Follow us

ভেন্টিলেটর সংকটে মানবিক বিপর্যয়ে পড়বে বাংলাদেশ: সেভ দ্য চিলড্রেন

বেনারনিউজ স্টাফ
ওয়াশিংটন ডিসি
2020-04-06
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
কক্সবাজারের কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে রোহিঙ্গাদের সমাবেশ। ঘনবসতিপূর্ণ এই শরণার্থী শিবিরে করোনাভাইরাসের সম্ভাব্য সংক্রমণ মোকাবেলা ভাবিয়ে তুলছে সেবাকর্মীদের। ১ এপ্রিল ২০২০।
কক্সবাজারের কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে রোহিঙ্গাদের সমাবেশ। ঘনবসতিপূর্ণ এই শরণার্থী শিবিরে করোনাভাইরাসের সম্ভাব্য সংক্রমণ মোকাবেলা ভাবিয়ে তুলছে সেবাকর্মীদের। ১ এপ্রিল ২০২০।
[এপি]

করোনাভাইরাস বা কভিড-১৯ মহামারি মোকাবেলায় বাংলাদেশে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেটরের অভাব থাকার কথা উল্লেখ করে উদ্বেগ জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন।

করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার এই সময়ে সম্ভাব্য মানবিক বিপর্যয় মোকাবেলায় বাংলাদেশের সহায়তার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আবেদন জানিয়েছে সংস্থাটি।

সোমবার এক বিবৃতিতে সেভ দ্য চিলড্রেন জানায়, ১৬ কোটির বেশি জনসংখ্যার বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে ভেন্টিলেটরের সংখ্যা খুবই অল্প।

“আবার যতগুলো ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট-আইসিইউ আছে তার বেশির ভাগই রাজধানী ঢাকাসহ মূলত শহরকেন্দ্রিক। সেখানে গ্রাম বা ছোট শহর থেকে আসা রোগীদের চিকিৎসার সুযোগ বেশ সীমিত,” বলেছে সেভ দ্যা চিলড্রেন।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বের জেলা কক্সবাজারে বসবাস করা ৩৩ লাখ অধিবাসীর জন্য উদ্বেগ জানায় সেভ দ্য চিলড্রেন। বিশেষ করে সেখানে সীমিত স্বাস্থ্য সুবিধার মধ্যে আশ্রয় নেয়া ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী অত্যন্ত ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানায় তারা।

সংস্থাটি বলছে, যখন করোনাভাইরাস দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে তখন জেলাগুলোয় ভেন্টিলেটরের তীব্র সংকটে অনেককেই বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়বে।

বাংলাদেশ সরকার ভেন্টিলেটর সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে জানিয়েছে ভেন্টিলেটর আমদানিসহ দেশীয়ভাবে উৎপাদনের কথাও ভাবা হচ্ছে।

বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বর্তমানে মোট এক হাজার ৪৭৫টির কিছু বেশি ভেন্টিলেটার রয়েছে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সোমবার বেনারকে বলেন, “আমাদের ভেন্টিলেটরের অভাব রয়েছে। এই মেশিনগুলো ব্যয়বহুল এবং পরিশীলিত।”

“আমরা ইউরোপীয় উৎপাদনকারীদের কাছে ৩০০ ভেন্টিলেটর অর্ডার করেছি,” মন্তব্য করে তিনি বলেন “করোনাভাইরাস আক্রান্ত সব রোগীর ভেন্টিলেটর লাগবে না।”

“শুধু গুরুতর শ্বাস প্রশ্বাসের সমস্যাযুক্ত বয়স্ক রোগীদের ভেন্টিলেটর প্রয়োজন,” বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, করোনভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাসযন্ত্রের জটিলতা বেড়ে যায়। ফলে এই রোগীদের চিকিৎসার জন্য ভেন্টিলেটর অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ভাইরাোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বেনারকে বলেন, কভিড-১৯ ভাইরাস ফুসফুসে আক্রমণ করে এবং ভেন্টিলেটর মূলত এই রোগীদের শ্বাসযন্ত্রের বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে সহায়তা দেয়।

“বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসার জন্য ভেন্টিলেটর অবশ্যই জরুরি। তবে বাংলাদেশে পর্যাপ্ত সংখ্যক ভেন্টিলেটর নেই,” বলেন ডা. নজরুল।

তিনি বলেন, “সকল সরকারি হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ইউনিটে (আইসিইউ) ভেন্টিলেটর সুবিধা নেই।”

“উদাহরণস্বরূপ, বিএসএমএমইউ হাসপাতাল, যেটা বাংলাদেশের চিকিৎসা সেবার শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র হিসাবে চিহ্নিত, সেখানে মাত্র ৩০টি ভেন্টিলেটর রয়েছে,” বলেন ড. নজরুল ইসলাম।

তিনি বলেন, “রোগীদের সংখ্যা বাড়তে থাকায় আমাদের ভেন্টিলেটর সংখ্যা বাড়াতে হবে।"

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বাংলাদেশে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনাভাইরাসজনিত কারণে আরও তিনজন মারা গেছেন। এতে মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ জনে।

এছাড়া গত ২৪ ঘন্টায় আরও ৩৫ ব্যক্তি কভিড-১৯ ভাইরাসে সংক্রামিত হয়েছেন। এই নিয়ে এখন বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ১২৩ জন।

যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব মতে, সোমবার পর্যন্ত সারা বিশ্বে এ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন ১৩ লাখের বেশি মানুষ, মারা গেছেন ৭২ হাজারেও বেশি।

কক্সবাজারে কোনো ভেন্টিলেটর নেই

এখন পর্যন্ত কক্সবাজারে একজন করোনভাইরাস রোগী শনাক্ত হয়েছেন। তাঁকে ঢাকায় পাঠানোর পর বর্তমানে তিনি পুরোপুরি সুস্থ জানিয়ে জেলার স্বাস্থ্য অফিসের প্রধান ডাঃ মাহবুবুর রহমান বেনারকে বলেন, “কক্সবাজারে কোনো ভেন্টিলেটর নেই।”

“১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার উপস্থিতির কারণে কক্সবাজার করোনাভাইরাসের বড় ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে,” মন্তব্য করে ডা. মাহবুব জানান, “ইতিমধ্যে কর্তৃপক্ষকে কক্সবাজার হাসপাতালে জরুরি ভিত্তিতে ভেন্টিলেটর বরাদ্দের জন্য অনুরোধ করেছি।”

“আমরা মনে করি কক্সবাজার হাসপাতালের পর্যাপ্ত সংখ্যক ভেন্টিলেটর থাকা উচিত,” বলেন তিনি।

সেভ দ্যা চিলড্রেনের রোহিঙ্গা রেসপন্স অ্যাডভোকেসি ম্যানেজার অ্যাথেনা রায়বার্ন বলেন, “কক্সবাজারে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র বা আইসিইউ সুবিধা না থাকায় গুরুতর অসুস্থ রোগীদের ১৫০ কিলোমিটার দূরে চট্টগ্রাম নিয়ে যেতে হতে পারে। এতে রোগীদের পাশাপাশি অন্যদের ঝুঁকি আরও বাড়বে।”

“কভিড-১৯ কমিউনিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়া শুরু করলে মানবিক বিপর্যয় রোধে ভেন্টিলেটর এবং সেগুলো পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত লোক জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন।

তবে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত কোনো রোহিঙ্গা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হননি বলে জানান অ্যাথেনা রায়বার্ন।

দেশে তৈরি হবে ভেন্টিলেটর

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের এই সময়ে দেশেই ভেন্টিলেটর তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক।

৩১ মার্চ এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি জানান, “বিশ্বখ্যাত মেডিকেল প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদক কোম্পানি মেডট্রোনিক ভেন্টিলেটর বানানোর সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যারের সোর্স কোড, ডিজাইনসহ পেটেন্ট তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের আরএনডি টিমকে দিয়েছে।”

তিনি জানান, মেডট্রোনিকের প্রধান নির্বাহী ও চেয়ারম্যান ওমর ইশরাক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত হওয়ায় বাংলাদেশকে শুধু পেটেন্ট নয়, তাদের গবেষক ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ দেয়াসহ সব রকম সহায়তার হাত বাড়িয়েছে।

“ভেন্টিলেটর বানানোর এই উদ্যোগে ওয়ালটন, মাইওয়ান, সেলট্রন, এটুআই ইনোভেশন ল্যাব, এমআইএসটি, মিনিস্টার, স্টার্টআপ বাংলাদেশ ও আইডিয়াকে প্রাথমিকভাবে যুক্ত করা হয়েছে,” বলেন পলক।

বিশ্ব নেতাদের এগিয়ে আসার তাগিদ

বৈশ্বিক এ মহামারির কঠিন সময়ে তা মোকাবেলার জন্য একটি একক বৈশ্বিক পরিকল্পনা প্রণয়ের তাগিদ দিয়েছে সেভ দ্য চিলড্রেন। যার মধ্যে থাকবে ঋণ ও ত্রাণ সহায়তা, জনস্বাস্থ্যের জন্য অর্থায়ন বাড়ানো, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা ও কার্যকর সমন্বয়।

সেভ দ্য চিলড্রেনের ডেপুটি-কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. শামীম জাহান বলেন, “বর্তমানে কভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাবের মোকাবেলা করতে প্রয়োজনীয় ভেন্টিলেটরের চাহিদা পূরণ করা এই মুহূর্তে বাংলাদেশের পক্ষে কঠিন।”

“তাই বিশ্ব নেতৃবৃন্দ, বিশেষ করে জি ২০ দেশগুলোকে ত্রাণ ও ঋণ সহায়তার বিষয়ে একটি সমন্বিত বৈশ্বিক পরিকল্পনার গ্রহণ করতে হবে,” বলেন ড. শামীম জাহান।

কভিড-১৯ রোগীদের ভেন্টিলেটর সুরক্ষার জন্য জরুরিভাবে সরকারি ও বেসরকারি খাতকে জড়িত করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতিও আহ্বান জানান তিনি।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন