Follow us

করোনাভাইরাস ঠেকাতে রোহিঙ্গা শিবিরে ইন্টারনেট সেবা চালুর দাবি

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2020-03-27
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
করোনাভাইরাস সংক্রমণের ভয়ে জনসমাগম কমে গেছে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোতে। ছবিটি টেকনাফের লেদা ক্যাম্প থেকে তোলা। ২৩ মার্চ ২০২০।
করোনাভাইরাস সংক্রমণের ভয়ে জনসমাগম কমে গেছে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোতে। ছবিটি টেকনাফের লেদা ক্যাম্প থেকে তোলা। ২৩ মার্চ ২০২০।
[আবদুর রহমান/বেনারনিউজ]

করোনাভাইরাস বা কভিড-১৯’র সংক্রমণ রোধে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে ইন্টারনেট সেবা চালুর দাবি জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।

বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে সংগঠনটি জানিয়েছে, শিবিরগুলোতে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ ও মোবাইল ফোন ব্যবহারে বিধিনিষেধের ফলে সেখানে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে কাজ করতে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এইচআরডব্লিউ-র দাবি, ইন্টারনেটের অভাবে শিবিরগুলোতে ত্রাণ সংস্থাগুলোর জরুরি সেবাদান ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার পথে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। এতে করে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা ঝুঁকির মুখে রয়েছেন।

তবে এখনি রোহিঙ্গা শিবিরে ইন্টারনেট সুবিধা পুনরায় চালু করার চিন্তা সরকারের নেই বলে বেনারকে জানিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার।

তিনি বলেন, “রোহিঙ্গা শিবিরে ইন্টারনেট সুবিধা চালু করার বিষয় এখনো আমাদের আলোচনায় আসেনি।”

“সাধারণত এ বিষয়ে আমাদের মন্ত্রণালয় সরাসরি কোনো সিদ্ধান্ত নেয় না। স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র এবং দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় মিলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর কোনো নির্দেশনা দিলে আমরা সেটা বাস্তবায়ন করি। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো নির্দেশনা আসেনি।”

প্রতিবেদনে এইচআরডব্লিউ’র এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ব্র্যাড এডামস বলেন, “করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোও রয়েছে। সরকারের কাছে এখন ক্ষতিকর নীতিমালা দিয়ে নষ্ট করার মতো সময় নেই।”

তাঁর মতে, “সরকারের উচিত এখন ইন্টারনেট সেবা বন্ধের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নেওয়া। এতে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ ও প্রতিরোধ সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পৌঁছানো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।”

“ইন্টারনেট চালু না হলে শরণার্থী, তাঁদের আশ্রয়দানকারী জনগোষ্ঠী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জীবন ঝুঁকিতে পড়বে,” বলেন অ্যাডামস।

এডামস বলেন, “জরুরিভিত্তিতে কর্তৃপক্ষের শিবিরগুলো থেকে ইন্টারনেট শাটডাউন প্রত্যাহার করা উচিৎ এবং ভাইরাস ও এর প্রতিরোধব্যবস্থা নিয়ে সঠিক তথ্য সকলের জন্য সহজলভ্য করা উচিৎ।”

উল্লেখ্য, নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে গত সেপ্টেম্বর থেকে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে করোনাভাইরাস সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করছেন স্থানীয় রোহিঙ্গা নেতারা৷

কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরের একজন মাঝি মো. নূর বেনারকে বলেন, “করোনাভাইরাস নিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আতঙ্ক রয়েছে। তবে বিষয়টা নিয়ে আমরা খুব বেশি জানি না। ইন্টারনেট থাকলে এ বিষয়ে আরো তথ্য জানতে পারতাম।”

“আপাতত আমরা সরকারের পরামর্শ মতো মানুষে মানুষে মেলামেশা, বাজারে যাওয়া, অন্য বাড়িতে যাওয়া বন্ধ রেখেছি,” বলেন তিনি।

এইচআরডব্লিউ জানায়, হোয়াটসঅ্যাপ ও অন্যান্য ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে শিবিরগুলোতে ত্রাণকর্মী ও স্থানীয় নেতারা জরুরি সেবা সমন্বয় করে থাকেন। পাশাপাশি, শিবিরগুলোতেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য শেয়ার করা যায়।

কিন্তু বর্তমানে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকায় করোনাভাইরাস সম্পর্কে যথাযথ তথ্য সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে।

একজন কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীর বরাতে এইচডব্লিউআর জানায়, হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে তাঁরা মেডিক্যাল সহায়তাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। কিন্তু এখন আর তা সম্ভব হচ্ছে না।

এর আগে রোহিঙ্গাদের মধ্যে করোনাভাইরাসের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে উল্লেখ করে পরিস্থিতি সামাল দিতে কক্সবাজারের বিভিন্ন শিবিরগুলোতে ইন্টারনেট সেবা চালুর আহ্ৱান জানায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়।

এইচআরডব্লিউ-র প্রতিবেদনে ৫২ বছর বয়সী এক রোহিঙ্গা নারীকে উদ্ধৃতি করে বলা হয়, কেউ তাঁর কমিউনিটিতে ভাইরাসটি নিয়ে তথ্য জানাতে যায়নি।

কেবল ধর্মীয় নেতাদের কাছ থেকে প্রার্থনা করার কথা শুনেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমরা ১০ বা ১২ জনের দল হয়ে প্রার্থনা করছি। আমরা কেবল এটুকুই জানি। কেউ আমাদের এর বেশিকিছু জানায়নি।”

রোহিঙ্গা শিবিরে করোনাভাইরাস সংক্রমণ নেই

এখন পর্যন্ত রোহিঙ্গা শিবির বা এর আশপাশের এলাকায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঘটেনি বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ সামছু-দ্দৌজা বেনারকে বলেন, “এখন পর্যন্ত কোনো রোহিঙ্গা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হননি। তবে ভারত এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে এসেছেন এমন পাঁচজনকে ইউএনএইচসিআরের ট্রানজিট ক্যাম্প ও হাসপাতালে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে।”

তিনি বলেন, করোনা ছড়িয়ে পড়ার পরে খাদ্য, চিকিৎসা, এলপিজি এবং পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা ছাড়া অন্যসব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

“সবাইকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে বলা হয়েছে। কমিউনিটি নেতাদের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও বিষয়টি দেখভাল করছে। ইন্টারনেট না থাকার কারণে তারা কোনো সমস্যায় পড়ছে না,” বলেন সামছু-দ্দৌজা।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) মুখপাত্র লুইস ডোনোভান বেনারকে বলেন, “এখন পর্যন্ত রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে কোনো করোনাভাইরাসের সন্দেহজনক ঘটনা নেই।”

‘বাংলাদেশে করোনারোগীর সংখ্যা প্রকৃত চিত্র নয়’

গত ডিসেম্বরের শেষে চীন থেকে করোনাভাইরাস ছড়ানো শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব মতে, শুক্রবার পর্যন্ত সারা বিশ্বে এ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন ৫ লাখ ৮৫ হাজারের বেশি মানুষ, মারা গেছেন ২৬ হাজার ৮০০ থেকে বেশি।

বাংলাদেশে ৮ মার্চ প্রথম করোনাভাইরাসের রোগী শনাক্ত হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত করোনাভাইরাসে মারা গেছেন পাঁচজন। আর শুক্রবার শনাক্ত চার জনসহ মোট আক্রান্ত ৪৮ জন।

শুক্রবারের চার রোগীর মধ্যে দুজন ডাক্তার বলে বেনারকে জানান সরকারের রোগতত্ব বিভাগের (আইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরা।

“গত ২৪ ঘন্টায় আমাদের দেশে আরও চারজন নতুন কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দুজন ডাক্তার,” বলেন ডা. ফ্লোরা।

তবে বাংলাদেশে সরকারিভাবে দেখানো করোনারোগীর সংখ্যা প্রকৃত চিত্রের চেয়ে কম বলে মনে করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক কনক কান্তি বড়ুয়া।

তিনি বেনারকে বলেন, “আসলে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস নিয়ে আইডিসিআর যা বলছে, তা প্রকৃত চিত্র নয়। আমরা তো সকল পটেনশিয়াল রোগীকে পরীক্ষা করছি না। খুব সিলেক্টিভভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে। সেই কারণে আমাদের দেশে সংখ্যা কম বলে আমি মনে করি।”

“এ পর্যন্ত চারজন চিকিৎসক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। বেশ কিছু নার্সও আক্রান্ত হয়েছেন। বর্তমানে চিকিৎসক ও নার্সদের করোনাভাইরাসে আক্রন্ত হওয়াটা আমাদের জন্য একটি অশনি সংকেত,” বলেন অধ্যাপক কনক কান্তি।

তিনি বলেন, “তাঁদের জন্য ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী দেয়া হয়েছে। তবে সেটি সঠিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সেটি ব্যবহার শুরুর আগেই তাঁরা আক্রান্ত হয়েছেন কি না এগুলো সেখার বিষয়।”

তবে “আমরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী সাম্ভাব্য রোগীদের পরীক্ষা করছি,” দাবি করে ডা. ফ্লোরা বলেন, “সরকার ঘোষিত চলমান ছুটিতে কেউ ঘরের বাইরে বের না হলে, আমরা আশা করি এই সংক্রমণ বন্ধ করা যাবে।”

প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন ঢাকা থেকে কামরান রেজা চৌধুরী।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন