ জন। আক্রান্ত হয়েছেন ৪৪ হাজার ১৩৮ জন। চীনের বাইরে সিঙ্গাপুরসহ আরও ২৭টি দেশ ও অঞ্চলে এ প্রাণঘাতি ভাইরাস ছড়িয়েছে।

বিকল্প বাজার খুঁজছে সরকার

পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, “এই সেতুর অবকাঠামোতে চীনের মালামাল বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে আপাতত মালামাল আসা বন্ধ রয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বিকল্প উৎস থেকে মালামাল আনতে হবে। বিষয়টি আমাদের মাথায় রয়েছে।”

তবে অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলছিলেন, “স্বল্প সময়ে এসব মালামাল অন্য দেশ থেকে আনা সহজ হবে না। সেটার জন্যও কিছুটা সময় লাগবে।”

তাঁর মতে, “দ্রুত এবং প্রতিযোগিতায় সক্ষম মূল্যে পণ্য আনতে পারি বলেই আমরা চীন থেকে আমদানি করি। অন্য বাজার থেকে আনতে গেলে এ দুটোর ক্ষেত্রেই ব্যত্যয় হতে পারে। সেজন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে।”

পদ্মাসেতুতে বসলো ২৪তম স্প্যান

করোনাভাইরাসের আতঙ্কের মধ্যেই মঙ্গলবার বসেছে পদ্মাসেতুর ২৪তম স্প্যান। এর ফলে সেতুর প্রায় পৌনে চার কিলোমিটার এখন দৃশ্যমান হলো। বাকি স্প্যানগেুলো আগামী জুলাইয়ের মধ্যে বসানো শেষ হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।

পদ্মা সেতু কর্তৃপক্ষ জানায়, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের বিষয়ে বিশেষ সতর্কতার কারণে গত ১৪ জানুয়ারির পরে চীন থেকে ফেরা প্রকৌশলী ও কর্মকর্তারা কাজে যোগ দেননি। এই সংখ্যা ২০-২৫ জনের মতো। তবে ছুটিতে যাননি এমন চীনা প্রকৌশলীদের তদারকিতে কাজ এগিয়ে নিচ্ছেন বাংলাদেশি শ্রমিকরা।

গত বুধবার সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, “পদ্মা সেতুতে ৯৮০ জন চীনের নাগরিক কর্মরত রয়েছেন। তার মধ্যে ছুটিতে চীনে গেছেন ৩৩২ জন, এদের মধ্যে চীন থেকে ফিরেছেন ৩৩ জন। এই ৩৩ জনের ৮ জন কোয়ারেন্টাইন মুক্ত এবং অন্যরা কোয়ারেন্টাইনে আছেন।”

এদিন পদ্মাসেতুর অগ্রগতি প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, “পদ্মা সেতুর কাজ ওভারঅল ৭৭ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে। তার মধ্যে প্রধান কাজ হয়েছে ৮৬ শতাংশ।”

২০১৪ সালের ডিসেম্বরে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু করা হয়। চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কম্পানি (এমবিইসি) মূল সেতু নির্মাণের কাজ করছে। এছাড়া নদী শাসনের কাজ করছে চীনের আরেক প্রতিষ্ঠান সিনো হাইড্রো করপোরেশন। ছয় দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ বহুমুখী সেতুর কাঠামো কংক্রিট ও স্টিল দিয়ে নির্মিত হচ্ছে।

প্রকল্পের তথ্যানুযায়ী, কয়েকদফা পদ্মা সেতু নির্মাণকাজের সময় ও খরচ বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, পদ্মা সেতু নির্মাণের মোট খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা।

গত নভেম্বর মাসে এই প্রকল্পের মেয়াদ দেড় বছর বাড়িয়ে ২০১১ সালের জুন মাস পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।

অন্যান্য প্রকল্পেও প্রভাব

সরকারি সূত্র জানায়, পদ্মাসেতু ছাড়াও দেশের অন্যান্য বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্পে চীনের নাগরিকেরা কাজ করছেন। এর মধ্যে রয়েছে পায়রা তাপবিদ্যুৎ​ কেন্দ্র, মেট্রোরেল, ঢাকা মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে, বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রভৃতি।

সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানান, মেট্রোরেলে ৫৮ জন চীনা নাগরিক কাজ করেন। এদের মধ্যে ছুটিতে চীনে গেছেন ৩১ জন। তাঁদের একজন ফেরত আসলেও তিনি বর্তমানে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছেন।

তবে মেট্রোরেলে করোনাভাইরাসের প্রভাব পড়বে না আশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ২০২১ সালে এই প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।

ওবায়দুল কাদের বলেন, ইতিমধ্যে মেট্টোরেলের কাজে ৪২ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে।

বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট প্রকল্পে ৭২ জন চীনা নাগরিক কাজ করেন জানিয়ে কাদের জানান, তাদের মধ্যে মাত্র ১ জন ছুটিতে রয়েছেন। এই প্রকল্পটিও ২০২১ সালে শেষ হবে।

সেতুমন্ত্রী জানান, এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে প্রকল্পে ২০জন চীনা নাগরিক কাজ করেন, যাদের মধ্যে ১৮ জন ছুটিতে রয়েছেন। এই প্রকল্পের প্রথম পর্বের কাজ ৫৫ শতাংশ হয়েছে বলেও জানান তিনি।

এ ছাড়া পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় ১৩২০ মেগাওয়াট বাংলাদেশ চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড, যা পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নামে পরিচিত, সেখানে মোট ছয় হাজার শ্রমিক কাজ করেন। এর মধ্যে দুই হাজার ৭০০ জন চীনা শ্রমিক ও প্রকৌশলী রয়েছেন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পটুয়াখালীর পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে চীন থেকে ছুটি কাটিয়ে সম্প্রতি দেশে ফেরা ২০ জন চীনা নাগরিককে ১৪ দিনের জন্য বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রাখা হয়েছে।

ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বড় প্রকল্পে বিলম্বসহ বাংলাদেশ কতটা ক্ষতির সম্মুখীন হবে, সেটা নির্ভর করবে করোনাভাইরাসের স্থায়ীত্ব ও ব্যপ্তির উপর। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এটা প্রশমনের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, বরং ব্যপ্তি ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে।”

ফলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির জন্য প্রস্তুত থাকার ইঙ্গিত দেন তিনি।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন