Follow us

বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী খাতে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা

জেসমিন পাপড়ি ও পরিতোষ পাল
ঢাকা ও কলকাতা
2020-03-25
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২৫ মার্চ ২০২০।
স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২৫ মার্চ ২০২০।
[সৌজন্যে: বিএসএস]

করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে প্রতিবেশী দুই দেশ বাংলাদেশ ও ভারতে শুরু হয়েছে অবরুদ্ধকরণ (লকডাউন) প্রক্রিয়া।

বৃহস্পতিবার থেকে দশ দিনের সাধারণ ছুটি শুরু হচ্ছে বাংলাদেশে, যা আনুষ্ঠানিকভাবে বলা না হলেও লকডাউনের মতোই। অন্যদিকে বুধবার থেকে ২১ দিনের লকডাউন শুরু হয়ে গেছে ভারতে।

করোনাভাইরাস মহামারির কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী খাতের শ্রমিকদের বেতন–ভাতা দিতে পাঁচ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে বুধবার জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে এ কথা বলেন তিনি। এ সময় প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

এ মুহূর্তে প্রাণঘাতী ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে নাগরিকদের রক্ষা করাই সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “করোনাভাইরাসের কারণে অনেক মানুষ কাজ হারিয়েছেন। আমাদের তাঁদের পাশে দাঁড়াতে হবে।”

করোনাভাইরাসের কারণে শিল্প উৎপাদন এবং রপ্তানি বাণিজ্যে আঘাত আসতে পারে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য আমি ৫ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করছি। এ তহবিলের অর্থ দ্বারা কেবল শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা যাবে।”

স্বস্তি ও অস্বস্তির পোশাক খাত

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকেরা প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের সুবিধা পাবেন। প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণায় স্বস্তি ফিরেছে পোশাক খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।

তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি রুবানা হক বেনারকে বলেন, “শ্রমিকদের বেতন দিতে সহায়তার জন্য আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞ।”

তিনি বলেন, “তৈরি পোশাক খাত প্রতি মাসে কর্মীদের বেতন পরিশোধ করে চার হাজার কোটি টাকা। করোনাভাইরাসের কারণে রপ্তানি বন্ধ থাকা এই খাতের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। যা কাটিয়ে উঠতে হোঁচট খেতে হবে।”

“এমন সময়ে শ্রমিকদের বেতন দেয়ার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা করার সিদ্ধান্ত খুবই স্বস্তিদায়ক। এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত সহায়ক হবে,” বলেন বিজিএমইএ সভাপতি।

তবে প্রধানমন্ত্রীর এই সহায়তা ঘোষণাকে “নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য খুশির খবর,” মন্তব্য করে গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাংগঠনিক সম্পাদক কে এম মিন্টু বেনারকে বলেন, “কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।”

তিনি বলেন, “প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের আতঙ্কে পুরো দেশে যখন ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে, তখন পোশাক কর্মীরা কাজ করে যাচ্ছে। সরকার যদি কর্মীদের বেতনের ব্যবস্থা করে তাহলে কারখানা কিছুদিন বন্ধ রাখতে সমস্যা কোথায়?”

“মালিকেরা একদিকে বলছেন অর্ডার বাতিল হচ্ছে, অন্যদিকে কর্মীদের দিয়ে কাজও করাচ্ছেন। তা ছাড়া কারখানাগুলোতে করোনাভাইরাস প্রতিরোধমূলক পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও নেই,” বলেন তিনি।

এছাড়া করোনাভাইরাসের প্রভাব দেখিয়ে বিভিন্ন কারখানায় কর্মী ছাঁটাই করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন এই শ্রমিক নেতা।

উল্লেখ্য, করোনাভাইরাসের কারণে প্রায় প্রতিদিনই পোশাক কারখানার ক্রয়াদেশ বাতিল করছেন বিদেশি ক্রেতারা। যার ফলে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি শূন্যে নেমে আসার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন রপ্তানিকারকরা।

বুধবার পর্যন্ত ২ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি বাতিল বা স্থগিত হয়ে গেছে বলে জানানো হয় বিজিএমইএ’র ওয়েবসাইটে।

“পোশাকের ক্রয়াদেশের পরিস্থিতি অত্যন্ত শোচনীয়,” মন্তব্য করে সোমবার এক ভিডিও বার্তায় রুবানা হক বলেন, “ক্রেতারা এই মৌসুমের ক্রয়াদেশের পোশাক কবে নেবে, সেটিও বলছে না। এমতাবস্থায় চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি আমরা।”

ধৈর্য ধরার ও নির্দেশনা মানার আহ্বান

করোনাভাইরাস সংক্রমণের এই সংকটময় সময়ে দেশবাসীকে ধৈর্য এবং সাহসিকতার সঙ্গে পরিস্থিতির মোকাবিলা করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উপদেশমতো মানুষের ভিড় এড়িয়ে চলা, বারবার সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোয়াসহ কয়েকটি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলারও পরামর্শ দেন তিনি।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত দেশ থেকে ফেরা প্রবাসীদের হোম কোয়ারেন্টিন বা বাড়িতে সঙ্গ-নিরোধসহ প্রয়োজনীয় নির্দেশনা মেনে চলার অনুরোধ জানান প্রধানমন্ত্রী।

প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে না যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “মুসলমান ভাইয়েরা ঘরেই নামাজ আদায় করুন এবং অন্যান্য ধর্মের ভাইবোনদেরও ঘরে বসে প্রার্থনা করার অনুরোধ জানাচ্ছি।”

যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার প্রস্তুত আছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিনে মজুত করবেন না। সীমিত আয়ের মানুষকে কেনার সুযোগ দিন।”

ভারতে লক ডাউন: রাস্তায় মানুষ

এদিকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে ২১ দিনের লকডাউনের প্রথম দিন পার করল ভারত। তবে সুরক্ষা বিধি মেনে ঘরে থাকা এবং সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার আবেদন উপেক্ষা করে রাস্তায় নেমেছে সাধারণ মানুষ।

বুধবার সকাল থেকেই নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী কিনতে বাজারে-দোকানে ভিড় করতে শুরু করে লোকজন। জিনিসপত্র কেনা নিয়ে ধাক্কাধাক্কিও হয়, পরে পুলিশ সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য চক দিয়ে চিহ্ন এঁকে দেয়।

অকারণে পথে নামা এবং চায়ের দোকানে আড্ডা দেওয়া মানুষকে বাড়ি পাঠিয়ে দোকান বন্ধ করে দেয় পুলিশ। অনেক জায়গাতেই লাঠি চালানো হয়।

মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার বিকেল পর্যন্ত নিরাপত্তা বিধিনিষেধ না মানার জন্য রাজ্যে রাজ্যে বহু মানুষকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও গ্রেপ্তারের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে।

কলকাতার স্কুল শিক্ষিকা শিঞ্জীনি সেনগুপ্ত বেনারকে বলেন, “গড়িয়াহাট মার্কেটে প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী কিনতে যেয়ে দেখি পুলিশ লাঠি চালিয়ে লোকজন সরাচ্ছে। ফলে কিছু না কিনেই বাড়ি ফিরে আসি।”

তবে করোনা সংক্রমণ মোকাবিলায় লকডাউন মেনে ঘরে থাকার প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি স্বীকার করেন।

মঙ্গলবার স্থানীয় সময় রাত আটটায় জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী রাত বারোটা থেকে ২১ দিনের জন্য সম্পূর্ণ লকডাউনের ঘোষণা দেন।

তিনি বলেন, “২১ দিনের এই লকডাউন না মানলে দেশ ২১ বছর পিছিয়ে যাবে।”

তিনি করোনা সংক্রমণ মোকাবিলায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন।

গত ডিসেম্বরের শেষে চীন থেকে করোনাভাইরাস ছড়ানো শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব মতে, বুধবার পর্যন্ত সারা বিশ্বে এ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন ৪ লাখ, ৬০ হাজারে বেশি আর মারা গেছেন প্রায় ২১ হাজার মানুষ।

বাংলাদেশে ৮ মার্চ প্রথম করোনাভাইরাসের রোগী শনাক্ত হওয়ার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৩৯ জন, মারা গেছেন পাঁচ জন।

ভারতে করোনাভাইরাসের প্রথম রোগী শনাক্ত হন ৩০ জানুয়ারি কেরালা রাজ্যে। দেশটির স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী বুধবার সকাল পর্যন্ত ভারতে ৬০৬ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন, মারা গেছেন ১১ জন।

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন ঢাকা থেকে শরীফ খিয়াম।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন