Follow us

করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে রোহিঙ্গা শিবির অবরুদ্ধ

সুনীল বড়ুয়া ও কামরান রেজা চৌধুরী
কক্সবাজার ও ঢাকা
2020-04-09
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ কমাতে কক্সবাজার জেলাকে লকডাউন ঘোষণার পর রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর রাস্তাঘাটে মানুষরে আনাগোনা অনেক কমে গেছে। ছবিটি উখিয়ার জামতলী রোহিঙ্গা শিবির থেকে তোলা। ০৯ এপ্রিল ২০২০।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ কমাতে কক্সবাজার জেলাকে লকডাউন ঘোষণার পর রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর রাস্তাঘাটে মানুষরে আনাগোনা অনেক কমে গেছে। ছবিটি উখিয়ার জামতলী রোহিঙ্গা শিবির থেকে তোলা। ০৯ এপ্রিল ২০২০।
[সুনীল বড়ুয়া/বেনারনিউজ]

দেশে কোভিড-১৯ ভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এর সংক্রমণের হাত থেকে রোহিঙ্গাদের বাঁচাতে কক্সবাজার শহর লকডাউন করার পরদিনই বৃহস্পতিবার জেলার উখিয়া ও টেকনাফে অবস্থিত ৩৪টি শরণার্থী শিবির লকডাউন (অবরুদ্ধ) ঘোষণা করা হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ লকডাউন মানাতে নতুন করে আরও ছয়টি চেকপোস্ট বসানো হয়েছে বলে বেনারকে জানান কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইকবাল হোসাইন।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বেনারকে বলেন, “উখিয়া ও টেকনাফের সকল রোহিঙ্গা শিবির লকডাউন করা হয়েছে। অনুমোদিত ব্যক্তি ছাড়া ৩৪ শিবিরে কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। আবার সেখান থেকে কেউ বের হতে পারবে না। শিবিরে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।”

বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কোনো রোহিঙ্গা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হননি জানিয়ে তিনি বলেন, “রোহিঙ্গারা খুব কাছাকাছি বসবাস করেন। সে কারণে সেখানে ঝুঁকি বেশি। সেখানে কাজ করা কোনো ব্যক্তি করোনাভাইরাস বহন করলে সেখান থেকে তারা সংক্রমিত হতে পারেন। কাজেই লকডাউনের বিকল্প নেই।”

তিনি বলেন, “রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে অনেক বিদেশি লোকজন কর্মরত আছেন, সে হিসাবে কক্সবাজারকে আমরা ঝুঁকিপূর্ণই মনে করছি। সে কারণে জেলাবাসীকে করোনারে সংক্রমণ থেকে বাঁচাতে পুরো কক্সবাজারকে লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে।”

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বৃহস্পতিবার সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, গত ২৪ ঘন্টায় সারাদেশে ১১২ জন নতুন করোনাভাইরাস রোগী শনাক্ত হয়েছেন। আর মৃত্যুবরণ করেছেন একজন। বুধবার নতুন আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৫৪ এবং মঙ্গলবার ছিল ৩৫ জন।

সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ৩৩০ জন করোনাভাইরাস রোগী শনাক্ত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২১ জন মারা গেছেন।

মন্ত্রী জাহিদ মালেক বেনারকে বলেন, “বাংলাদেশে কোভিড-১৯ সংক্রমণ বাড়ছে। কাজেই আমাদের জনসমাগম নিয়ন্ত্রিত করতে হবে। আমার মূল কথা হলো- ঘরে থাকুন, সুস্থ থাকুন।”

গত ডিসেম্বরের শেষে চীন থেকে করোনাভাইরাস ছড়ানো শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব মতে, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সারা বিশ্বে এ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন ১৫ লাখ ৮২ হাজারের বেশি মানুষ, মারা গেছেন ৯৪ হাজারেও বেশি।

এত বিপুল রোহিঙ্গাকে নিয়ন্ত্রণ করা কষ্টসাধ্য

পুলিশ কর্মকর্তা ইকবাল হোসাইন বেনারকে বলেন, “কোনো রোহিঙ্গা যেন ক্যাম্পের বাইরে যেতে না পারে, আর ক্যাম্পের বাইরে থেকে কোনো লোকজন, বিশেষ করে নতুন কোনো বিদেশি ক্যাম্পে ঢুকতে না পারে—এ বিষয়টি খুব গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।”

তিনি বলেন, এ ছাড়া ক্যাম্পগুলোতে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাবসহ আইন শৃংখলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে অনেকগুলো বাঁশকল বসানো হয়েছে।

তিনি জানান, “কক্সবাজারে উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে বসবাস করছে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা। অনেক রোহিঙ্গার মধ্যে এখনো সীমান্তের অবৈধ পথ পাড়ি দিয়ে মিয়ানমারে যাওয়া-আসার প্রবণতা রয়েছে। করোনা পরিস্থিতিতে এসব বিষয়গুলো জোর দিয়ে দেখা হচ্ছে।”

“এত বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে এভাবে নিয়ন্ত্রণ করা অনেক কষ্টসাধ্য বিষয়,” মন্তব্য করে ইকবাল হোসেন বলেন, “করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় রোহিঙ্গারা যেন ক্যাম্পের বাইরে যেতে না পারে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আইন শৃংখলা বাহিনী।”

তিনি আরও বলেন, লকডাউন বাস্তবায়নে জেলা উপজেলা শহরের পাশাপাশি রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতেও তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। ৩৪টি ক্যাম্পেই আইন শৃংখলাবাহিনীর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কোনো রোহিঙ্গা বিদেশ থেকে এসেছেন শুনলেই তাঁদের কোয়ারেন্টিনে রাখা হচ্ছে।

কক্সবাজার অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. শামসুদ্দৌজা বেনারকে বলেন, রোহিঙ্গাদের মধ্যে সন্দেহজনকভাবে বুধবার পর্যন্ত ৪২ জনকে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে। ১৪দিন পূর্ণ হওয়ায় তাঁদের মধ্যে বৃহস্পতিবার ১২জনের কোয়ারেন্টিন সময় শেষ হয়। তবে এখনো পর্যন্ত কোনো রোহিঙ্গা করোনা আক্রান্ত হিসাবে শনাক্ত হননি।

তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা শিবিরে যে হাসপাতালগুলো আছে, সেগুলোতে ইতিমধ্যে ৩০০টির বেশি বেড প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যাতে কেউ আক্রান্ত হলে সেখানে চিকিৎসা দেওয়া যায়। আরও এক হাজার বেড প্রস্তুতের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

তিনি জানান, “প্রয়োজনে এ সংখ্য আরও বাড়ানো হবে। বিশেষ করে সংক্রমণ যাতে না ঘটে এবং সংক্রমণ হলে কী ব্যবস্থা নিতে হবে সেজন্য বিভিন্ন সংস্থার তিন শতাধিক ডাক্তার, নার্স ও স্বেচ্ছাসেবককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও সচেতনতামূলক নানা কার্যক্রম চলমান রয়েছে।”

কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয়ের এই কর্মকর্তা আরও জানান, আগেই শিবিরের অভ্যন্তরে থাকা সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিশুবান্ধব কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া করোনাভাইরাস সম্পর্কে রোহিঙ্গাদের সচেতন করতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনাগুলো মিয়ানমার এবং ইংরেজি ভাষায় প্রকাশ করে বিলি করা হচ্ছে।

ইন্টার সেক্টর কো-অর্ডিনেশন গ্রুপের (আইএসসিজি) মুখপাত্র সৈকত বিশ্বাস বলেন, বর্তমানে শুধুমাত্র অতি জরুরি মানবিক সেবা যেমন চিকিৎসা, খাদ্য ও পানি সরবরাহসহ জীবন রক্ষাকারী সেবাসহ অতি জরুরি সেবাগুলো চালু রাখা হয়েছে। শুধুমাত্র এসব কাজে নিয়োজিত বিদেশিরাই এখন ক্যাম্পে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ইতিমধ্যে বাইরে থেকে আসা বিদেশিদের ক্যাম্পে যাওয়া একদম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আর জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সংস্থায় আগে থেকেই যেসব বিদেশি কর্মরত আছেন, তাঁদেরও ক্যাম্পে আসা-যাওয়া কমিয়ে আনা হয়েছে।

রোহিঙ্গা নেতারা যা বলছেন

কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরের নেতা মো. নূর বেনারকে বলেন, রোহিঙ্গাদের বেশিরভাগই নিরক্ষর। তাই তাদের মধ্যে সচেতনতার অভাব বেশি। তবে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে ক্যাম্পে সচেতনতামূলক নানা কর্মসূচি বাস্তবায়নের কারণে রোহিঙ্গাদের মধ্যে সচেতনতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে।

তিনি বলেন, “মাঝিদের নিয়ে গিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। আবার মাঝিরা সাধারণ রোহিঙ্গাদের এসে তা বোঝাচ্ছেন। তাই সচেতনতা বাড়ছে।”

মসজিদে নামাজ পড়ার বিষয়ে নূর বলেন, অনেকে কিন্তু নামাজ ঘরে পড়ছে। মসজিদে যারা পড়ছে তাদের অনেকেই নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে পড়ছে। তবে এ বিষয়ে সব রোহিঙ্গা সচেতন নয়। যে কারণে মসজিদে নামাজ আদায় একেবারে বন্ধ হয়নি।

বর্তমানে লোকজনের ক্যাম্পের বাইরে যাওয়া এবং ঘর থেকে বের হওয়ার প্রবণতা অনেকটা কমে এসেছে। এ ছাড়া নামাজের সময় ইমামরা করোনা সম্পর্কে সর্তক করছেন। লোকজনকে সাবান দিয়ে ঘন ঘন হাত ধোয়া, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা ও বাড়িতে নামাজ পড়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বলে জানান মো. নূর।

কোনারপাড়া নো-ম্যানসল্যান্ডের রোহিঙ্গা নেতা দিল মোহাম্মদ বেনারকে বলেন, করোনা নিয়ে অনেকে এখনো ভালো করে জানে না। তবে ঘন ঘন হাত ধোঁয়ার বিষয়টি সবাই জানে এবং অনেকে তা পালনও করছে।

“রোহিঙ্গাদের আমরা বোঝানোর চেষ্টা করছি, করোনা কঠিন রোগ, এটা হলে বাঁচা কঠিন। তাই সবাইকে ঘরে থাকতে হবে,” যোগ করেন দিল মোহাম্মদ।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন