করোনাভাইরাস মোকাবেলা: ছুটির মেয়াদ বাড়লেও পথে ফিরছেন নিম্ন আয়ের মানুষ

শরীফ খিয়াম
2020.03.31
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
203031_working_people_1000.JPG করোনাভাইরাস সংক্রমণ মোকাবেলায় সরকার ঘোষিত ছুটিতে ঢাকার সাইন্স ল্যাব এলাকায় নিম্ন আয়ের মানুষদের মাঝে নগদ অর্থ বিলি করছেন এক ব্যক্তি। ৩১ মার্চ ২০২০।
[বেনারনিউজ]

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে জনসমাগম এড়ানোর জন্য সাধারণ ছুটির মেয়াদ আরো এক সপ্তাহ বাড়িয়েছে সরকার। এদিকে লোকজনকে রাস্তা থেকে বাড়িঘরে ফেরাতে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ধমক বা মারধরেও আর কাজ হচ্ছে না। সরকারি নির্দেশ অমান্য করে ঢাকার পথে নামা শ্রমজীবীদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।

সাধারণ ছুটিতে সংকটে পড়া মানুষদের জন্য সহায়তার ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে তা মিলছে না। তাই সরকার ঘোষিত বাধ্যতামূলক ছুটির ষষ্ঠদিন মঙ্গলবার নিম্ন আয়ের বিভিন্ন পেশার মানুষ বেনারকে জানান, তাঁদের কেউ দুইদিন আবার কেউবা টানা পাঁচদিনই ঘরে থেকে অবশেষে কর্মস্থলে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন।

ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে নয়, বরং এখন খাদ্যাভাবে মৃত্যুর শঙ্কায় ভুগছেন তাঁরা।

মঙ্গলবার জেলা প্রশাসকদের সাথে ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছুটি বাড়ানোর ইঙ্গিত দেওয়ার পর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় আরো সাতদিন ছুটি বাড়ানোর কথা জানায়। ফলে ২৬ মার্চ শুরু হওয়া এই ছুটির বর্ধিত মেয়াদ সাপ্তাহিক বন্ধসহ শেষ হবে ১১ এপ্রিল।

“ছুটি ঘোষণার কারণে দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষের সমস্যা হচ্ছে” উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, “যারা দৈনন্দিন কাজে যেতে পারছে না তাদের বাঁচিয়ে রাখা আমাদের সামাজিক কর্তব্য। তাদের কাছে সাহায্য ও খাদ্যদ্রব্য পাঠাতে হবে।”

তবে সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তার প্রক্রিয়া সুনির্দিষ্ট করে কিছুই জানানো হয়নি বলে মন্তব্য করেন অর্থনীতিবিদ ড. আনু মুহাম্মদ।

“এক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াটি কী, কাদের জন্য কী বরাদ্দ করা হবে এবং তাঁদের কীভাবে শনাক্ত করে কবে সাহায্য দেওয়া হবে, সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট করে কিছুই জানানো হয়নি এখনও,” বেনারকে বলেন আনু মোহাম্মদ।

এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে শুধু গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার একটি সুনির্দিষ্ট ঘোষণা এসেছে জানিয়ে আনু মোহাম্মদ বলেন, “নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী, ছোট ব্যবসায়ী বা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্তদের মতো যাদের কোনো নিশ্চিত বা নিয়মিত আয় নেই, তারা সম্পূর্ণ অসহায় পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গেছে।”

 

 

পেটের দায়ে রাস্তায় ফিরছে মানুষ

পাঁচদিন ঘরে বসে থেকে অবশেষে মঙ্গলবার রাস্তায় নেমেছেন ঢাকার বাড্ডা এলাকায় পরিবার নিয়ে বসবাস করা রিকশাচালক মোহাম্মদ খাইরুল ইসলাম।

রাস্তায় এখনো “লোক নাই, ভাড়া নাই,” মন্তব্য করে খাইরুল বেনারকে বলেন “ছুটি বাড়লে আমাদের না খেয়ে মরে যাওয়ার মতো অবস্থা হবে।”

চার দিন ঘরে থাকার পর মঙ্গলবার বের হয়েছেন মিরপুরের রিকশাচালক সাদ্দাম হোসেন।

“নিজের পেট চালাতে হবে, পরিবারকে বাঁচাতে হবে। তাই বাধ্য হয়ে আবার পথে নেমেছি,” মন্তব্য করে তিনি অভিযোগ করেন, “সরকার সাহায্যের কথা বলে ঠিকই, কিন্তু আমরা-তো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছি, কিছুই পাচ্ছি না।”

একই অভিযোগ মিরপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ এলাকায় ভ্রাম্যমাণ সিগারেট বিক্রেতা শান্তা বেগমের। সরকারের বাধ্যতামূলক ছুটি ঘোষণার পর তিনিও পাঁচদিন বাসায় ছিলেন।

“কিন্তু তারপর দেখি ঘরে থাকলে নিজের পেটে ভাত যাবে না। পোলাপানও কান্দে,” জানিয়ে শান্তা বেনারকে বলেন, “অসুখে যা না মরমু, ভাতে হ্যার তেয়া (তার চেয়ে) বেশি মইরা যামু।”

তিনি বলেন, “আমাগো তো কেউ হেল্প করে না। কোনো সাহায্য নাই আমাগো। আমরা কী করুম?”

ছুটি বাড়লে তাঁদের অবস্থা শোচনীয় পর্যায়ে চলে যাবে বলে বেনারকে জানান এখন পর্যন্ত কোনো সাহায্য না পাওয়া মিরপুরের হকার কাজী এখলাসুর রহমান।

তিনিও ষষ্ঠ দিনে কাজে বের হবার কথা জানিয়ে বেনারকে বলেন, “এই কয়দিন মুদি দোকান থেকে বাকিতে জিনিস নিয়ে চলেছি, ঋণ বেড়েছে। আর চলতে পারছি না।”

“পেটের দুঃখে বের হয়েছি,” মন্তব্য করে মানিক মিয়া এভিনিউ এলাকার রিকশাচালক মোহাম্মদ মনোয়ার বলেন, “অনেক এলাকায় পুলিশ রিকশা উল্টে হাওয়া ছেড়ে দিচ্ছে। এ রকম চলতে থাকলে না খেয়ে থাকতে হবে।”

এছাড়া মিরপুরের রিকশাচালক মনির হোসেন ও মোহাম্মদ সাগর এবং ভিক্ষুক মোহাম্মদ সোহরাব বেনারকে জানান, তাঁদের আশেপাশের অনেকে সাহায্য পেলেও তাঁরা পাননি।

ইতিমধ্যে দেশের শ্রম অর্থনীতি এক বিশাল ধাক্কা খেয়েছে দাবি করে ড. আনু মুহাম্মদ বলেন, “বাংলাদেশে পাঁচ কোটির বেশি মানুষ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করে, নিয়মিত আয় নেই। এমন পরিস্থিতিতে তাঁদের জন্য সরকারের অবশ্যই একটি পরিকল্পনা থাকা উচিত ছিল। সারা পৃথিবীর অনেক দেশই এটা করেছে।”

এদিকে নিম্ন আয়ের মানুষদের বাড়ি ভাড়া মওকুফ করতে মঙ্গলবার বাড়িওয়ালাদের আহবান জানিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম।

নজিরবিহীন পরিস্থিতি

গাবতলী বাস টার্মিনালে বসে কথা হয় ঢাকা-যশোর রুটে চলচলকারী মেট্টো পরিবহনের চালকের সহকারী মো. জয়নাল আবেদিনের সাথে। বেনারকে তিনি জানান, বাইরের জেলার যে পরিবহন শ্রমিকরা ঢাকায় আটকে আছেন তাঁরা ঠিকমতো খেতে পারছেন না।

“টার্মিনালের একটি হোটেলও খোলা নেই। আশেপাশে যেসব দোকান খোলা পাই, তারাও জিনিসপত্রের দাম নিচ্ছে বেশি,” বলেন তিনি।

ঢাকায় চল্লিশ বছর ধরে রিকশা চালান সত্তরোর্ধ মোহাম্মদ আয়নাল হক। তিনি কখনও এমন পরিস্থিতি দেখেননি বলে বেনারকে জানান।

তাঁর সাথে একমত হয়ে একই বয়সী ডাব বিক্রেতা মকবুল হোসেন বেনারকে বলেন, “আন্দোলন-হরতালের কারণে বিভিন্ন সময়ে এমনটা হলেও কোনো রোগের ভয়ে ঢাকা এত ফাঁকা হয়নি কখনো।”

এই দুই প্রবীণেরই শঙ্কা সরকারের দেওয়া সাহায্য সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের পেটে চলে যাবে। যদিও শেখ হাসিনা বলেছেন, “সহযোগিতা যেন সবাই সমানভাবে পায় তা দেখতে হবে। কেউ যেন বারবার না পায়, কেউ যেন বঞ্চিত না হয়, সেটা দেখতে হবে।”

এদিকে জনসমাগম এড়াতে প্রধানমন্ত্রী আসন্ন বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান বাতিল করার কথাও বলেছেন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)।

গত ডিসেম্বরের শেষে চীন থেকে করোনাভাইরাস ছড়ানো শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব মতে, মঙ্গলবার পর্যন্ত সারা বিশ্বে এ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন ৮ লাখ ৩৮ হাজারের বেশি মানুষ, মারা গেছেন ৪১ হাজারের বেশি।

বাংলাদেশে ৮ মার্চ প্রথম করোনাভাইরাসের রোগী শনাক্ত হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত করোনাভাইরাসে মারা গেছেন পাঁচজন। আর মঙ্গলবার শনাক্ত দুই জনসহ মোট আক্রান্ত হয়েছেন ৫১ জন।

গুজব ঠেকাতে পুলিশি তৎপরতা

করোনাভাইরাস নিয়ে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ৫০টি অ্যাকাউন্ট বন্ধ করতে বিটিআরসিকে অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে পুলিশ সদরদপ্তর।

এছাড়া সামাজিক মাধ্যমের আরো ৮২টি অ্যাকাউন্ট, পেইজ ও সাইটে গুজব ছড়ানোর পেছনের মানুষদের খুঁজে বের করতে অনুসন্ধান চলছে বলেও জানানো হয় সহকারী মহাপরিদর্শক মো. সোহেল রানার (মিডিয়া ও জনসংযোগ) নামে গণমাধ্যমে পাঠানো ওই বিবৃতিতে।

গুজব ছড়ানোর অভিযোগে ঢাকা, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি ও কিশোরগঞ্জ থেকে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে জানিয়ে এতে বলা হয়, গুজবের সাথে সম্পৃক্তদের গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান অব্যাহত থাকবে।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।