চীনা কোম্পানি আনহুই জিফেই–এর করোনাভাইরাস টিকা নিতে আগ্রহী নয় বাংলাদেশ

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2021-03-11
Share
চীনা কোম্পানি আনহুই জিফেই–এর করোনাভাইরাস টিকা নিতে আগ্রহী নয় বাংলাদেশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক রোগীকে করোনাভাইরাসের টিকা দিচ্ছেন একজন স্বাস্থ্যকর্মী। ১১ মার্চ ২০২১।
[ফোকাস বাংলা]

সিনোভ্যাকের পর বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের টিকার তৃতীয় ধাপের পরীক্ষায় আগ্রহী চীনা কোম্পানি আনহুই জিফেই-এর টিকা ব্যবহারে সরকার আগ্রহী নয় বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। 

বৃহস্পতিবার তিনি বেনারকে জানান, সরকার বর্তমানে শুধু ভারতের সেরাম ইন্সটিটিউটের মাধ্যমে আমদানিকৃত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা ব্যবহার করতে চায়।

এ বছর শুরু দিকে তাদের উদ্ভাবিত করোনাভাইরাস টিকা বাংলাদেশে ট্রায়ালের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করে আনহুই জিফেই। সেই আবেদন এখন পর্যন্ত অনুমোদন পায়নি। 

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বৃহস্পতিবার বেনারকে বলেন, “বাংলাদেশে তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিলের কাছে এথিক্যাল অনুমোদনের জন্য আবেদন করে আনহুই জিফেই। আমরা তাদের আবেদন পর্যালোচনা করছি।”

তিনি বলেন, “তবে আমরা আপাতত চীনের আনহুই জিফেই-এর টিকার ব্যাপারে আগ্রহী নই। আমরা ইতোমধ্যে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা নেয়া শুরু করেছি। এই পর্যায়ে নতুন আরেকটি টিকা দেয়া সঠিক সিদ্ধান্ত হবে না।”

মন্ত্রী বলেন, “একই মানুষকে একবার অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্র্যাজেনেকা আরেকবার চীনা অথবা অন্যকোনো টিকা প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। তাছাড়া, আনহুই জিফেই’র টিকাটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত নয়। সুতরাং, আমরা আপাতত এটি ট্রায়ালের জন্য অনুমোদন দিতে পারছি না।”

তিনি বলেন, “কোভ্যাক্স এর মাধ্যমে বাংলাদেশে যে টিকা আসবে সেগুলোও আমরা অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্র্যাজেনেকার টিকা চেয়েছি।” 

মন্ত্রী বলেন, “অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ সহজ। আর এই টিকাটির ট্রায়াল ভারতে হয়েছে। আমাদের আবহাওয়ার সঙ্গে এই টিকা সহজে মানায়। এ ছাড়া অন্যান্য টিকার তুলনায় এই টিকার দাম অনেক কম।”

বাংলাদেশে ট্রায়ালের ব্যাপারে জানতে বেনারের পক্ষ থেকে আনহুই জিফেই এর কাছে ই-মেইল মারফত মন্তব্য চাইলেও তারা কোনো জবাব দেয়নি। 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বেনারকে বলেন, করোনাভাইরাসের টিকার জন্য শুধু একটি কোম্পানির ওপর নির্ভর করাটা সঠিক সিদ্ধান্ত হবে না। এতে বাংলাদেশ ওই কোম্পানির একচেটিয়া বাজারে পরিণত হতে পারে।

তিনি বলেন, ব্যবসায়িক দিক ছাড়াও অন্যান্য টিকা কেমন কাজ করে সেটি দেখার সুযোগ পাবেন না বাংলাদেশি গবেষক ও চিকিৎসকরা। 

অধ্যাপক নজরুল বলেন, “আমি ফাইজারের কথা বলি না, কারণ এই টিকা সংরক্ষণ করা আমাদের দেশে খুব কঠিন। তবে, আমেরিকা অথবা রাশিয়ার টিকাগুলোর আমাদের এখানে ট্রায়াল করা যেত। এর ফলে আমরা সবচেয়ে ভালো টিকা পেতাম।” 

গত বছর মার্চে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস টিকার তৃতীয় ধাপের ট্রায়ালের জন্য আবেদন করে চীনা কোম্পানি সিনোভ্যাক বায়োটেক। নীতিগত অনুমোদনের জন্য বিষয়টি যায় বাংলাদেশ মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিলের কাছে। কাউন্সিল তাদের অনুমোদনও দেয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ট্রায়ালের পূর্ণ অনুমোদন দেয় গত বছর আগস্ট মাসে।

তবে এই অনুমোদন দিতে দেরি হওয়ার কারণ দেখিয়ে ট্রায়াল পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ সরকারের কাছে প্রায় ৩০ কোটি টাকা দাবি করে সিনোভ্যাক। সরকার এই দাবি নাকচ করে দিলে নভেম্বরে বাংলাদেশ থেকে চলে যায় সিনোভ্যাক।

এরপরই সেরাম ইন্সটিটিউট অব ইন্ডিয়ার মাধ্যমে যুক্তরাজ্য-সুইডেনের যৌথ উদ্যোগে উদ্ভাবিত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা আমদানি করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে বাংলাদেশে এই টিকাদান শুরু হয়েছে।

পরের মাসেই আরেক চীনা কোম্পানি আনহুই জিফেই বাংলাদেশে তৃতীয় ধাপের ট্রায়ালের জন্য বাংলাদেশ মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিলের কাছে আবেদন করে।

একইসাথে তারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ট্রায়ালের জন্য আবেদন করে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় অথবা বাংলাদেশ মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিলের কেউই তাদের আবেদন অনুমোদন করেনি। 

আনহুই জিফেই–এর আবেদনের পর ভারতীয় কোম্পানি ভারত বায়োটেক বাংলাদেশে তাদের উদ্ভাবিত টিকার তৃতীয় ধাপের ট্রায়ালের জন্য আবেদন করে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বেনারকে বলেন, “ভারত বায়োটেকের ভ্যাকসিনেরও তৃতীয় ধাপের ট্রায়ালের জন্য নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়নি। 

নতুন বৈশিষ্ট্যের করোনা শনাক্ত

দেশে প্রথমবারের মতো নতুন বৈশিষ্ট্যের করোনাভাইরাস ধরা পড়েছে ছয় জনের শরীরে। বর্তমানে প্রতিদিনই দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ বাড়ছে।

বৃহস্পতিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় এক হাজার ৫১ জন নতুন করে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। আর প্রাণ হারিয়েছেন সাত জন। 

এই নিয়ে সারাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা পাঁচ লাখ ৫৪ হাজার ১৫৬ জন। তাঁদের মধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন আট হাজার ৫০২ জন। 

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ.এস.এম. আলমগীর বেনারকে জানান, জানুয়ারি মাসে এই নতুন বৈশিষ্ট্যের করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। 

তিনি বলেন, “তবে, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমরা যে টিকা দিচ্ছি এই টিকাই নতুন বৈশিষ্ট্যের করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সক্ষম।”

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, এ পর্যন্ত ৪১ লাখ মানুষ করোনাভাইরাসের টিকা নিয়েছেন।

খুব কম সংখ্যক মানুষের মধ্যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও করোনাভাইরাসের টিকা নেয়ার পরও আক্রান্ত হয়ে বৃহস্পতিবার প্রাণ হারিয়েছেন সিলেট দক্ষিণ সুরমার সংসদ সদস্য মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন বলে সংসদ সচিবালয় বেনারকে নিশ্চিত করেছে।

গত ১০ ফেব্রুয়ারি কোভিড-১৯–এর টিকা নিয়েছিলেন মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী। শারীরিক অবস্থার অবনতি হবার পর ৭ মার্চ থেকে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন বলে সাংবাদিকদের জানান প্রয়াত এই সংসদ-সদস্যের ব্যক্তিগত সচিব জুলহাস আহমদ।

জুলহাস বলেন, ৭ মার্চ রাতে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তির পরদিন সকালে তাঁর করোনার নমুনা সংগ্রহ করা হয়। বিকেলে রেজাল্ট আসে পজিটিভ।

ক্রমশ তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার দুপুরে তাঁর মৃত্যু হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এই সাংসদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।     

যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে, এ পর্যন্ত সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ১১ কোটি ৮৩ লাখ ১৮ হাজারের বেশি মানুষ, মারা গেছেন ২৬ লাখ ২৪ হাজারের বেশি।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন