Follow us

করোনাভাইরাস: কারখানা বন্ধের দাবি পোশাক শ্রমিকদের

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2020-03-24
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
করোনাভাইরাস সংক্রমণের আতঙ্ক নিয়েই কাজ করে যাচ্ছেন পোশাক খাতের কর্মীরা। ছবিটি ঢাকার ধামরাইয়ের একটি কারখানায় তোলা। ২৪ মার্চ ২০২০।
করোনাভাইরাস সংক্রমণের আতঙ্ক নিয়েই কাজ করে যাচ্ছেন পোশাক খাতের কর্মীরা। ছবিটি ঢাকার ধামরাইয়ের একটি কারখানায় তোলা। ২৪ মার্চ ২০২০।
[নিউজরুম ফটো]

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে পোশাক শ্রমিকদের রক্ষা করতে সাময়িকভাবে কারখানা বন্ধ ঘোষণার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের সংগঠনগুলো। এই সময়ে শ্রমিকদের বেতনসহ ছুটি দিতে সরকার ও পোশাকশিল্প মালিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তারা।

উল্লেখ্য, ২৬ মার্চ থেকে আগামী ৪ এপ্রিল পর্যন্ত টানা দশদিন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হলেও তৈরি পোশাক কারখানা এর আওতামুক্ত রাখা হয়েছে।

গার্মেন্টস শ্রমিক অধিকার আন্দোলনের কেন্দ্রীয় পরিচালনা কমিটির সমন্বয়কারী মাহবুবুর রহমান ইসমাইল বেনারকে বলেন, “এটা বলার অবকাশ রাখে না পৃথিবীর সব মানুষ এখন আতঙ্কের মধ্যে। বিজিএমইএ কারখানা চালু রাখার যে সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে তা শ্রমকিদের মৃত্যুর মুখে, মহামারির মুখে ঠেলে দেবে।”

এমন অবস্থায় সবেতনে পোশাক কর্মীদের ছুটিতে পাঠানোর দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, “সবার আগে কারখানা বন্ধ করা দরকার। জীবনের চেয়ে চাকরি বা ফ্যাক্টরি বড় হতে পারে না।”

এ প্রসঙ্গে গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মাসুদ রেজা ও সাধারণ সম্পাদক রাজু আহমেদ এক বিবৃতিতে বলেন, “দেশের জরুরি প্রয়োজনীয় খাতগুলো বাদে সকল প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করলেও ৪০ লক্ষ শ্রমিকের কর্মক্ষেত্র গার্মেন্টস কারখানাগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়নি।”

“সকাল বেলা তারা কাজে ঢুকছে, কাজ করে বের হচ্ছে। এক সাথে কাজ করছে, মিশছে। এই সব এলাকায় করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি খুবই মারাত্মক,” বলেন তাঁরা।

মালিকরা কেবল মুনাফার চিন্তা করছেন উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, “গার্মেন্টস শ্রমিকদের সাথে চূড়ান্ত অমানবিক আচরণ করা হচ্ছে।”

অবিলম্বে গার্মেন্টসের সকল স্তরের শ্রমিকদের সবেতন ছুটি ও এই সেক্টরের সাথে যুক্ত অসংগঠিত শ্রমিকদের আগামী চার সপ্তাহের রেশনের ব্যবস্থার দাবি জানান তাঁরা।

এ বিষয়ে পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর প্রথম সহ-সভাপতি আবদুস সালাম বেনারকে বলেন, “কারখানা বন্ধের বিষয়টি নিয়ে এখনো আমরা আলোচনা করছি। তবে এ বিষয়ে সরকারের দিক থেকেও আমাদের কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।”

শ্রম ও কর্মসংস্থান সচিব কে এম আলী আজম বেনারকে বলেন, “বিষয়টি কারখানা মালিকদের বিচার-বিবেচনার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে আমরা চাই শ্রমিকেরা যেন অভুক্ত না থাকে, বিপদে না পড়ে। অন্ন বস্ত্রের সমস্যায় না থাকে।”

তিনি বলেন, “কারখানা বন্ধ হলেই কর্মীরা বাড়িতে চলে যাবে। এদের মধ্যে করোনাভাইরাস আক্রান্ত কেউ থাকলে সংক্রমণ সেখানেও ছড়াবে। আবার গ্রামে বিভিন্ন দেশ থেকে বিদেশ ফেরতরা এসেছেন। তাঁদের সংস্পর্শে আসলে কর্মীদেরও সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকে।”

আলী আজম বলেন, “পোশাক কর্মীরা রেজিমেন্টেড, ডিসিপ্লিন ওয়েতে আছে। তাদের কিছু কাজও আছে। সেসব অর্ডার তো বাতিল হয়নি। তা ছাড়া আমাদের নিজেদের কিছু ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী তৈরি করা হবে। তারা ‍উদ্যোগ নিতে শুরু করেছে। এ জন্যও কর্মীদের প্রয়োজন।”

“তারপরও সমঝোতার ভিত্তিতে যদি কোনো পোশাক কারখানা মালিক কর্মীদের ছুটি দেন, তাহলে যেন তাঁদের বেতন নিশ্চিত করা হয়,” বলেন তিনি।

এদিকে মঙ্গলবার এক ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউসও জানান, তৈরি পোশাক কারাখানা বন্ধ করার বিষয়ে মালিকরাই সিদ্ধান্ত নেবেন।

তিনি বলেন, গার্মেন্টস মালিকেরা স্যানিটাইজার, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রেখেছেন। গ্লাভস ও মাস্ক ব্যবহার করেই কর্মীরা কাজ করে যাচ্ছেন।

বাংলাদেশে ৮ মার্চ প্রথম করোনাভাইরাসের রোগী শনাক্ত হওয়ার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে এ পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৩৯ জন, মারা গেছেন চার জন।

গত ডিসেম্বরের শেষে চীন থেকে করোনাভাইরাস ছড়ানো শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব মতে, মঙ্গলবার পর্যন্ত সারা বিশ্বে এ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন ৪ লাখ, ৯ হাজার ১৪ জন। আর মারা গেছেন ১৮ হাজার ২৪৬ জন মানুষ।

বিপাকে তৈরি পোশাক খাত

করোনাভাইরাসের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে প্রায় প্রতিদিনই ক্রয়াদেশ বাতিল করছেন বিদেশি ক্রেতারা। ফলে কঠিন সময় পার করছে দেশের প্রধান এই রপ্তানিমুখী শিল্প।

মঙ্গলবার পর্যন্ত সোয়া দুইশ কোটি ডলারের (২.২৫ বিলিয়ন ডলার) রপ্তানি বাতিল বা স্থগিত হয়ে গেছে বলে জানানো হয় বিজিএমইএ’র ওয়েবসাইটে।

এর ফলে ৮৪৩টি কারখানায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ।

বিজিএমইএ’র তথ্য অনুযায়ী, দেশের তৈরি পোশাক খাতে ৪১ লক্ষ কর্মী নিয়োজিত রয়েছেন। যার মধ্যে ৬০ শতাংশ নারী।

এই সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের প্রতি ক্রয়াদেশ বাতিল না করার আহ্বান জানিয়েছেন বিজিএমই সভাপতি রুবানা হক।

“পোশাকের ক্রয়াদেশের পরিস্থিতি অত্যন্ত শোচনীয়,” মন্তব্য করে সোমবার এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, “ক্রেতারা এই মৌসুমের ক্রয়াদেশের পোশাক কবে নেবে, সেটিও বলছে না। এমতাবস্থায় চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি আমরা।”

চলমান পরিস্থিতিতে পোশাক শ্রমিকেরা সময়মতো মজুরি পাবেন প্রতিশ্রুতি দিয়ে রুবানা হক বিদেশি ব্র্যান্ড ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আবেদন জানিয়ে বলেন, তারা যেন কারখানায় প্রস্তুত হওয়া পোশাকগুলো নেন।

“অন্যথায় আগামী ছয় মাসের মধ্যে প্রতিটি কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। বড়, মাঝারি, ছোট—প্রতিটি কারখানা বন্ধ হবে,” বলেন রুবানা হক।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বব্যাপী যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তাতে ক্ষতির সম্মুখীন হবে দেশের প্রধান রপ্তানি শিল্প পোশাক খাত।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বেনারকে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালির মতো দেশে আমাদের তৈরি পোশাকের ৬০ ভাগ রপ্তানি হয়।”

“কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে এসব দেশ এখন ‘লক ডাউনের’ মধ্যে আছে। কবে পরিস্থিতি ঠিক হবে কেউ জানে না। ফলে আমাদের রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্প ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে,” বলেন তিনি।

“এতে করে বৈদেশিক আয় কমে যাবে। কর্মসংস্থান কমবে, উদ্যোক্তাদের লোকসান বাড়বে। ফলে ব্যাংকের ঋণ পরিসেবার সমস্যা হবে। সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতির উপরে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে,” মনে করেন ড. মোস্তাফিজ।

এমন পরিস্থিতিতে এই শিল্পের জন্য ঋণ সুবিধা, প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়াসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে সরকারকে পরামর্শ দিন তিনি।

পোশাক খাতের বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপ জানতে চাইলে শ্রম ও কর্মসংস্থান সচিব কে এম আলী আজম বেনারকে বলেন, “২৫ মার্চ জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে রপ্তানিমুখী এই শিল্প খাতের বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকবে।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন