Follow us

ঢাকায় প্রথম করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2020-03-18
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঘটেছে কি না তা জানতে রক্ত পরীক্ষার জন্য ঢাকায় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (আইইডিসিআর) প্রবেশের চেষ্টা করছেন এক ব্যক্তি। ১৮ মার্চ ২০২০।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঘটেছে কি না তা জানতে রক্ত পরীক্ষার জন্য ঢাকায় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (আইইডিসিআর) প্রবেশের চেষ্টা করছেন এক ব্যক্তি। ১৮ মার্চ ২০২০।
[কামরান রেজা চৌধুরী/বেনারনিউজ]

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত প্রথম ব্যক্তির মৃত্যু নিশ্চিত করেছে সরকার। সত্তর বছরের বেশি বয়সের ওই ব্যক্তি নিজে বিদেশ সফরে যাননি, তবে সম্প্রতি বিদেশ ফেরত এক ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছিলেন তিনি।

বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা সাংবাদিকদের এই তথ্য জানিয়ে বলেছেন, বুধবার দেশে আরও নতুন চারজন কোভিড-১৯ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।

সব মিলিয়ে দেশে এখন করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৪।

তবে ভুক্তভোগীরা বলছেন, সরকারি এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলো করোনাভাইরাস রোগী সন্দেহ করলেই সেবা দিচ্ছে না।

ড. সেব্রিনা অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, দেশে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিশ্চিত করা।

এদিকে পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ার কথা বুধবার নিশ্চিত করেছেন সরকারি কর্মকর্তারা।

লন্ডন থেকে মুম্বাই হয়ে গত ১৫ মার্চ কলকাতায় আসা স্থানীয় এক তরুণের শরীরে এই রোগ সংক্রমণের তথ্য তাঁরা মঙ্গলবার রাতে জানতে পারেন বলে সাংবাদিকদের জানান পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা অজয় চক্রবর্তী।

তিনি জানান, আক্রান্ত ব্যক্তি বয়সে তরুণ। দেশে আসার আগে লন্ডনে একটি পার্টিতে গিয়েছিলেন। ওই পার্টির কয়েকজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন জানার পরই পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁকে হাসপাতালে পাঠানো হয়।

বাংলাদেশে প্রথম মৃত্যু

ঢাকার সংবাদ সম্মেলনে দেশে করোনা ভাইরাস সংক্রমণে মৃত প্রথম ব্যক্তি সম্পর্কে ড. সেব্রিনা বলেন, “তাঁর বয়স সত্তরের বেশি। তিনি বিদেশে যাননি। তবে বিদেশফেরত একজনের সংস্পর্শে এসেছিলেন।”

“তাঁর করোনাভাইরাসের সমস্যা খুব বেশি ছিল না। তবে তিনি ফুসফুসের সমস্যা, ডায়াবেটিক, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি সমস্যা ও হৃদ্‌রোগে ভুগছিলেন। তিনি বিভিন্ন ঝুঁকিতে ছিলেন,” বলেন ডা. সেব্রিনা।

বুধবার নতুন চারজনের সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়ায় বর্তমানে দেশে মোট করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৪ বলে জানান তিনি।

নতুনদের মধ্যে তিনজন পুরুষ ও একজন নারী জানিয়ে ডা. সেব্রিনা বলেন, তাঁদের বয়স ২০ থেকে ৫০ এর মধ্যে।

তিনি বলেন, “নতুন আক্রান্তদের একজন আগে যারা আক্রান্ত ছিলেন তাঁদের পরিবারের সদস্য। বাকি তিনজনের দুজন ইতালি ও একজন কুয়েত থেকে এসেছেন।”

এখন পর্যন্ত ১৬ জন আইসোলেশনে ও ৪২ জন প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে আছেন বলে জানান ডা. সেব্রিনা। এছাড়া এ পর্যন্ত ৩৪১ জনের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

‘চিকিৎসা দিচ্ছে না হাসপাতাল’

বাংলাদেশের হাসপাতালগুলো করোনাভাইরাসের সন্দেভাজন রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

সরেজমিনে দেখা যায়, বুধবারও কিছু মানুষ আইডিসিআর অফিসের বাইরে এসে অপেক্ষা করছেন। অনেকেই তাঁদের রক্তের নমুনা গ্রহণের জন্য ডাক্তারদের অনুরোধ করছেন।

মগবাজার থেকে সস্ত্রীক আইডিসিআর-এ এসেছিলেন আলম নামের এক ব্যক্তি। তিনি বেনারকে জানান, তাঁর জ্বর এবং কাশি রয়েছে। তিনি বিদেশ ফেরত এক ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছিলেন।

তিনি বলেন, “আমি ঢাকার সব সরকারি হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে বেড়িয়েছি। কোনো হাসপাতাল আমাদের চিকিৎসা দেয়নি। এমনকি আমাদের ঢুকতেই দেয়নি। বেসরকারি হাসপাতালেও একই অবস্থা।”

সম্ভাব্য রোগীদের চিকিৎসায় অবহেলার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে ডা. সেব্রিনা বলেন, “ডাক্তাররা সম্ভাব্য করোনাভাইরাস রোগীদের গ্রহণ করছেন না অন্যান্য রোগীদের সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে।”

তিনি বলেন, “একটি হাসপাতালে বিভিন্ন ধরনের রোগী থাকে। প্রয়োজনীয় সুবিধা ছাড়া করোনাভাইরাস রোগীদের ভর্তি করা হলে অন্য রোগীদের মধ্যে তা সংক্রমিত হতে পারে।”

দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে করোনাভাইরাস চিকিৎসার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন ডা. সেব্রিনা।

তবে চিকিৎসকদের পর্যাপ্ত ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সামগ্রী সরবরাহ করা না হলে তাঁদের পক্ষে ঝুঁকি নিয়ে করোনাভাইরাস রোগীদের চিকিৎসা করা কঠিন বলে মন্তব্য করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কনক কান্তি বড়ুয়া।

তিনি বেনারকে বলেন, “যদি চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সামগ্রী সরবরাহ করা না হয়, তাহলে কেন তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসা দেবে? আমার মনে হয় চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সামগ্রী নিশ্চিত করতে হবে।”

তবে সেবা না দিয়ে রোগীকে বের করে দেওয়া ঠিক নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, “যারা করেছে তারা ঠিক কাজ করেনি।”

হাসপাতালগুলোর সমস্যা সমাধানের জন্য আইডিসিআর এর পক্ষ থেকে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে মন্তব্য করে ডা. সেব্রিনা জানান, ডাক্তারদের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সামগ্রী পর্যাপ্ত পরিমাণে রয়েছে।

তিনি জানান, আইইডিসিআর এর হটলাইনগুলোতে যারা ফোন করেন তাঁদের অধিকাংশেরই করোনাভাইরাসের লক্ষণ নেই।

অনেকে দীর্ঘক্ষণ ফোন ব্যস্ত রাখার ফলে যাদের প্রকৃতই সাহায্য দরকার তাঁরা ফোন করতে পারছেন না। ফলে এখন থেকে সমস্যা জানানোর জন্য ই-মেইল এবং ফেসবুক আইডিও সরবরাহ করা হবে বলেও জানান ডা. সেব্রিনা।

‘প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি’

সম্ভাব্য সব রোগীকে পরীক্ষা করতে না পারার কারণে বাংলাদেশে চিহ্নিত করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীর চেয়ে প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি হতে পারে বলে বেনারের কাছে মন্তব্য করেছেন সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ.ফ.ম. রুহুল হক।

তিনি বলেন, “আমাদের দেশে করোনাভাইরাস রোগীর সংখ্যা যা বলা হচ্ছে প্রকৃত সংখ্যা তার চাইতে অনেক বেশি বলে আমি মনে করি। কারণ আমরা সবাইকে পরীক্ষা করতে পারছি না।”

“প্রায় এক লাখ বাংলাদেশি বিদেশ থেকে এসেছেন। তাঁদের কয়জনের রক্ত পরীক্ষা করা হয়েছে? এরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। এদের রক্ত যদি পরীক্ষা করা হয় তাহলে প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি হবে,” বলেন রুহুল হক।

তবে বিদেশ ফেরত “সকলের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করার দরকার নেই,” মন্তব্য করে ডা. সেব্রিনা তাঁদেরকে নিজ দায়িত্বে সঙ্গনিরোধে থাকার আহ্বান জানান।

“আপনারা হোম কোয়ারান্টাইনে থাকবেন। পবিরারের অন্যান্য সদস্যদের কাছ থেকে দূরে থাকবেন,” বলেন তিনি।

যারা নির্দেশনা অমান্য করবেন তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে “প্রয়োজন না থাকলে বাসার বাইরে যাবেন না,” বলে দেশের সকলের প্রতি আহ্বান জানান ডা. সেব্রিনা।

এদিকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে “প্রয়োজনে শাটডাউন করা হবে,” বলে বুধবার সাংবাদিকদের কাছে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের মন্তব্য করলেও ডা. সেব্রিনার মতে, “বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থায় শাট-ডাউনের কোনো প্রয়োজন নেই।”

গত ডিসেম্বরের শেষে চীন থেকে করোনাভাইরাস ছড়ানো শুরু হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে এ পর্যন্ত সারা বিশ্বে এ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় দুই লাখ আট হাজার মানুষ, মারা গেছেন প্রায় ৮ হাজার ৬০০ জন।

তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন কলকাতা থেকে পরিতোষ পাল।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন